এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,১২ জুন : কেন উইঘুর মুসলিমদের উপর চীনের কমিউনিস্ট সরকার দমনপীড়ন চালায়,তার প্রমান মিলেছিল ২০১৫ সালের ১৭ই আগস্ট থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় । ব্যাংককের বিখ্যাত ইরাওয়ান মন্দিরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ২০ জন পূণ্যার্থীকে হত্যা এবং ১২০ জনেরও বেশি আহত করেছিল চীনের মুসলিম উইঘুর সম্প্রদায়ের দুই সন্ত্রাসী । সম্প্রতি একটি থাই আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অবস্থিত ইরাওয়ান মন্দিরটি হিন্দু দেবতা ভগবান ব্রহ্মার প্রতি উৎসর্গীকৃত এবং এখানে বিপুল সংখ্যক চীনা পর্যটক আসেন। দোষী সাব্যস্ত দুই সন্ত্রাসবাদী হল ইউসুফু মিয়ারাইলি এবং বিলাল মহম্মদ। বিস্ফোরণের পরপরই দুজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৫ সালের ১৭ই আগস্ট বিস্ফোরণের পরপরই ইউসুফু ও বিলালকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং অবৈধভাবে বিস্ফোরক দ্রব্য রাখার মতো বেশ কয়েকটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। তদন্তকারী সংস্থাগুলো দাবি করে যে, ভিডিও ফুটেজ, আঙুলের ছাপ এবং অন্যান্য প্রমাণ সরাসরি তাদেরকে বিস্ফোরণের সাথে যুক্ত করেছে। ব্যাংকক সাউথ ক্রিমিনাল কোর্টের চার বিচারপতির একটি বেঞ্চ তাদের রায়ে করে জানায় যে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ও জোরালো প্রমাণ রয়েছে। যদিও
অভিযুক্ত ব্যক্তরা নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছে । আদালত আরও জানায় যে, দুই অভিযুক্ত তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খণ্ডন করার মতো কোনো জোরালো প্রমাণ আত্মপক্ষ সমর্থনে উপস্থাপন করতে পারেননি। রায় ঘোষণার পর, ইউসুফু মিয়ারাইলি ভাঙা ভাঙা থাই ভাষায় নিজেকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করে এবং বলেন, “আমি এই রায় মানি না। আমি নির্দোষ। আমি ন্যায়বিচার পাইনি। আমি থাইল্যান্ডের জনগণের কাছে আমাকে সাহায্য করার জন্য আবেদন জানাচ্ছি।” মিয়ারাইলির আইনজীবীর মতে, সে কারাগারে থাকাকালীন থাই ভাষা শিখেছে। সে ইংরেজিও বলতে পারে।
ভাষাগত সমস্যার কারণে বিচারকার্য বেশ কয়েকবার স্থগিত করা হয়েছিল। শুনানির সময়, ইউসুফু সহ-অভিযুক্ত বিলাল মহম্মদের জন্য উইঘুর ভাষায় অনুবাদও করেছিলেন, কারণ আদালতে কেবল একজন ইংরেজি দোভাষী উপলব্ধ ছিলেন। উপযুক্ত অনুবাদকের অভাবে বিচারকার্য বেশ কয়েকবার স্থগিত করা হয়েছিল। আসামিপক্ষের আইনজীবী চুচার্ট কানপাই বলেন যে আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে, কারণ মামলার বেশ কয়েকটি দিক যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে যে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় উভয় অভিযুক্তই তাদের অপরাধ স্বীকার করেছিল, কিন্তু ২০১৬ সালে বিচার শুরু হলে তারা নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করে।
২০১৯ সালে মামলাটি একটি সামরিক আদালত থেকে ব্যাংকক সাউথ ক্রিমিনাল কোর্ট নামক একটি বেসামরিক আদালতে স্থানান্তর করা হয়। অভিযুক্তরা গ্রেফতারের পর কারাগারে নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগ করেছিল। তবে, আদালত তার রায়ে জানায় যে নির্যাতনের অভিযোগের সমর্থনে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দ্বারা বলপ্রয়োগের কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
ইরাওয়ান মন্দিরে সন্ত্রাসী হামলা
এই হামলায় সাতজন চীনা নাগরিক নিহত হন।আদালতের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, ২০১৫ সালের ওই সন্ত্রাসী হামলায় সাতজন চীনা নাগরিকসহ ২০ জন নিহত এবং ১০০ জনেরও বেশি আহত হন। তিনি বলেন, হামলাকারীরা অত্যন্ত অমানবিক ও জঘন্য অপরাধ করেছে এবং চীন আইন অনুযায়ী অপরাধীদের বিচার ও কঠোর শাস্তি প্রদানে থাইল্যান্ডের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।
তবে, বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা বিচার প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফ্রান্স-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা (ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস) এই মামলায় মানবাধিকার ও যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ২০২৩ সালে জাতিসংঘে একটি আবেদন জমা দেয়। সংস্থাটি গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি এবং অভিযুক্তদের প্রতি কথিত বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, বিস্ফোরণের ঘটনায় মোট ১৭ জন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হলেও মাত্র তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
ইউসুফ বিস্ফোরণটি ঘটায়, বিলাল বিস্ফোরকগুলো স্থাপন করে
প্রমাণের অভাবে ২০২৪ সালে এক থাই নারীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। তদন্তকারী সংস্থাগুলো জানায়, ইউসুফ মিয়ারাইলি বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটায়, আর বিলাল মহম্মদ,যে আদেম কারাদাগ নামেও পরিচিত, বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট আগে মন্দির চত্বরে বিস্ফোরক ভর্তি একটি ব্যাগ রেখে দেয়।
বিস্ফোরণের পেছনের উদ্দেশ্য
বিস্ফোরণের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন দাবি উঠেছে। থাই কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১৫ সালে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের বড় ধরনের অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে একটি মানব পাচারকারী চক্র এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। সেই একই বছর, থাইল্যান্ড -মালয়েশিয়া সীমান্ত বরাবর জঙ্গলে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য নির্মিত বেশ কয়েকটি পরিত্যক্ত শিবির আবিষ্কৃত হয়।
তবে, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে থাইল্যান্ড কর্তৃক বহু উইঘুরকে জোরপূর্বক চীনে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় ক্ষুব্ধ উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষ থেকে এই হামলাটি একটি প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কথিত দমন-পীড়ন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচতে বিপুল সংখ্যক উইঘুর পেশাদার পাচারকারীদের সহায়তায় চীন থেকে পালানোর চেষ্টা করে। থাইল্যান্ডও ২০২৫ সালে ৪০ জন উইঘুর শরণার্থীকে চীনে ফেরত পাঠিয়েছিল, যে পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।।
