এইদিন বিনোদন ডেস্ক, ১৮ জানুয়ারী : প্রখ্যাত চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ছবি ও চির সবুজ নায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনয় করা এপার বাংলার এক অভিনেত্রীর লন্ডনে মৃত্যু হয়েছে । প্রেমের টানে ওপার বাংলায় গিয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে নিকাহ করেন । তাদের এক সন্তানও হয় । কিন্তু প্রেম বেশিদিন স্থায়ী হয়নি । স্বামীর সাথে তালাক হয়ে যাওয়ার পর লন্ডনের রমফোর্ডে চলে যান ওই অভিনেত্রী । গত ১২ জানুয়ারী ৭৩ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন । ওই অভিনেত্রীর নাম জয়শ্রী কবির । তিনি পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে প্রায় ৩০টি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ।
জয়শ্রী কবিরের জন্ম কলকাতায় । জন্মসূত্রে তিনি হিন্দু ব্রাহ্মণ ছিলেন । পৈতৃক পদবি ছিল “রায়”৷ কলকাতার প্রখ্যাত সাউথ পয়েন্ট স্কুলে পড়াশোনা । ১৯৬৮ সালে মিস কলকাতা খেতাবও অর্জন করেছিলেন । ১৯৬৯ সালে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ছবির মাধ্যমে তিনি চলচিত্র জগতে আত্মপ্রকাশ করেন । তিনি ছিলেন বিরল শ্রেণির অভিনয়শিল্পী ।
ষাটের ও সত্তরের দশকে বাংলা চলচ্চিত্র যখন নতুন ভাষা, নতুন অভিব্যক্তি ও আধুনিক বোধের সন্ধানে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়েই আবির্ভাব ঘটে জয়শ্রী কবিরের। সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস—এই তিনের অনন্য মেলবন্ধন তাকে দ্রুতই দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়। পর্দায় তার উপস্থিতি ছিল সংযত, চোখের ভাষায় ছিল গভীরতা আর অভিনয়ে ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক দীপ্তি—যা খুব অল্প সময়েই তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।
কলকাতায় জন্ম নেওয়া জয়শ্রী কবিরের চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয় ১৯৭০ সালে, বিশ্বনন্দিত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-তে তার অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রে তার জন্য এক শক্ত ও স্থায়ী ভিত্তি গড়ে দেয়। সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরায় অভিনয় মানে অতিনাটকীয়তা পরিহার করে বাস্তব মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্বকে ধরতে পারা। জয়শ্রী কবির সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের মতো শক্তিশালী অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করেও জয়শ্রী নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরেন নীরব উপস্থিতি, সংলাপের চেয়ে দৃষ্টির ব্যবহার এবং সংযত অভিব্যক্তির মাধ্যমে। অতিনাটকীয়তা এড়িয়ে বাস্তবধর্মী অভিনয়ই এখানে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে—যা সত্যজিৎ রায়ের মানবিক চলচ্চিত্রভাষার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই চলচ্চিত্রে তিনি কোনো উচ্চকিত নায়িকা নন, বরং সময়ের তরুণ সমাজের দ্বন্দ্ব, স্বপ্নভঙ্গ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সংযত ও সচেতন নারীর প্রতিচ্ছবি।
এরপর ১৯৭৬ সালে মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘অসাধারণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে জয়শ্রী কবির পৌঁছে যান জনপ্রিয়তার শীর্ষে। উত্তম কুমারের মতো প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী অভিনেতার পাশে দাঁড়িয়েও তিনি নিজস্ব অভিনয়মুদ্রায় চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন। এখানে তিনি কেবল রোমান্টিক নায়িকা নন, ছিলেন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, সংযত অথচ দৃঢ় এক নারী চরিত্র। উত্তম কুমারের মতো সর্বগ্রাসী তারকার পাশে দাঁড়িয়েও তিনি নিজস্বতা হারাননি—এটাই তার অভিনয়বোধের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনি ‘নায়িকার ছায়া’ হয়ে যাননি, বরং নিজস্ব মানসিক কাঠামো ও চরিত্রের দৃঢ়তায় সমান্তরাল এক উপস্থিতি তৈরি করেছিলেন। চলচ্চিত্রটি যেমন বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়, তেমনি জয়শ্রীর অভিনয় প্রশংসিত হয় সমালোচকদের কাছেও।
এই দুই চলচ্চিত্রে তার অভিনয় প্রমাণ করে—জয়শ্রী কেবল সমকালীন জনপ্রিয় অভিনেত্রী নন, বরং এমন এক শিল্পী, যিনি সংযত অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চরিত্রের গভীরতা নির্মাণ করতে জানেন। আর এই পরিণত অভিনয়ভঙ্গিরই পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে, যেখানে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনিবার্য ও স্মরণীয় নাম।
‘সূর্য কন্যা’ চলচ্চিত্রের সূত্র ধরেই জয়শ্রীর জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে। এই চলচ্চিত্রে শুটিং উপলক্ষে তিনি ঢাকায় আসেন এবং পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রটির পরিচালক আলমগীর কবিরকে বিয়ে করে বাংলাদেশে স্থায়ী হন। বিয়ের পর জয়শ্রী রায় থেকে তিনি হয়ে ওঠেন জয়শ্রী কবির। ধীরে ধীরে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে গভীর আবেগ ও আস্থার প্রতীকে পরিণত হন। জয়শ্রীর স্বামী আলমগীর কবিরের সাথে লেনিন সৌরভ কবির নামে একটি ছেলে ছিল। ১৯৮৯ সালে আলমগীরের মৃত্যুর কিছু আগে এই দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। কলকাতায় বাপের বাড়ির রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি স্বামীর সাথে তালাকের পর ছেলেকে নিয়ে স্থায়ীভাবে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন ।
