এইদিন ওয়েবডেস্ক,হুগলী,১৭ মার্চ : আজ মঙ্গলবার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি । তিনি অধিকাংশ আসনে পুরনো মুখের উপর ভরসা রাখলেও কয়েকটি আসনে নতুন মুখকে সুযোগ দিয়েছেন তিনি । যেমন,জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জের বিধায়ী বিধায়ক খগেশ্বর রায়ের এবারে নাম কাটা গেছে । প্রতিবাদে ইতিমধ্যেই তিনি দলের জেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন । আর একটি নাম হল হুগলী জেলার বলাগড়(এসসি)-এর বিদায়ী বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারী । ওই আসনে এবারে রঞ্জন ধাড়াকে প্রার্থী করা হয়েছে। অবশ্য তিনি খগেশ্বর রায়ের মত ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করেননি । পরিবর্তে মনের অনুভূতি প্রকাশ করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেছেন । সেই পোস্টে অনুযোগ না থাকলেও প্রতিটি পরতে পরতে হাহুতাশ লক্ষ্য করা গেছে ।
পোস্টে মনোরঞ্জন ব্যাপারী লিখেছেন,”প্রিয় বলাগড়বাসী বন্ধুগন, শুভানুধ্যায়ী আপনজন, যা হবার ছিল তাই হয়েছে। অনেক আগে থেকেই হাটেবাজারে পথেঘাটে পত্রপত্রিকায় যে খবর ছড়িয়েছিল সেটাই আজকে সত্য বলে প্রমানিত হয়েছে । আমি এবারের নির্বাচনে আর টিকিট পাইনি।
টিকিট যে পাবনা সেটা আমি অনেক আগে থেকেই আন্দাজ করে নিয়ে ছিলাম । সেইভাবে একটা মানসিক প্রস্ততিও নিয়ে রেখেছিলাম। তাই এই সংবাদে আমার খুব একটা আশ্চর্য লাগেনি।
যা হবে সেটা জানতাম বলেই অনেকদিন পরে আজ দুপুরে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন পর পর কয়েকটা ফোন এসে আমাকে দিবানিদ্রা থেকে জাগিয়ে দিল। সেই ফোনের অধিকাংশ বিষন্ন বিমর্শ হতাশ! আবার কয়েকটা ভীষন আনন্দিত উল্লাসিত!এটা তো হয়ই। কথায় তো বলে যেই দেশে করি ঘর অর্ধেক আপন অর্ধেক পর!
যারা পর তাঁদের আমার কিছু বলার নেই। তবে যারা আমার একান্ত আপন তাঁদের আমার কিছু বলার আছে ! পাঁচবছর আপনাদের সঙ্গে ছিলাম , আপনারা আমাকে খুব ভালোবেসে ছিলেন, আমিও আপনাদের খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম।আমি যে ‘বহিরাগত’! বলাগড়ের লোক নই, সেটা কোনদিন মনে হয়নি। সত্যি বলতে কি আপনাদের ছেড়ে থাকতে খুবই কষ্ট হবে।
যাইহোক, তৃণমূল কংগ্রেস, এটা মাননীয়া মমতা ব্যানার্জীর শ্রম ঘাম রক্ত দিয়ে গড়ে তোলা দল। ‘ওনার দলে’ উনি কাকে টিকিট দেবেন আর কাকে দেবেননা- সেটা একান্তই ওনার ব্যক্তিগত বিষয়। সে নিয়ে কার কি বলার থাকতে পারে!
বন্ধুগন আপনারা জানেন যে চারজেলা পার হয়ে আমি বলাগড়ে গিয়েছিলাম। কোন পরিস্থিতিতে যেতে হয়েছিল সেটা আমার ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন বইয়ের সদ্য প্রকাশিত সংস্করণে বিস্তারিত লিখে রেখেছি। যারা সেটা পড়েছেন তাঁরা আমার ব্যাপারটা জেনে গেছেন !
