ইসলামি রাষ্ট্র মৌরিতানিয়ায়, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে, ‘লেব্লুহ’ (Leblouh) বা ‘গ্যাভেজ’ (Gavage) নামে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও ঐতিহ্যবাহী প্রথা প্রচলিত আছে। এটি মূলত অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ের যোগ্য করে তোলার জন্য জোর করে অতিরিক্ত খাবার খাইয়ে দ্রুত মোটা করার প্রক্রিয়া। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী মেয়েদের দৈনিক ১৪,০০০ থেকে ১৬,০০০ ক্যালোরি সমপরিমাণ খাবার (যেমন: প্রচুর পরিমাণে উটের দুধ, বাজরা এবং মাখন) খেতে বাধ্য করা হয়। এই প্রথাটি ১১ শতক থেকে প্রচলিত, যা তুয়ারেগ ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মৌরিতানীয় সমাজে স্থূলতাকে সম্পদ, সৌন্দর্য এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, মোটা মহিলারা বেশি কাম্য এবং তাদের স্বামীরা যথেষ্ট ধনী, যা বিয়ের ক্ষেত্রে সুবিধা প্রদান করে।
কিন্তু প্রথম দিকে শিশুকন্যারা খেতে অস্বীকৃতি জানালে চলে চরম মাত্রার নিপীড়ন। তাদের শারীরিক শাস্তি দেওয়া হয়, যেমন দুই আঙুলের মাঝখানে ফাটা বাঁশ বা দুটি লাঠি দিয়ে চেপে ধরা (Zayar)। বয়স্ক মহিলারা ওই শিশুকন্যাটিকে ঘিরে ধরে একটি বাটি ভর্তি উচ্চ ক্যালরি যুক্ত পানীয় পান করার জন্য জোর জবরদস্তি করে । মেয়েটি খেতে অস্বীকৃতি জানালে তার পায়ে ফাটা বাঁশের মাঝে তার পায়ের আঙুল চেপে ধরে নির্যাতন চালানো হয় । শিশু কন্যাটি যন্ত্রণায় কাতরালেও তাকে রেহাই দেওয়া হয় না, যতক্ষণ না সে নির্দিষ্ট পানীয় পান করছে । শরিয়া আইন প্রয়োগকারী একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রে এই ঐতিহ্যবাহী প্রথাটি এখনও প্রচলিত আছে।
এই দেশেই আবার বিবাহিতা নারীরা বিবাহবিচ্ছেদের উৎসব পালন করে । একজন সদ্য তালাকপ্রাপ্তা মহিলা অনান্য মহিদের সঙ্গে উল্লাস করতে করতে বাড়ি ফেরে । সেই মহিলা এমন এক স্বামীর কাছ থেকে তার মুক্তি উদযাপন করে, যে বিবাহিত জীবনকে মূল্য দিত না এবং তা টিকিয়ে রাখতে পারত না।
আশ্চর্যজনকভাবে, সেই দেশে একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী একজন কুমারীর চেয়ে বেশি বিয়ের প্রস্তাব পান এবং তার যৌতুকও বেশি হয়, কারণ তাকে বেশি পরিণত, বিবাহিত জীবনে অভিজ্ঞ এবং তা সামলাতে সক্ষম বলে মনে করা হয়!
মৌরিতানিয়ায়, কোনো নারীকে তার কতবার বিয়ে হয়েছে তা নিয়ে গর্ব করতে শোনা যায়, কারণ তারা এটিকে তাদের সৌন্দর্য, স্বাতন্ত্র্য এবং আকর্ষণের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করে। আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, একজন তালাকপ্রাপ্ত পুরুষের পক্ষে আরেকজন স্ত্রী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ তাকে বৈবাহিক দায়িত্ব পালনে অক্ষম বলে মনে করা হয়।
মৌরিতানিয়া হল উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার একটি মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র, যার ৯০% অঞ্চল সাহারা মরুভূমি দ্বারা আবৃত । যার সরকারি নাম ইসলামিক রিপাবলিক অফ মৌরিতানিয়া (Islamic Republic of Mauritania)। এই দেশের প্রায় ৯৯.৯% জনগণ মুসলিম । এর রাজধানী ও বৃহত্তম শহর হল নুওয়াকশুত। এটি একটি উন্নয়নশীল দেশ, যার অর্থনীতি মূলত কৃষি, পশুপালন এবং খনিজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল । মৌরিতানিয়া স্বাধীনতা লাভের পর থেকে প্রায়শই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক অভ্যুত্থানের সম্মুখীন হয়েছে । অনান্য ইসলামি রাষ্ট্রগুলির মতই এই দেশেও যথারীতি বিভিন্ন কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি সক্রিয় আছে।
মৌরিতানিয়ার আইনি ব্যবস্থা ফরাসি সিভিল আইন (Civil Law) এবং শরিয়া আইনের একটি মিশ্রণ। আদালত ব্যবস্থায় ‘কাদি’ (Cadi) বা বিচারকরা শরিয়া অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করেন। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তির মতো পারিবারিক বিষয়গুলো প্রধানত শরিয়া অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ধর্মত্যাগের (Apostasy) মতো বিষয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া, সমকামী যৌন কার্যকলাপের জন্য মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির বিধান আছে, যদিও এর প্রয়োগে একটি ডি ফ্যাক্টো স্থগিতাদেশ রয়েছে।।
