মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ইসলামপ্রীতি কারোর অজানা নয় । তার সময়কালে সাম্প্রদায়িক হিংসা থেকে শুরু করে পাকিস্তান বিভাজন পর্যন্ত গান্ধীর ভূমিকায় তার ইসলামপ্রীতির বেশ কিছু প্রমান মেলে । কিন্তু গান্ধী কেন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি এত দুর্বল ছিলেন ? ‘তোষামোদি রাজনীতি’ নাকি এর পিছনে অন্য কোনো রহস্য ছিল ? অধ্যাপক কে এস নারায়ণচার্য তাঁর বইতে এই সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন, যেগুলো জানা আবশ্যক ।
দাবি করা হয় যে- জহরলাল নেহেরুর পূর্বপুরুষ মুসলিম ছিলেন । তার মেয়ে ইন্দিরা নিজে ধর্মান্তরিত হয়ে একজন পার্সি মুসলিম সম্প্রদায়ের ব্যক্তিকে (ফিরোজ খান) বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু গান্ধীর জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে খুব কম লোকই জানেন…! চলুন দেখে নেওয়া যাক অধ্যাপক কে এস নারায়ণচার্য ঠিক কি কারন ব্যাখ্যা করেছেন ।
অধ্যাপক কে এস নারায়ণচার্য (Prof. K. S. Narayanacharya) তাঁর লিখিত বিভিন্ন বক্তব্য এবং মূলত “Who Really Killed Gandhi?” বইটিতে গান্ধীর মুসলিম তোষণ বা মুসলিম প্রীতির কারণ হিসেবে অত্যন্ত বিতর্কিত কিছু দাবি ও পারিবারিক পটভূমির উল্লেখ করেছেন। ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে গান্ধীর মুসলিম প্রীতির পেছনে নিম্নলিখিত কারণ ও তত্ত্বগুলো আলোচিত হয়:
১. পরাণমী সম্প্রদায়ের প্রভাব: মোহনদাস গান্ধী ছিলেন করমচাঁদ গান্ধীর চতুর্থ স্ত্রী পুতলিবাঈয়ের পুত্র। পুতলিবাঈ মূলত প্রণামী সম্প্রদায়ের ছিলেন। এই প্রণামী সম্প্রদায়টি হিন্দু ছদ্মবেশে একটি ইসলামী সংগঠন । যারা মূর্তিপূজার বিরোধী ছিল এবং যাতে মুসলিম ও হিন্দু উভয় ধর্মের উপাদানের মিশ্রণ ছিল। শৈশবে মায়ের এই ধর্মীয় রীতিনীতি গান্ধীর চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছিল।
২.পারিবারিক ও শৈশবের পরিবেশ: তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গান্ধীর পিতা করমচাঁদ গান্ধী একজন মুসলিম জমিদারের অধীনে কাজ করতেন। নারায়ণচার্যের লেখায় দাবি করা হয় যে, গান্ধীর শৈশব এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশটি গুজরাটি মুসলিম পরিবার ও পরিবেশের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল, যা তাঁর মনে মুসলিমদের প্রতি এক ধরনের স্থায়ী সফট কর্নার বা সহানুভূতির জন্ম দেয়।
৩.পারিবারিক ও শৈশবের পরিবেশ: অধ্যাপক কে এস নারায়ণচার্য উল্লেখ করেছেন যে, গান্ধীর পিতা করমচাঁদ গান্ধী একজন মুসলিম জমিদারের অধীনে কাজ করতেন। নারায়ণচার্যের লেখায় দাবি করা হয় যে, গান্ধীর শৈশব এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশটি গুজরাটি মুসলিম পরিবার ও পরিবেশের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল, যা তাঁর মনে মুসলিমদের প্রতি এক ধরনের স্থায়ী সফট কর্নার বা সহানুভূতির জন্ম দেয়।
৪.উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে মুসলিমদের ভূমিকা: অধ্যাপক নারায়ণচার্য ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, গান্ধীর লন্ডনে আইন পড়তে যাওয়া থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় ওকালতি বা আইনি প্র্যাকটিস করার পেছনে মুসলিম ব্যবসায়ী বা শুভাকাঙ্ক্ষীদের (যেমন দাদা আব্দুল্লাহ) বড় আর্থিক ও সামাজিক অবদান ছিল। লন্ডনে থাকাকালীন তিনি ‘অঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া’ নামক প্রতিষ্ঠানের সাথেও যুক্ত ছিলেন। এই দীর্ঘকালীন সংযোগের ফলেই গান্ধী তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও চরম মুসলিম তোষণ নীতি অবলম্বন করেছিলেন বলে তিনি মনে করেন।
কে অধ্যাপক কে এস নারায়ণচার্য ?
