এইদিন ওয়েবডেস্ক,মুর্শিদাবাদ,০৬ সেপ্টেম্বর : মুর্শিদাবাদের সামরেসগঞ্জের ধুলিয়ানে পিতা-পুত্র হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর পুত্র চন্দন দাসকে যে কায়দায় প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলে,কার্যত ঠিক একই কায়দায় ফের খুন হয়ে গেল এক বিজেপি কর্মীকে । নিহতের নাম সুজিত মণ্ডল (৩৬) । তিনি ধুলিয়ান পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের গরুর হাটের বাসিন্দা। সুজিত বিড়ি কোম্পানিতে কাজ করতেন। পাশাপাশি সুদেরও কারবার চালাতেন বলে একাংশের দাবি ।
জানা যায়,গত ২৮ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮ টা নাগাদ বাড়ি থেকে বের হন সুজিত মণ্ডল । এরপর তিনি নিখোঁজ হয়ে যান । ওইদিন সন্ধ্যায় সামসেরগঞ্জ থানায় নিখোঁজ ডাইরি করে পরিবার । পরিবারের দাবি, তাদের কাছে মুক্তিপণ বাবদ ৫ লক্ষ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ । বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে থানায় জানানো হলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ । প্রায় কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে ফরাক্কার বল্লালপুর ফিডার ক্যানেল ঘাট থেকে তাঁর টুকরো টুকরো দেহ উদ্ধার করা হয়।
শুধু নিহতের পরিবারই নয়,সামরেসগঞ্জের পুলিশের ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভে প্রকাশ করেছেন জঙ্গিপুরের বিজেপি বিধায়ক চিত্ত মুখার্জি । আজ তিনি নিহতের পরিবারকে সান্ত্বনা জানাতে ধুলিয়ান পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে নিহতের বাড়ি যান । পরে তিনি মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে কেঁদে ফেলেন। চিত্ত মুখার্জি বলেন,’ সুজিত মণ্ডল আমাদের দলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন । বলা হচ্ছে তার একটা পা টুকরো টুকরো করা হয়েছে ।’ তিনি বলেন,’ধুলিয়ানে বারবার হিন্দু খুন হচ্ছে । কিন্তু বিজেপির যুগে যে এরকম দেখব কখনো ভাবি নি । আমি পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়ায় খুব একটা সন্তুষ্ট নই । তবে এই বিষয়ে আমি মিডিয়ার সামনে মুখ খুলবো না।’
চিত্তবাবু বলেন,’যে বাড়িতে সুজিতকে খুন করে টুকরো টুকরো করা হয়েছে, সেই বাড়িতে ওকে নিয়ে যাওয়ার মুহুর্ত সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে৷ এরপরে ওই বাড়ির কি সিজ করা হয়েছে তা আমি জানি না । আমি নিজে একজন আইনজীবী । বিষয়টি আমি মুখ্যমন্ত্রীকে জানাব । মেয়েটার(মৃতের স্ত্রী) এখন প্রচন্ড দুর্দিন । সে এখন দুটো বাচ্ছা নিয়ে অথৈ জলে পড়েছে । হাউহাউ করে কাঁদছে । সহ্য করা যায়না, এমন একটা অবস্থা ।’ একথা বলে তিনি কেঁদে ফেলেন। তিনি আরও জানান,নিহতের স্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সিবিআই তদন্ত আর নিজের এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের বিষয়ে সহায়তার দাবি করেছেন ।
