আফগানিস্তানের শাসক তালেবান মেয়েদের বিয়ের কোনো ন্যূনতম বয়সসীমা ছাড়াই একটি নতুন পারিবারিক আইন চালু করেছে, যার ফলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে এই নিয়ম আফগানিস্তানে বাল্যবিবাহকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করেছে ।আফগানিস্তানে ইউএন উইমেনের বিশেষ প্রতিনিধি সুসান ফার্গুসন বলেছেন, সংস্থাটি ক্ষমতায় ফেরার প্রায় পাঁচ বছর পর নারী অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে নতুন এই আইনটি ‘আরেকটি গুরুতর ঘটনা’।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, এই বিধিমালায় বিবাহের জন্য ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা হয়নি এবং এটি ২০২১ সালের আগস্টে তালেবানদের ক্ষমতা দখলের আগে বলবৎ থাকা আইন থেকে একটি বিচ্যুতি, যখন আফগানিস্তানে জোরপূর্বক বাল্যবিবাহকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।ফার্গুসন বলেছেন, ‘বাল্যবিবাহকে বৈধ বলে ইঙ্গিত করার মাধ্যমে এই প্রথাটি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় ।’
ইউএন উইমেনের মতে, নতুন প্রবিধানে এর পরিবর্তে এমন পদ্ধতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো শিশু বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর তার সাথে জড়িত বিয়ে বাতিল করা যেতে পারে ।
তালিবানদের ‘স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের নীতিমালা’ নামক ৩১-অনুচ্ছেদ বিশিষ্ট প্রবিধানটিতে অগণিত ধর্মীয় ও আইনি শর্তের অধীনে বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত নিয়মাবলীর রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাল্যবিবাহ, স্তন্যপান করানো অবস্থায় সম্পর্ক, জোরপূর্বক বিচ্ছেদ, স্বামীর নিখোঁজ হওয়া, ধর্মত্যাগ এবং ব্যভিচারের অভিযোগ।
‘খিয়ার আল-বুলুগ’ (‘বয়ঃসন্ধিকালীন বিকল্প’) শীর্ষক অধ্যায়টির উপর বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে; এটি একটি ইসলামী আইনগত বিধান যা শৈশবে সম্পাদিত বিবাহকে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর পর বাতিল করার অনুমতি দেয়।ধারা ৫ অনুযায়ী, যদি কোনো শিশুর বিয়ে তার বাবা বা দাদু ছাড়া অন্য কোনো আত্মীয়ের দ্বারা ঠিক করা হয়, তবে তা আইনত বৈধ হবে, যদি পাত্র-পাত্রী সামাজিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হন এবং যৌতুক যথাযথ হয়।
স্বাধীন আফগান সংবাদমাধ্যম আমু টিভির তথ্যমতে, প্রবিধানে বলা হয়েছে যে শিশুটি বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর পর বিবাহ বাতিলের জন্য আবেদন করতে পারবে, তবে তা কেবল আদালতের আদেশের মাধ্যমেই সম্ভব।এই নিয়মাবলীতে পরিবারের কর্তাদের বাল্যবিবাহের বিষয়ে ব্যাপক কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, তবে এতে বলা হয়েছে যে অভিভাবকরা অত্যাচারী, মানসিকভাবে অক্ষম বা নৈতিকভাবে ভ্রষ্ট বলে বিবেচিত হলে বিবাহ বাতিল করা যেতে পারে।
বেশ কয়েকটি বিধান কঠোর অভিভাবকত্বকে সমর্থন করে, বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৭, যা বিবাহের সম্মতির ক্ষেত্রে একটি দ্বৈত মানদণ্ড স্থাপন করে।দলিলটিতে বলা হয়েছে যে, একজন ‘কুমারী মেয়ের’ নীরবতাকে বিবাহে সম্মতি হিসেবে গণ্য করা হয়, অথচ একজন পুরুষ বা পূর্বে বিবাহিত মহিলার ক্ষেত্রে একই নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে গণ্য করা হয় না।আর আফগানিস্তানে, যেখানে নারী ও মেয়েরা শাস্তির ভয়ে মুখ খুলতে চায় না, সেখানে এই নতুন আইনটি অনেক মেয়েকে আটকা পড়ার ঝুঁকিতে ফেলবে।
এই আইনটি তালেবান বিচারকদেরকে ধর্মত্যাগ, ‘ইসলাম থেকে বিমুখ হওয়া’, স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং ব্যভিচারের অভিযোগের মতো বিষয় সম্পর্কিত বৈবাহিক বিবাদে হস্তক্ষেপ করার ব্যাপক ক্ষমতাও দেয়।এতে বিশেষভাবে ‘জিহার’-এর উল্লেখ আছে, যা একটি চিরায়ত ইসলামিক ধারণা, যেখানে স্বামী তার স্ত্রীকে কোনো নিষিদ্ধ নারী আত্মীয়ের সাথে তুলনা করে। এই ধারার অধীনে, বিচারকরা স্বামীদের ধর্মীয় শাস্তি পালনে বাধ্য করতে পারেন অথবা বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর করতে পারেন। এই বাধ্যবাধকতা কার্যকর করতে তাঁরা কারাদণ্ড ও শারীরিক শাস্তি ব্যবহার করতে পারেন।
