এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,৩১ জুলাই : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা যুদ্ধ অবসানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, হামাসের অস্ত্র ত্যাগ এবং ইসরায়েলের গাজা থেকে পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। তবে, হামাস বা ইসরায়েল কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি নিশ্চিত করেনি।
মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার প্রায় নয় মাস পর এই ঘোষণাটি এলো। যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্বের বাস্তবায়ন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার পুনর্গঠন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আলোচনা কয়েক মাস ধরে স্থবির হয়ে ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেছেন, “এই চুক্তিটি সুচিন্তিত কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। হামাস নিরস্ত্র হলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজা থেকে সরে যাবে। এরপর, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী এবং নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করবে।”
ট্রাম্পের ২০-দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় হামাসকে তাদের সমস্ত অস্ত্র সমর্পণ করতে, গাজাজুড়ে নির্মিত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে, ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করতে, কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠন করতে এবং একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে বিধ্বস্ত গাজার পুনর্গঠনও এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে, হামাস এযাবৎ বলেছে যে, যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায় পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেই তারা তাদের অস্ত্র সমর্পণ নিয়ে আলোচনা করবে। যেহেতু হামাসের মূল দর্শন হলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম, তাই সংগঠনটি এ পর্যন্ত রকেট, ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিস্ফোরকসহ তাদের সামরিক সক্ষমতা ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক । তবে, চলতি মাসের শুরুতে হামাস ঘোষণা করেছে যে, তারা গাজায় তাদের প্রশাসন ভেঙে দিয়েছে এবং জাতিসংঘের সমর্থিত একটি কারিগরি কমিটির কাছে নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করতে প্রস্তুত, যা যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
হোয়াইট হাউসের নির্দেশিকা অনুযায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন কর্মকর্তা এবং ‘বোর্ড অফ পিস’-এর কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্পের রূপরেখা অনুযায়ী চুক্তিটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।তিনি বলেছেন, গাজা পুলিশ বাহিনী আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি নতুন কারিগরি প্রশাসনের কাছে তাদের অস্ত্রশস্ত্র হস্তান্তর করবে। তবে, কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে গাজা বাহিনীর কাছে থাকা অস্ত্রের পরিমাণ সীমিত এবং হামাসের অধিকাংশ সন্ত্রাসী ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়।
বোর্ড অফ পিসের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, হামাসের ভারী অস্ত্রের আত্মসমর্পণ, সুড়ঙ্গগুলো নিষ্ক্রিয় করা এবং সামরিক অবকাঠামো সরিয়ে নেওয়ার কাজগুলো পরবর্তী পর্যায়ে সম্পন্ন হবে, যা ২০০ থেকে ৩৫০ দিন পর্যন্ত সময় নিতে পারে।
একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার মতে,আলোচনার প্রতিটি পর্যায়ে ইসরায়েলি সরকারকে আস্থায় নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, হামাস সত্যিই অস্ত্র ত্যাগ করবে কি না, সে বিষয়ে ইসরায়েলের এখনও সন্দেহ থাকলেও, ট্রাম্পের উপস্থাপিত মূল পরিকল্পনার শর্তাবলির বাইরে তারা ইসরায়েলের কাছে অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি চায়নি।
এর মধ্যে গাজা থেকে বাহিনী প্রত্যাহার এবং বিমান হামলা বন্ধ করার ইসরায়েলি প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে, এ বিষয়ে ইসরায়েলের জাতিসংঘ মিশন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
অন্যদিকে, মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, হামাস সমর্থক ইরান এই প্রক্রিয়ায় একটি অনিশ্চিত বিষয় হয়ে রয়েছে। যদিও ইরান হামাসকে এই চুক্তি গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হামাসকে খুব বেশি সমর্থন দেওয়ার মতো অবস্থানে ইরান নেই।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে পনবন্দি করা হয়। এর জবাবে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল একটি ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যাতে গাজায় ৭৩,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বর্তমানে গাজার অর্ধেকেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি অস্থায়ী তাঁবু শিবির এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শহরাঞ্চলে বসবাস করছে। এমন পরিস্থিতিতে, আগামী দিনগুলোতে এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে ট্রাম্পের ঘোষিত চুক্তিটি গাজায় একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি তা আরও একটি দীর্ঘ আলোচনা পর্বেই সীমাবদ্ধ থাকবে।।