অধ্যাপক কে. এস. নারায়ণাচার্য, একজন প্রবীণ পণ্ডিত এবং বক্তা। তিনি মূলত বেঙ্গালুরু জেলার (বর্তমানে কনকপুরা) কনকনাহাল্লির বাসিন্দা ছিলেন।
তাঁর পিতা: কে. এন. শ্রীনিবাস দেশিকাচার এবং মাতা : রঙ্গনায়কম্মা। তিনি বৈদিক পণ্ডিতদের একটি পরিবারের সন্তান। মহীশূরের মহারাজা কলেজ থেকে বি.এসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। বি.এ.-এর পর তিনি আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ডব্লিউ. বি. ইয়েটস এবং টি. এস. এলিয়টের কবিতার উপর ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ.ডি সম্পন্ন করেন।
কে. এস. নারায়ণাচার্য ধারওয়াড়ের কর্ণাটক কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক এবং সেই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে বেঙ্গালুরুতে বসবাস করছেন। বেদ, রামায়ণ, মহাভারত এবং ভাগবতের উপর বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি বেন্দ্রে এবং কৌটিল্যের অর্থনীতি বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি সংস্কৃত, কন্নড় এবং ইংরেজিতে পারদর্শী। তিনি ১৮০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং ২০০টিরও বেশি বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্মসমূহ হল : বৈদিক সংস্কৃতির ভূমিকা, রামায়ণসশ্রী, গীতরত্ননিধি, রামায়ণের চরিত্রদের জগৎ, অগস্ত্য, আচার্য চাণক্য, তিরুপ্পাভাই, তিরুমালাই, স্তোত্ররত্নম, বিশিষ্টাদ্বৈতের মৌলিক ধারণা, হু কিল্ড মহাত্মা গান্ধী?
তবে শুধু নারায়ণার্যই নন, এ. ঘোষ (Arvind Ghosh)-এর বই ‘দ্য কুরআন অ্যান্ড দ্য কাফির”-এও গান্ধীর বংশপরিচয়ের উল্লেখ আছে । বইটি সানরাইজ পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত । বইটিতে তিনি লিখেছেন : মোহনদাস গান্ধীর বাবা করমচাঁদ একজন মুসলিম জমিদারের অধীনে কাজ করতেন। একবার তিনি তাঁর জমিদারের বাড়ি থেকে টাকা চুরি করে পালিয়ে যান। তখন সেই মুসলিম জমিদার করমচাঁদের চতুর্থ স্ত্রী পুতলিবাঈকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান এবং তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। মোহনদাসের জন্মের সময় করমচাঁদ গান্ধী তিন বছর আত্মগোপনে ছিলেন ।
দেশভাগের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে সংঘটিত কিছু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গান্ধীর কিছু উক্তি তার ইসলাম প্রীতির নজির বলে মনে করা হয় । দাঙ্গায় মুসলিমদের হাতে হিন্দুরা নিহত হলেও, হিন্দুদের চুপ থাকা উচিত এবং তাদের উপর রাগ করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন গান্ধী । The Collected Works of Mahatma Gandhi (CWMG)-এর ৮৭ নম্বর খণ্ডে (পৃষ্ঠা ২৫৮) নথিবদ্ধ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ৬ এপ্রিল নয়াদিল্লির এক প্রার্থনা সভায় গান্ধী বলেছিলেন: “আমাদের নিজেদের ভালোত্ব বা মানবিকতা বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। সমস্ত মুসলমান যদি বলেন যে তারা হিন্দুদের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে চান এবং আলাদা থাকতে চান, তবে আমরা কি রাগের বশে তাদের হত্যা করা শুরু করব? আমরা যদি তা করি, তবে আমরা এমন এক মহাবিপর্যয়ে পতিত হব যে আমরা সবাই ভস্মীভূত হয়ে যাব এবং কেউ বেঁচে থাকবে না… মুসলমানদের মনে যদি আমাদের ধ্বংস করার ইচ্ছাও থাকে, তবুও হিন্দুদের অন্তরে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ পোষণ করা উচিত নয়। এমনকি মুসলমানরা যদি আমাদের সবাইকে হত্যা করতে চায়, তবুও আমাদের সাহসিকতার সাথে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া উচিত। তারা যদি হিন্দুদের হত্যা করে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে, তবে আমরা আমাদের জীবন উৎসর্গ করে এক নতুন বিশ্বের সূচনা করব। কারও মৃত্যুকে ভয় পাওয়া উচিত নয়।”