এই লেখায় ইসলামী আইন অনুযায়ী ‘দুগ্ধ সম্পর্ক’ সংক্রান্ত বৈবাহিক বিধিনিষেধও আলোচনা করা হয়েছেযেহেতু একই মহিলার স্তন্যপানকারী সন্তানদের ভাইবোন হিসেবে গণ্য করা হয়, তাই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই সম্পর্কটি আবিষ্কৃত হলে বিচারকদের বিবাহ বাতিল করার অনুমতি দেওয়া হয়।এই প্রবিধানমালায় দীর্ঘ সময় ধরে স্বামী নিখোঁজ থাকার ক্ষেত্রে করণীয় কার্যপ্রণালীরও রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, যা নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়।
২০২১ সালের আগস্টে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তালেবানরা নারী ও মেয়েদের ওপর দমনমূলক বিধিনিষেধ আরোপ অব্যাহত রাখায় নতুন নিয়মগুলো এসেছে।নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর থেকে তালেবানরা মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর পড়াশোনা নিষিদ্ধ করেছে এবং নারীদের কাজ ও চলাচলের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
চলতি বছরের শুরুতে তালেবানরা একটি নতুন দণ্ডবিধি চালু করেছে, যা একটি বর্ণপ্রথা তৈরি করে নারীদের ‘দাসী’র সমপর্যায়ে রেখেছে।
নতুন আইন অনুযায়ী, গুরুতর শারীরিক আঘাত না হলে স্বামীরা তাদের স্ত্রীকে মারধর করতে পারবে।
ধারা ৩২ অনুযায়ী, কেবলমাত্র যদি স্বামী লাঠি দিয়ে স্ত্রীকে প্রহার করে এবং এর ফলে ‘ক্ষত বা শারীরিক আঘাত’-এর মতো গুরুতর জখম হয়, এবং স্ত্রী তা বিচারকের সামনে প্রমাণ করতে পারেন, তবেই স্বামীকে পনেরো দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।তবে, এখানে একটি বৈপরীত্য রয়েছে যে, একজন মহিলাকে একদিকে যেমন সম্পূর্ণ আবৃত থাকতে হয়, তেমনই অন্যদিকে বিচারকের কাছে নিজের আঘাতও প্রমাণ করতে হয়।তার সাথে একজন পুরুষ অভিভাবক থাকাও আবশ্যক, যিনি সাধারণত স্বয়ং স্বামীই হন।
নতুন আইনটিতে নারীদের বিরুদ্ধে যৌন বা মানসিক হিংসার নিন্দা বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।
এছাড়াও, এই আইনটি নারীদেরকে পারিবারিক হিংসা থেকে বাঁচতে পরিবারের কাছে আশ্রয় নিতে বাধা দেয়।আইনের ৩৪ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো নারী যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া বারবার তার বাবার বাড়ি বা অন্য কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে যান এবং স্বামীর অনুরোধ সত্ত্বেও বাড়ি না ফেরেন, তবে তাকে তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরাও শাস্তির সম্মুখীন হবেন।
আফগানিস্তানে ইসলামী আইন এতটাই কঠোর হয়ে উঠেছে যে, পুরুষদের দাড়ি খুব ছোট করে কাটার জন্য নাপিতদেরও আটক হতে হচ্ছে ।জানুয়ারিতে, সৎকাজের প্রচার ও অসৎকাজের নিষেধ মন্ত্রণালয় পূর্বের একটি আদেশের ওপর আরও জোর দিয়ে বলেছে যে, এখন থেকে মুষ্টির চেয়ে লম্বা দাড়ি রাখা ‘বাধ্যতামূলক’। মন্ত্রী খালিদ হানাফি বলেছেন, জাতিকে শরিয়া বা ইসলামী আইন অনুযায়ী গড়ে তোলার জন্য পথপ্রদর্শন করা সরকারের দায়িত্ব।সদ্গুণ প্রচারের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা ইসলামী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য, তিনি বলেন।নভেম্বরে প্রকাশিত ইমামদের জন্য আট পৃষ্ঠার একটি নির্দেশিকায়, নামাজের নেতাদেরকে তাদের খুতবায় দাড়ি কামানোকে ‘বড় পাপ’ হিসেবে বর্ণনা করতে বলা হয়েছে।
শিশু কন্যাদের বিয়ের বিষয়ে বিভিন্ন দেশের ইসলামিক পন্ডিতের বক্তব্য
শিশুকন্যাদের বিবাহের বিষয়ে শুধু তালেবানই নয়,তুরস্কের ধর্ম বিষয়ক অধিদপ্তর (দিয়ানেত) ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে জানায় যে, ইসলামী আইন অনুযায়ী নয় বছর বয়সী মেয়েরাও বিয়ে করতে পারে।ইসলামী পরকালবিদ্যার অধ্যাপক এবং নাইজেরিয়ার মুসলিম রাইটস কনসার্নের পরিচালক ইসহাক আকিনতোলার কথায়,“ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে বয়সের কোনো বাধা নেই এবং যারা এটি মানতে অস্বীকার করে, মুসলমানরা তাদের জন্য ক্ষমা চায় না ।”
ইসলামী আইন বিষয়ে ইরাকি বিশেষজ্ঞ ডঃ আবদ আল-হামিদ আল-উবেইদি বলেছেন,“ইসলামী আইনে নারী বা পুরুষ কারোর জন্যই বিয়ের কোনো ন্যূনতম বয়সসীমা নেই। অনেক দেশের আইন অনুযায়ী মেয়েরা কেবল ১৮ বছর বয়স থেকে বিয়ে করতে পারে। এটি একটি স্বেচ্ছাচারী আইন, ইসলামী আইন নয়।”
বিশিষ্ট ধর্মগুরু এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় পরিষদের সদস্য ডঃ সালিহ বিন ফাওজানের কথায়,”মেয়েদের বিয়ের জন্য কোনো ন্যূনতম বয়সসীমা নেই । যেকোনো বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যেতে পারে।” পাকিস্তানের ইসলামিক আদর্শ পরিষদ জানায়,“ইসলাম অল্পবয়সী শিশুদের বিয়ে নিষিদ্ধ করে না।”
