এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,০৭ সেপ্টেম্বর : অস্ট্রিয়ায় নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার সাথে সাথে ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের জন্য স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করার একটি আইন কার্যকর হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, সারাদেশের সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলোতে হিজাব বা বোরখার মতো ‘ঐতিহ্যবাহী মুসলিম’ মাথা ঢাকার পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রক্ষণশীল পিপলস পার্টি (ÖVP)-র সংহতি মন্ত্রী ক্লাউডিয়া বাউয়ার বলেছেন, হিজাব হলো, ‘নিপীড়নের একটি চিহ্ন এবং একেবারে শৈশব থেকেই মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করার একটি উপায় ।’
কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, নতুন আইনটি দেশে মুসলিম-বিরোধী মনোভাব উস্কে দিচ্ছে এবং এটি অসাংবিধানিক হতে পারে।
আইনটি এনেছে তিনটি মধ্যপন্থী দল—ওভিপি, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস (এসপিও) এবং উদারপন্থী নিওস-এর রক্ষণশীল নেতৃত্বাধীন জোট। তাদের মতে, এই আইনটি “লিঙ্গ সমতার প্রতি একটি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার” এবং এর উদ্দেশ্য হলো মেয়েদের অধিকার রক্ষা করা।অস্ট্রিয়ার আনুষ্ঠানিক ইসলামী সম্প্রদায় (IGGÖ)-এর কার্লা আমিনা বাঘাজাতি এই নিষেধাজ্ঞার দৃঢ় বিরোধিতা করেছেন । তিনি বিবিসি কে বলেছেন,’আমরা মনে করি, এটি অন্যায়ভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে এবং মুসলিম মেয়েদের ওপর এর প্রভাব অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে পড়বে ।’ তিনি আরও বলেছেন,’তারা সেইসব মেয়ে ও তাদের পরিবারের আইনি লড়াইকে সমর্থন করবে, “যারা মনে করে যে তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে” এবং সাংবিধানিক আদালতে তাদের মামলা আনতে ইচ্ছুক।
এই আইন কার্যকর হওয়ার পর অস্ট্রিয়ার স্কুলগুলির শিক্ষকদের প্রতি নির্দেশ হলো, কোনো শিশুকে হিজাব পরা অবস্থায় দেখলে সেই শিক্ষার্থী এবং তার আইনসম্মত অভিভাবকের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে নতুন এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হবে।বারবার নিয়ম লঙ্ঘন হলে শিশু সুরক্ষা বিভাগকে অবশ্যই জানাতে হবে এবং শেষ উপায় হিসেবে অভিভাবকদের ৮০০ ইউরো (৬৮৫ পাউন্ড) পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
তবে কিছু শিক্ষক এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গ্রিন পার্টির সিগি মাউরার লিবারেল দল নিওস-এর শিক্ষামন্ত্রী ক্রিস্টোফ উইডারকেরের বিরুদ্ধে “নতুন সংঘাত তৈরি করে তা শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার” অভিযোগ করেছেন।তিনি বলেন, শিক্ষকরা “ইতিমধ্যেই প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছেন” এবং উইডারকেয়ার তাদের অন্যান্য দায়িত্বের পাশাপাশি “তাদের ওপর পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা চাপিয়ে দিতে” চেয়েছিলেন।
বিরোধী উগ্র-ডানপন্থী ফ্রিডম পার্টি (এফপিও) বলছে, বর্তমান নিষেধাজ্ঞাটি যথেষ্ট নয়। দলটি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের জন্যই হিজাব ও মুখাবরণ ব্যবহারের ওপর সাধারণ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানাচ্ছে।এফপিও-র রিকার্ডা বার্গার বলেছেন, “অস্ট্রিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামের কোনো স্থান নেই, এবং আমাদের স্কুলগুলোতে তো একেবারেই নয়।”
অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ও ওভিপি-র নেতা ক্রিশ্চিয়ান স্টোকার সম্প্রতি রাজনৈতিক ইসলামের ওপর সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছেন এবং অস্ট্রিয়ার সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম ওআরএফ-কে বলেছেন যে তিনি “একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে বাস করতে চান না”।
ফ্রান্সে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্কুলগুলোতে হিজাব, পাগড়ি এবং কিপ্পাসহ যেকোনো ধরনের সুস্পষ্ট ধর্মীয় প্রতীক পরিধানের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।অস্ট্রিয়ার আইনটি ফরাসি আইন থেকে এই কারণে ভিন্ন যে, এটি বিশেষভাবে মুসলিম নারীদের পরিহিত মাথা ঢাকার বিষয়টিকে লক্ষ্য করে।ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও ডেনমার্কসহ আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের মতো অস্ট্রিয়াও জনসমক্ষে পুরো মুখ ঢাকা বোরকা (নিকাব বা বুরকা) নিষিদ্ধ করেছে।
বাঘাজাতি বলেন, আইজিজিও ইউরোপ জুড়ে একটি “উদ্বেগজনক প্রবণতা” নিয়ে উদ্বিগ্ন, “যেখানে জটিল সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোকে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে প্রতীকী পদক্ষেপে পর্যবসিত করা হচ্ছে।”
উল্লেখ্য,অস্ট্রিয়ার আদালত ২০২০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিজাবের ওপর পূর্ববর্তী একটি নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দেয়, এই যুক্তিতে যে এটি অস্ট্রিয়ার ধর্মীয় নিরপেক্ষতার নীতির পরিপন্থী ছিল।।