সে যাই হোক, আপনারা আমাকে আশীর্বাদ সমর্থন দিয়েছিলেন। আপনাদের দয়ায় আমার মতো তুচ্ছ নগন্য একজন লোক, সম্মানীয় আইনসভার সদস্য হতে পেরেছিল।যে কারনে আমি আপনাদের ঋনের বোঝার তলে আকন্ঠ ডুবেছিলাম। গোটা বিধায়ক কাল আমি সেই ঋন আপ্রান পরিশোধ করার চেষ্টা করেছি।খালি পেটে রেল ষ্টেশনে শুয়ে জীবন কাটানো মানুষ আমি। তাই আমি জানি গরীব মানুষের কত কষ্ট! জানি গরীব মানুষের ন্যায্য প্রাপ্ত কি ভাবে মাঝপথে উধাও হয়ে যায়।
নির্বাচনের প্রচারের সময় আমি বলেছিলাম যে আমি একটা ঘর ভাড়া নিয়ে গোটা বিধায়ক কাল আপনাদের সঙ্গেই কাটাবো। আমি আমার কথা রেখে ছিলাম। বিধায়ক হবার পর থেকে চারবছর দশমাস রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা আপনাদের মাঝেই পড়ে ছিলাম। আপনাদের সঙ্গে থেকে আমি আমার সাধ্যমত সততার সাথে সাহসের সাথে কঠিন পরিশ্রম করে যতটা পারি আপনাদের সেবা পরিষেবা দেবার চেষ্টা করেছি। সরকারের কাছ থেকে আপনাদের জন্য যে সব জামা কাপড় ত্রিপল এসেছে আমি নিজে ঘুরে ঘুরে আপনাদের হাতে তুলে দিয়েছি।
সত্যি বলতে কি সেই সময় সাধারন গরীব মানুষের মুখে যে খুশির হাসি দেখেছি সেটাই আমার বিধায়ক জীবনের চরম ও পরম অর্জন। বিধায়ক তহবিলের যে অর্থ তার সবটাই আমি এলাকার উন্নয়নে খরচ করতে সমর্থ হয়েছি। আমি আমার সীমিত শক্তি নিয়ে মাটি মাফিয়া বালি মাফিয়া গরু পাচার গাঁজা পাচার, সবুজদ্বীপের গাছচোর, রেশনের চাল চোর, পাড়ায় পাড়ায় সচল জুয়ার ঠেক, সবার বিরুদ্ধে সাধ্যমত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম। এটা আপনারাও জানেন।
এই সব কাজের কারনে বলাগড়ের সাধারন মানুষ, অটো টোটো অলা, চাষী ক্ষেতমজুর, বাজারের ছোট ব্যাপারী সবার প্রসংশা পেয়েছিলাম। ভালবাসা পেয়ে ছিলাম। আপনাদের কাছে থেকে বিদায় নেবার বেলায় সেই ভালোবাসার ভাণ্ডার সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি।সারা জীবন এই সম্পদ আগলে রাখতে চেষ্টা করবো। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয় সেই ২১ এর নির্বাচনের সময় আমি বলেছিলাম, আমি যদি কোন দূর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হই আপনারা আমার দিকে এত থুতু ছুড়বেন আমি যেন সেই থুতুর বন্যায় ডুবে মরে যাই।ধন্যবাদ আপনাদের যে কেউ আমার দিকে থুতু ছোড়েননি!
বলাগড়ের সাধারন মানুষ- এমন কি বিরোধী দলের লোকেরাও, রাজনৈতিক সমালোচনা যেটা করার সেটা করেছে বটে কিন্ত আমার গাঁয়ে কেউ কালির ছিটে দিতে পারেনি। যাবার বেলায় তাদেরও একটা প্রনাম জানিয়ে যাচ্ছি।আমি তো এক লেখোয়ার! লেখা বা বলার মাধ্যমে সারা জীবন আপনাদের কথাই তো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। পাঁচ বছর তেমন কিছু লিখে ওঠা হয়নি । আজ থেকে আবার সেই লেখার কাজে মনোনিবেশ করতে চলেছি।ব্যাস আমার আর কিছু বলার নেই ।সবাই ভালো থাকবেন । শত্রু মিত্র সবাইকে প্রনাম !’
