এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,১৬ মার্চ : কলকাতার ধর্মতলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির SIR-বিরোধী ধর্না মঞ্চে উপস্থিত ‘গেরুয়াধারী’কে ঘিরে রহস্য ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে । রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের মত অবিকল গেরুয়া পোশাক পরে গত ৬ মার্চ, মমতার উপস্থিতিতে তিনি বলেছিলেন যে দাবি করেছিলেন যে, তিনি চোদ্দো বছর ধরে মিনাখাঁ রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের প্রেসিডেন্ট। তাঁর নামও SIR-এ বাতিল করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এর পাশাপাশি তিনি দাবি করেছিলেন, তিনি বেলুড় মঠের দশম প্রেসিডেন্ট স্বামী বীরেশ্বরানন্দের মন্ত্রশিষ্য। শুধু তাই নয়, তিনি কার্যত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন ও এসআইআর প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা করেন।
কিন্তু এখন রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ রীতিমতো খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে মিনাখায় রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের কোনও শাখাই নেই । সঙ্গত কারনেই মমতার ধর্নামঞ্চে উপস্থিত ওই ‘গেরুয়াধারী’র রামকৃষ্ণ মিশনের সন্নাসী হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না ।
গত ১২ মার্চ সংবাদপত্রে কলকাতার দক্ষিণেশ্বর রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের সাধারণ সম্পাদক প্রব্রাজিকা অতন্দ্রপ্রাণের নামে একটি পাবলিক নোটিশ ছাপা হয়েছে । নোটিশে তিনি বলেছেন, ‘কিছু সংশ্লিষ্ট ভক্ত এবং সাম্প্রতিক ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমাদের নজরে এসেছে যে, একজন সন্ন্যাসী (সন্ন্যাসী) প্রকাশ্যে নিজেকে “মীনাখা রামকৃষ্ণ সারদা মিশন” এর সভাপতি বলে দাবি করেছেন। জনসাধারণকে এতদ্বারা জানানো হচ্ছে যে, শ্রী সারদা মঠ এবং রামকৃষ্ণ সারদা মিশন, যা রামকৃষ্ণ সারদা মিশন নামেও পরিচিত, যথাক্রমে নিবন্ধিত ট্রাস্ট এবং সোসাইটি, যার সদর দপ্তর দক্ষিণেশ্বর, পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণেশ্বর, কলকাতা ৭০০০৭৬-এ অবস্থিত। উভয় সংস্থাই একচেটিয়াভাবে সন্ন্যাসী (সাধ্বী) দ্বারা গঠিত এবং পরিচালিত হয়।
শ্রী সারদা মঠ ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ৯.০৯.১৯৫৯ তারিখে বেলুড় মঠের রামকৃষ্ণ মঠের সভাপতি কর্তৃক নিবন্ধিত হয়েছিল, স্বামী বিবেকানন্দের স্বপ্ন পূরণের জন্য, যেখানে পবিত্র মা শ্রী সারদা দেবীকে অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হিসেবে রেখে একটি মহিলা মঠ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে, শ্রী সারদা মঠের ট্রাস্টিরা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক এবং দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৯৬০ সালে রামকৃষ্ণ সারদা মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে রামকৃষ্ণ সারদা মিশন, দক্ষিণেশ্বর, কলকাতা ৭০০০৭৬, মিনাখায় কোনও শাখা নেই এবং একজন ভিক্ষু (পুরুষ) এই ধরণের সংস্থার সভাপতি বলে দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর। তাই আমরা জনসমক্ষে করা এই ধরণের দাবি এবং বিবৃতি থেকে নিজেদেরকে স্পষ্টভাবে বিচ্ছিন্ন করছি।
এমনকি আরও বলা হয়েছে,আরও জানানো হচ্ছে যে, “শ্রী সারদা মঠ” এবং “রামকৃষ্ণ সারদা মিশন” নামগুলি, যা “রামকৃষ্ণ সারদা মিশন” নামেও পরিচিত, তাদের সরকারী সীলমোহর, প্রতীক, প্রতীক এবং লোগো সহ, ১৯৫০ সালের প্রতীক ও নাম (অনুপযুক্ত ব্যবহার প্রতিরোধ) আইনের অধীনে আইনত সুরক্ষিত। আইনত কর্তৃত্ব ছাড়া এই নাম বা প্রতীক ব্যবহার করলে যে কোনও ব্যক্তি বা সংস্থা উক্ত আইনের অধীনে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দায়ী থাকবে।
ওই রহস্যময় ‘গেরুয়াধারী’ সেদিন মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বলেছিলেন,’আমি মিনাখাঁয় রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের প্রেসিডেন্ট । আমি বেলুড় মঠের দশম প্রেসিডেন্ট স্বামী বীরেশ্বরানন্দের মন্ত্রশিষ্য। আমি আজ দিদির কাছে এলাম। বললাম, এরকম যদি হতে থাকে… সত্যের জয় হোক। এসআইআর যাতে উঠে যায়, তার জন্য ঠাকুর-মা-স্বামীজির কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি।’ কথিত মিনাখাঁ রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের প্রেসিডেন্টের ক্ষোভের কথা শুনেই পাশ থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কাগজগুলো দেখিয়ে দিন। ২০০২ সালেও ভোটার তালিকায় নাম ছিল বলছেন।’ সেদিন মঞ্চ থেকে কমিশনকে নিশানা করে গেরুয়াধারী বলেন, ‘আমি ইঞ্চিতে-ইঞ্চিতে খোঁজ রাখি। এখানে এমন সাত জনকে হাজির করব, যাঁদের ফাইনাল ভোটার লিস্টে মৃত বলা হয়েছে।’
প্রসঙ্গত,রামকৃষ্ণ মিশনের একজন সন্নাসী হয়েও তার মুখে এই রকম রাজনৈতিক বক্তব্য শুনে অনেকেই সন্দিহান হয়ে উঠেছিল । এখন মিশন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়ায় ওই গেরুয়াধারী এখন চর্চার বিষয় হয়ে গেছে । প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রীর সভাতে সন্নাসী সেজে যাওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছিল । বছর খানেক আগে নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে একজন লাল পোশাক পরা ব্যক্তি নিজেকে ভারত সেবাশ্রম সংঘের সন্নাসী বলে দাবি করে । যদিও পরে বিজেপি তার আসল পরিচয় ফাঁস করে এবং দাবি করে যে সে তৃণমূলের একজন সাধারণ কর্মী । কিন্তু মমতার ধর্নামঞ্চে ওই রহস্যময় ‘গেরুয়াধারীকে নিয়ে এখনো সাসপেন্স বজায় রয়েছে৷ সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে এই কারনে যে তিনি মিনাখাঁ রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের প্রেসিডেন্ট বলে দাবি করলেও প্রকাশ্যে নিজের নাম জানাননি । তাই কেন তাকে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্নাসী সাজিয়ে মমতার মঞ্চে হাজির করা হল এবং কি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন ? এই প্রশ্ন উঠছে নেট মাধ্যমে । অনেকে মন্তব্য করেছেন যে এতে স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিষ্ঠিত ওই পবিত্র ধর্মীয় সংগঠনের অবমাননা হয়েছে । যদিও আজ পর্যন্ত ওই রহস্যময় ‘গেরুয়াধারী’র পরিচয় স্পষ্ট নয় ।।