১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সূর্য কন্যা’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং মহান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন চলচ্চিত্রভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই চলচ্চিত্রে জয়শ্রী কবিরের অভিনয় ছিল সংযত অথচ গভীর। তিনি এখানে এমন এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি আত্মপরিচয়, সমাজ ও বাস্তবতার সঙ্গে নিরন্তর সংলাপে যুক্ত। তার বিপরীতে অভিনয় করা অভিনেতার সঙ্গে তার অভিনয় ছিল ভারসাম্যপূর্ণ; কেউ কাউকে ছাপিয়ে যাননি, বরং গল্পের প্রয়োজনেই চরিত্রগুলো বিকশিত হয়েছে। দর্শক এই চলচ্চিত্রে জয়শ্রী কবিরকে দেখেছে একজন ‘নায়িকা’ হিসেবে নয়, একজন বাস্তব মানুষের প্রতিচ্ছবি হিসেবে। সে কারণেই ‘সূর্য কন্যা’ আজও কালজয়ী।
এরপর অভিনেতা বুলবুল আহমেদের সঙ্গে জয়শ্রী কবিরের জুটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক বিশেষ অধ্যায় তৈরি করে। ‘সীমানা পেরিয়ে’ চলচ্চিত্রে এই জুটির অভিনয় ছিল গভীরভাবে মানবিক। গল্পটি ছিল সীমান্ত, সম্পর্ক ও মানসিক দূরত্বের প্রতীকী উপস্থাপন। এখানে জয়শ্রী কবিরের চরিত্রটি ছিল সংযত, চিন্তাশীল ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন—যা বুলবুল আহমেদের মিতভাষী অভিনয়ের সঙ্গে এক অনন্য রসায়ন তৈরি করে। ফলে এই চলচ্চিত্রে তাদের অভিনয় দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়; কারণ এটি আবেগকে উচ্চকণ্ঠ না করে নীরবতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছে।
রূপালি সৈকতে’ চলচ্চিত্রে জয়শ্রী কবির আরও পরিণত অভিনেত্রী হিসেবে ধরা দেন। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা ও সম্পর্কের জটিলতার ভেতর দাঁড়িয়ে তার চরিত্রটি ছিল গভীরভাবে অন্তর্মুখী। বুলবুল আহমেদের সঙ্গে তার অভিনয় এখানে ছিল প্রায় সংলাপবিহীন বোঝাপড়ার মতো—যেখানে চোখের দৃষ্টি আর নীরব উপস্থিতিই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। দর্শক এখানে জয়শ্রী কবিরকে মনে রেখেছে তার স্বাভাবিক অভিনয় আর বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র নির্মাণের জন্য।
তার অভিনীত ‘সীমানা পেরিয়ে’ এবং ‘রূপালি সৈকতে’—এই দুইটি চলচ্চিত্র ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করে। ‘সীমানা পেরিয়ে’ চলচ্চিত্রে আবিদা সুলতানার কণ্ঠে গাওয়া কালজয়ী গান ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ ছিল গল্পের ধারাবাহিক অংশ, হঠাৎ বসানো কোনো বিনোদন নয়। কিংবদন্তি শিল্পী আবিদার কণ্ঠের আবেগ ও গভীরতা জয়শ্রী কবিরের পর্দার উপস্থিতির সঙ্গে অনন্যভাবে মিশে গেছে। এই গান তাই কেবল সুর নয়, চিরন্তন অনুভূতি। মনে হয়, জয়শ্রী কবির পর্দার ভেতর থেকে আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন; নিঃশব্দে সেই সময়ের গল্প, নীরব প্রেম, সংগ্রাম ও স্বপ্নময়তা শোনাচ্ছেন। সময় যতই এগুক, এই গান ও তার অভিনয় একত্রে যুগের সীমানা অতিক্রম করে বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে জেগে থাকবে।
জয়শ্রী কবিরের অভিনয়গুণের মূল শক্তি ছিল তার সংযম, অন্তর্গত গভীরতা ও মানবিকতা। তিনি কখনো আবেগকে উচ্চকিত করেননি। নীরবতা, চোখের দৃষ্টি ও দেহভঙ্গির সূক্ষ্ম ব্যবহারে চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলতেন। ক্যামেরার সামনে কখন থামতে হবে আর কখন শুধু তাকানোই যথেষ্ট—এই বোধ তাকে তার সময়ের অনেক অভিনেত্রীর থেকে আলাদা করে দিয়েছে। নারীর দ্বিধা, আত্মমর্যাদা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব তিনি রোমান্টিকীকরণ না করে বাস্তবতার আলোয় তুলে ধরেছেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, এই চলচ্চিত্রগুলোতে জয়শ্রী কবিরের অভিনয়দক্ষতা, সহশিল্পীদের সঙ্গে তার সংযত রসায়ন এবং গল্পের প্রয়োজনে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার ক্ষমতাই তাকে দর্শকের মনে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রেখেছে।
জয়শ্রী খুব বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি। কিন্তু ঠিক এখানেই তার অভিনয়ের বিশেষত্ব। যেমন সুচিত্রা সেন বা শর্মিলা ঠাকুরের মতো অভিনেত্রীরা জনপ্রিয়তার পাশাপাশি চরিত্র বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সংযম দেখিয়েছিলেন, জয়শ্রী কবিরও তেমনি অল্প কাজ করেও মানের প্রশ্নে আপস করেননি। তার প্রতিটি চরিত্র ছিল প্রয়োজনীয়, অর্থবহ এবং স্মরণযোগ্য। পরিমাণে নয়, গভীরতায় তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। যেগুলো করেছেন, সেগুলোই হয়ে উঠেছে ইতিহাস।মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গুণগত মান উন্নয়নে তার অবদান ছিল অসামান্য ।।

