প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,০৪ এপ্রিল : যোগ্য ও অযোগ্য বাছাই করা যায় নি ! সুপ্রিম রায়ে তারই মশুল গুনতে হল বহু যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষিকাকে।তবে কেউ না পারলেও দু’বছর আগেই পূর্ব বর্ধমান জেলার দুটি স্কুলের দুই শিক্ষক ও শিক্ষিকাকে অযোগ্য হিসাবে চিহ্নিত করে ফেলে ছিল স্কুলেরই পড়ুয়ারা।সুপ্রিম রায়ে শেষঅব্দি ওই দুই অযোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষিকার চাকরি বাতিল হয়েছে।দুই স্কুলের পড়ুয়াদের সেই জাজমেন্ট এখন চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষিকা হিসাবে ২০১৯ সালে পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীর রাজাপুর ভাতশালা ধীরেন্দ্রনাথ বিদ্যাপীঠে যোগদান করেছিলেন রিংকু দেবনাথ। ইতিহাসের শিক্ষিকা রিংকু ম্যাডাম কে নিয়ে পড়ুয়াদের হতাশার শেষ ছিলনা। প্রায় দু’বছর আগে এই স্কুলের পড়ুয়ারা জানিয়ে ছিল, ‘রিংকু ম্যাডাম ক্লাসে ভাল করে ইতিহাস পড়াতে পারেন না। ওনার কাছে ইতিহাসের কোন বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে কিছু জানাতেও পারেন না।রিংকু ম্যাডাম বলতেন ‘পরদিন বলবো’ ।কিন্তু তার পর থেকে দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলেও রিংকু ম্যাডাম পড়া নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য আর করতেন না।’
এইসব দেখে রিংকু ম্যাডামের স্কুল শিক্ষিকা হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে তখনই জিজ্ঞাসা চিহ্ন তুলেছিল পড়ুয়ারাই । পড়ুয়াদের নির্ধারণ যে ভুল ছিল না তা পরে প্রমাণও হয়ে যায় ।কলকাতা হাইকোর্ট নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলা চলাকালীন বছর দুই আগে সিবিআই দুর্নীতির একের পর এক পর্দা ফাঁস করে।তখনই সামনে চলে আসে অবৈধ উপায়ে শিক্ষকের চাকরি বাগিয়ে নিয়ে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি করা ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা।সেই তালিকায় রিংকু ম্যাডামের নামও বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকে।এছাড়াও রাজ্যের স্কুল সার্ভিস কমিশন নবম-দশমের ৪০ জন “ভুয়ো’ শিক্ষক শিক্ষিকার নামের তালিকা প্রকাশ করেছিল। সেই তালিকার পাঁচ নম্বরে নাম ছিল পূর্বস্থলীর রাজাপুর ভাতশালা ধীরেন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষকা রিংকু দেবনাথের । এইসব জানাজানি হতেই পূর্বস্থলীর পারুলিয়া নিবাসী রিংকু ম্যাডাম স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়ে কার্যত বেপাত্তা হয়ে যান। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে পড়ুয়াদের নির্ধারনেই পড়ে শীলমোহর ।পাকাপাকি ভাবে রিংকু ম্যাডামের স্কুলে আসা বন্ধ হয়ে গেল।

রিংকু ম্যাডামের কীর্তি নিয়ে রাজাপুর ভাতশালা ধীরেন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কোন মন্তব্য করতে চান নি। তবে স্কুলের অন্য শিক্ষিকাদের কথার জানা গিয়েছে,“রিংকুর ম্যাডামের ’ওএমআর শিট’ ছিল ব্ল্যাঙ্ক। অথচ রিংকু স্কুলে শিক্ষকতা করছিল।এটা তাঁদের কল্পনাও অতীত’। বিদ্যালের পড়ুয়াদের অভিভাবকরা দাবি করেছেন,’রিংকু ম্যাডাম প্রকৃত অর্থেই ছিলেন অযোগ্য শিক্ষিকা। তার পরেও কি করে রিংকু ম্যাডাম স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছিলেন সেটাই বড় আশ্চর্য্যের ।এই রকম অযোগ্য শিক্ষকদের জন্যই বহু স্কুলের বহু যোগ্য শিক্ষক সুপ্রিম রায়ে চাকরি হারিয়ে ছেন । এমনটা কখনই কাম্য ছিল না বলে অভিভাবকরা মন্তব্য করেছেন ।
স্কুল শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে ২০১৯ সাল থেকে জল ঘোলা হতে শুর করে । ২০১৬ সালের এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ নিয়ে তখন থেকেই ক্ষোভ বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। শুরু হয় আন্দোলন। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে ২০২২ সালের প্রথম দিক থেকে আন্দোলন জোরদার রুপ পেতে শুরু করে।মামলা রুজু হয় কলকাতা হাইকোর্টে।আদালত সিবিআই কে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তের নির্দেশ দেয় । তদন্তে নেমে সিবিআই দুর্নীতির একের পর এক পর্দা ফাঁস করা শুরু করে।তার সাথে নবম- দশমে ভুয়ো সুপারিশপত্র পাওয়া ১৮৩ জন অবৈধ শিক্ষকের নামের তালিকা সিবিআই আদালতে জমা দেয়।
সিবিআই-এর প্রকাশ করা সেই তালিকায় নাম থাকে পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর ব্লকের বাণী নিকেতন রঙ্কিনী মহল্লা বিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক শেখ ইনসান আলীর নাম। এই শিক্ষককেও আগেই অযোগ্য হিসাবে নির্ধারণ করে ফেলে ছিল স্কুলেরই পড়ুয়ারা।তার উপর তালিকা প্রকাশ হবার পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস থেকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন তৃণমূল ঘনিষ্ট শিক্ষক ইনসান আলী । শুধু স্কুলে যাওয়া বন্ধ করাই নয় ,মেমারি পৌরসভা এলাকা নিবাসী শিক্ষক ইনসান কার্যত আত্মগোপন করে ফেলেন। দু’বছরের বেশী সময় ধরে ইনসান আলী আর বাণী নিকেতন রঙ্কিনী মহল্লা বিদ্যালয়ের চৌকাঠ মাড়াননি ।স্কুল থেকে তাঁর স্থায়ী বিদায় বৃহস্পতিবারের সুপ্রিম রায়ে সুনিশ্চিত হয়ে গিয়েছে।তবে দুঃখের বিষয় হল ইনশান আলীর মতো না হয়েও দুর্নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চাকরি খুইয়েছেন এই বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষিকা।তাদের জন্য স্কুলের সবাই অনুতপ্ত ।
বিদ্যালয়ের প্রাধান শিক্ষক সুব্রত দাস বৃহস্পতিবার তাঁর স্কুলের দুই শিক্ষিকা সোনামনি ভান্ডারি ও বিপাশা মণ্ডলের চাকরি চলে যাওয়া নিয়ে ভীষণ ভাবে আক্ষেপ প্রকাশ করেন । তবে চাকরি চলে গেলেও ইনশান আলীর নাম তিন মুখে আনেননি। প্রধান শিক্ষক বলেন,দুই শিক্ষিকা সোনামনি ও বিপাশা অনান্য দিনের মত এদিনও যথা সময়ে স্কুলে পৌছে ছিলেন।সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার পর তারা মুষড়ে পড়েন। চোখের জল ফেলেই দুই শিক্ষিকা এদিন স্কুল ছাড়েন। এই ঘটনা স্কুলের সবাইকেই মর্মাহত করেছে বলে প্রধান শিক্ষিকা জানিয়েছেন ।।