পাশাপাশি জঙ্গিপুরের বিজেপি বিধায়ক চিত্ত মুখার্জি সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খুনের ঘটনায় পোস্ট করেছেন, ‘আজকে হঠাৎ ধূলিয়ান গেছিলাম। নিহত সুজিতের বাড়িতে তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে যা শুনলাম তা হলো ভয়াবহ ষড়যন্ত্র করে খুন। ছেলেটি খুব ভালো ছিল। কোনও নেশা,বদ অভ্যাস ছিল না।সুদে টাকা খাটানো একেবারে মিথ্যা। উপকার করতে নিজের কষ্টার্জিত টাকা ধার দিতো।যারা খুন করেছে তাদের ধরেছে পুলিশ।আরও সহযোগী আছে। স্থানীয় লোকজন বললেন পুলিশের কাছে সব সিসিটিভি ফুটেজ আছে। কোথা থেকে খারাপ কিছু হতে পারে পরিবারের লোকেরা সমস্ত বলেছিল। দুপুরে খুনীরা দু বার ফোন করে ৫ লাখ টাকা দাবী করে,তখন এরা থানায় ছিল। দারোগা বাবু লোকেশন দেখা বা সঙ্গে সঙ্গে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া কিছুই করেন নি বলে অনেকে অভিযোগ করলেন।’
তিনি লিখেছেন,’কয়েক জন বলছেন সুজিত এমন কিছু দেখেছিল বা জেনেছিল যে ওকে কায়দা করে নিয়ে গিয়ে খুন করেছে। শুধু তাই নয় আগে থেকেই ব্যাগ, খুন করার জন্য ধারালো অস্ত্র এবং ধরবার লোক সব আনা হয়েছিল ঐ ঘরটায়। প্রশ্ন উঠেছে এ ঘর কার? কে ভাড়া ছিল? পুলিশ ঐ ফুটেজ, মেঝেতে রক্ত বা কোনো কিছু পেলেন ও সংগ্রহ করেছেন কিনা?একটা খুব পরিষ্কার, সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের কথায় গুরুত্ব দিলে দুপুরের পর খুন থেকে বেঁচে যেতে পারতো হতভাগা ছেলেটা।’ তিনি আরও লিখেছেন,’জাফরাবাদেও ইচ্ছা করে সময় দেওয়া হয়েছিল। এদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটাও ওদিকেই।
সুজিতের স্ত্রী সিবিআই চেয়েছেন। নিজের ও দুই নাবালক শিশুর ভবিষ্যৎ সরকার কে দেখতে আবেদন জানিয়েছেন। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা জন প্রতিনিধি যান নি ঐ বাড়িতে। সুজিতের স্ত্রী জানে না সে সধবা না বিধবা! হাতে শাঁখা সিঁথি ভর্তি সিঁদুর।’
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৮ আগস্ট সকাল ৮ টা নাগাদ সুজিতের কাছে একটি ফোন আসে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। তারপর থেকে নিখোঁজ। ঘটনার দিন রাখি পূর্ণিমা থাকায়, স্ত্রীকে তাঁর বাবার বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে জানান তিনি পরে যাবেন। কিন্তু আর যাননি।পরিবার জানিয়েছে, নিখোঁজ হওয়ার পর অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা সুজিতের ফোন ব্যবহার করে তাঁর ছেলের কাছে ফোন করেন। ৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে তারা। বিষয়টি পুলিশকে জানায় পরিবার।
তবে অভিযোগ, প্রথমে পুলিশ বিষয়টিকে পাত্তা দেয়নি। জেনারেল ডায়েরি করে ফেলে রাখা হয়। ২৯ আগস্ট সন্ধ্যায় গ্রামবাসীরা থানায় বিক্ষোভ দেখালে পুলিশের সঙ্গে বিজেপিকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের ধস্তাধস্তি হয়, কয়েকজনকে আটকও করা হয়।
জানা গেছে,এ দিকে তদন্ত শুরু হওয়ার পর পুলিশ গত দু’দিনে এক মহিলা-সহ দু’জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারপরই উঠে আসে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আটক হওয়া মহিলার সঙ্গে সুজিতের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। ওই মহিলার আবার অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। অভিযোগ, সুজিত মহিলাকে ব্ল্যাকমেল করছিলেন।
পুলিশকে অনুমান, তাই প্রেমিকের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুজিতকে সরানোর পরিকল্পনা করে ওই মহিলা। এই ঘটনায় ওই মহিলা ও তাঁর পুরুষ সঙ্গীকেও আটক করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।।

