“দিল্লি না ঢাকা”- আর বাংলাদেশের এই শ্লোগান শুনতে পাওয়া যায়না । সেদেশে এখন বিদ্যুৎ, ডিজেল আর রান্নার গ্যাসের তীব্র সঙ্কট । দেশ জুড়ে সরকার বিরোধী প্রবল হাওয়া উঠেছে । যাকে আদর্শ হিসাবে ভাবে সেই বাংলাদেশের রাজাকার সরকার, সেই পাকিস্তান নিজেই এখন তীব্র সঙ্কটে ধুঁকছে । তাই এই পরিস্থিতি থেকে পাকিস্তান যে উদ্ধার করতে আসবে সেই উপায়ও নেই । ‘নতুন বন্ধু’ চিন ও আমেরিকারও তাদের দুর্দশা নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই । ফলে অগত্যা সেই ‘কাফের দেশ’ ভারতই ভরসা ।
শেখ হাসিনার জমানায় নয়াদিল্লির সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ‘পর্যালোচনা’ করার কথা ঢাকার বাংলাদেশের তারেক রহমান সরকার জানানোর কয়েকদিন পর, এবারে তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ইঙ্গিত দিয়েছে।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ না জানানোয় ওই ইসলামী রাষ্ট্রটি আপত্তি জানিয়েছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমাইউন কবির রবিবার(১৩ সেপ্টেম্বর) বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ বহুপাক্ষিক মঞ্চের পরিবর্তে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক পরিচালনা করতে চায়। তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলের সম্পর্ককে “অস্বস্তিকর” বলে বর্ণনা করেছেন।
কবির বলেছেন, ভারতের বিষয়ে বাংলাদেশের আরও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, ভারতকে অন্য যেকোনো দেশের মতোই বিবেচনা করা উচিত এবং বাংলাদেশের উচিত দেশটির সঙ্গে ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা।কবির সাংবাদিকদের বলেন,’আমরা একটি নতুন সম্পর্কের দিকে এগোতে চাই, যা কোনো বহুপাক্ষিক ফোরামের মাধ্যমে নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ভারতকে নিয়ে তার ভাষায় “অতিরিক্ত মোহ” থেকে বাংলাদেশের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার সময় নিজের স্বার্থের ওপর মনোযোগ দেওয়া উচিত।
কবির বলেন,’আমাদের ভারত-মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভারতও আর দশটা দেশের মতোই একটি দেশ, এবং বাংলাদেশ তার সঙ্গে ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চায়।’ তিনি আরও যোগ করেন, “ভারতে সকালের নাস্তা, ভারতে দুপুরের খাবার, ভারতে রাতের খাবার, তারপর নিজের দেশের খাবার খাবেন কখন?”
ভারতের আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমান যোগ দেবেন না বলে বাংলাদেশের ঘোষণার দুই দিন পর এই মন্তব্যটি আসে। ঢাকা জানায়, রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, বরং বঙ্গোপসাগরীয় বহু-খাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (বিমস্টেক)-এর সভাপতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।ভারত বিমস্টেক সভাপতি হিসেবে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, যদিও ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই একটি পৃথক দ্বিপাক্ষিক আমন্ত্রণপত্রও দেওয়া হয়েছিল। দুই দিনব্যাপী ব্রিকস সম্মেলনটি রবিবার শেষ হয়েছে।
সর্বশেষ এই পরিবর্তনটি এসেছে বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করার কথা বলার কয়েকদিন পর। গত ১১ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বক্তব্যে মনি বলেন, কোন চুক্তিগুলো বহাল থাকবে, পরিবর্তন করা হবে বা বাতিল করা হবে, সে বিষয়ে সরকার শীঘ্রই সিদ্ধান্ত নেবে।
বন্ধু দেশগুলোর জাহাজকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া ব্যবস্থা নিয়ে এক আলোচনা চলাকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। মনি বলেন, সরকার পূর্ববর্তী প্রশাসনের আমলে হওয়া চুক্তিগুলো থেকে সরে আসতে চায়, যেগুলোকে তারা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করে। তিনি বন্দরের এমন নীতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন, যা তার মতে, বাংলাদেশি জাহাজের তুলনায় বিদেশি জাহাজকে বাড়তি সুবিধা দেয়।
রহমানকে ব্রিকস-এ আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে মনি বলেন, একটি স্বাধীন দেশের জন্য এটি হতাশাজনক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত তার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে ইসলামি মৌলবাদের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন৷ তারপর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।এই প্রেক্ষাপটে, কবিরের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে ঢাকা এখন অতীতের রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পরিবর্তে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নয়াদিল্লির সঙ্গে আরও সরাসরি ও বাস্তবসম্মত সম্পর্কের দিকে এগোতে চায়।
বাংলাদেশও তার পরবর্তী বড় কূটনৈতিক কর্মসূচির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে ২১শে সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সফরে যাচ্ছেন এবং ২৬শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে রহমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে কবির বলেন, বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানগুলোতে প্রায়শই শেষ মুহূর্তে এ ধরনের বৈঠক চূড়ান্ত করা হয়।
তিনি বলেন, রহমানের সফরের মূল উদ্দেশ্য হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া, তবে অন্যান্য বৈঠকের বিস্তারিত পরে স্পষ্ট হবে।
সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলো থেকে বোঝা যায় যে, ব্রিকস পর্ব এবং ভারত-সম্পর্কিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনার ঘোষণার পর বাংলাদেশ এখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে । এখন ভারত ইতিবাচক ইঙ্গিত দেবে নাকি বাংলাদেশকে ল্যাজে খেলাবে সেটাই দেখার বিষয় ।।

