বাংলাদেশে ইসলামি উগ্রপন্থীদের হুমকি থেকে বাঁচতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন মুক্তমনা ভ্লগার ও প্রাক্তন মুফতি আবদুল্লা আল মাসুদ । তিনি ২০১৮ সালে বৈধ ভিসায় ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু ২০২০ সালে তাঁর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই নদীয়া জেলার গয়েশপুরে ভারতে গোপনে বসবাস করছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর ধরে এভাবে থাকার পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করে কল্যাণী থানার গয়েশপুর ফাঁড়ির পুলিশ । তারপর দীর্ঘ কয়েক মাস জেল হেফাজত । অবশেষে রাজ্যে পালাবদলের পর বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে জেল থেকে মুক্ত হন তিনি । তারপর থেকে অন্তরালে চলে যান মাসুদ । কয়েক মাস সোশ্যাল মিডিয়াতেও সক্রিয় ছিলেন না । অবশেষে গতকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় ফের সক্রিয় দেখা যায় তাকে । একটা দীর্ঘ পোস্ট করেছেন আবদুল্লা আল মাসুদ । যার প্রতি ছত্রে ছত্রে ঝড়ে পড়েছে মর্মস্পর্শী বেদনার ছবি এবং বাংলাদেশের মৌলবাদী ও পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রতি তীব্র ঘৃণা !
মাসুদ লিখেছেন,”আমার কারামুক্তির আজ ৩৪ তম দিন। আমাকে ধ্বংস করে দেওয়ার সব রকম চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু আমি ধ্বংসস্তূপ থেকেই আবার জেগে উঠেছি! শিশুকাল থেকেই ‘মাদ্রাসা’ নামক কারাগারে বন্দি ছিলাম, তাই কারাগার আমার কাছে নতুন কিছু নয়। পার্থক্য শুধু একটাই—বাংলাদেশের সেই কারাগার (মাদ্রাসা) ছিল আমার ভেতর ইসলাম ইনপুট করার উদ্দেশ্যে, আর ভারতের এই কারাগারে আমাকে আটক করা হয়েছিল ইসলামকে অস্বীকার করার অপরাধেই।”
তিনি লিখেছেন,”ইসলামপন্থী ‘মমতাজ’ ব্যানার্জির ইসলামিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ৩রা নভেম্বর ২০২৫ থেকে ১৭ই জুন ২০২৬ পর্যন্ত আমাকে কারাবন্দী থাকতে হয়। চরমপন্থী ইসলামিক দলের পতনের পর অবশেষে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে আমি জামিন পেয়েছি। মমতাজ ব্যানার্জির চোখে আমার প্রধান ‘অপরাধ’ ছিল মূলত চারটি:
১. বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হওয়া।
২. ইসলামের বর্বরতার বিরুদ্ধে বই লেখা, ব্লগ লেখা এবং ইউটিউবে লাইভ করা।
৩. বাংলাদেশ থেকে ইসলামিক অনুপ্রবেশকারী ঢুকিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডেমোগ্রাফি বদলে দেওয়ার ‘মমতাজী’ চক্রান্তের প্রতিবাদ করা।
৪. ভারতের পক্ষে এবং পাকিস্তান-মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা।”
মাসুদ লিখেছেন,”আমাকে নিয়ে যেন কোনো খবর প্রকাশ না হয়, সেজন্য মমতাজ ব্যানার্জির ইসলামিক দল সক্রিয় ছিল। ৪ঠা মে, ২০২৬-এর আগে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিকরা ভয়ে একপ্রকার নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন।কারাগারের ভেতরে আমাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং আমি এখনও পুরোপুরি হুমকিমুক্ত নই। আলম নামের যে জঙ্গি আমাকে জেরা করেছিল, তার কথাবার্তায় স্পষ্ট বুঝেছিলাম যে, বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সাথে তার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই আলম এবং আরও বেশ কিছু ইসলামিক মৌলবাদী অফিসার এখনও পশ্চিমবঙ্গের পুলিশে চাকরিতে বহাল আছে!”
তিনি লিখেছেন,”এখনও সব কথা বলার সময় আসেনি, কারণ আমি এখনও বিপদমুক্ত নই। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারছি না। তবে আমাকে বেশিদিন দমিয়ে রাখা যাবে না। আজ হোক বা কাল, এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য আমি জনসমক্ষে আনব, যা শুনলে আপনারা শিউরে উঠবেন। এই চরম বিপদের দিনে বাংলাদেশ ও ভারতের অসংখ্য মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে সবার নাম প্রকাশ করছি না, তবে এই মহৎ মানুষগুলোর প্রতি আমার আজীবনের বিনম্র কৃতজ্ঞতা থাকবে।আমার কারাজীবনের গল্প নিয়ে বই লেখা হচ্ছে। আশা করছি, দু-এক মাসের মধ্যেই বইটি আপনারা হাতে পেয়ে যাবেন। ধন্যবাদ সবাইকে।”
আবদুল্লা আল মাসুদ একসময় ঢাকার কাফরুল মসজিদের ইমাম ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ধর্মান্তরিত হয়ে বা ধর্ম ত্যাগ করে তিনি নাস্তিকতা ও যুক্তিবাদী মতবাদ প্রচার শুরু করেন।মাসুদ নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে নাস্তিকতার দর্শন নিয়ে নানা ভিডিয়ো আপলোড করতেন । ইসলামি চরমপন্থীদের মুখোশ খুলে দিতেন ওই সমস্ত ভিডিও-তে । যেকারণে নিজের দেশে কট্টরপন্থীদের রোষানলে পড়েন তিনি । প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় তাকে । প্রাণ বাঁচাতে ২০১৮ সালে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসেন তিনি। ২০২০ সালে মাসুদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তার পরেও বাংলাদেশ ফেরেননি তিনি।পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় থেকেছেন। শেষে নদীয়ার চাকদহের একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধানশিক্ষকের গয়েশপুরের বাড়িতে ভাড়া থাকছিলেন । কিন্তু কেউ বা কারা তার অবস্থান নিয়ে থানার গয়েশপুর ফাঁড়িতে অভিযোগ জানান । তখন রাজ্যে শাসনক্ষমতায় তৃণমূল কংগ্রেস এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি । সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে দ্রুত আটক করে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় । যদিও মাসুদকে আটকের দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিবাদ হলে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ । কিন্তু ডিসেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয় । যদিও শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরেই জেল থেকে মুক্ত হন মাসুদ । তারপর থেকে ফের তিনি অন্তরালে চলে যান। আবদুল্লা আল মাসুদের প্রোফাইল অনুযায়ী তার বর্তমান ঠিকানা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু । বর্তমানে সেখানেই তিনি বসবাস করছেন বলে মনে করা হচ্ছে ।।
