স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি এবং নারীবাদী বামপন্থী লেখিকা কমলা দাস (Kamala Das), ওরফে কমলা সুর্যার জীবন ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত । তিনি ইংরেজি ও মালয়ালম উভয় ভাষাতেই লিখেছেন । তিনি ‘মাধবীকুট্টি’ নামেও পরিচিত এবং তার অকপট আত্মজীবনী ‘মাই স্টোরি’ ও নারীবাদী লেখা এবং সাহসী কবিতার জন্য সুপরিচিত । লেখিকা হিসাবে তার প্রতিভা প্রশ্নাতীত হলেও, শেষ বয়সে তাকে বিতর্কিত করে তুলেছিল । বিচ্ছিন্ন হতে হয় তার পরিবার থেকেই । কমলা সুর্যার অতীত জীবনের সেই “ভুল সিদ্ধান্ত”-এর জন্য শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় আফসোস পর্যন্ত করতে হয়েছিল । এই প্রতিবেদনে কমলা দাস থেকে কমলা সুরাইয়া (Kamala Surayya) হয়ে ওঠা এক প্রখ্যাত লেখিকার জীবনের করুন পরিনতির কাহিনী বর্ননা করা হয়েছে ।
ভারতের অগ্রগণ্য কবি কমলা দাসের জন্ম ১৯৩৪-এর ৩১ মার্চ, কেরালার ত্রিশুর জেলার পুন্যায়ুরকুলামে এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে হয় । কেরালার যে দু-একটি পরিবারের সাহিত্যজগতে অসামান্য অবদান ছিল, তার মধ্যে অন্যতম সেই “নায়ার” পরিবারে জন্ম কমলার ।কমলার পিতা ভিএম নায়ার ছিলেন বিখ্যাত মালায়লম দৈনিক ‘মাতৃভূমি’র ম্যানেজিং এডিটর। মা নালাপ্পাত বালামণি আম্মা মালায়লম ভাষার প্রথিতযশা কবি। ‘নিবেদ্যম’, ‘সোপানম্’, ‘লোকান্তরঙ্গলিল’ প্রভৃতি গ্রন্থের প্রণেতা বালামণি আম্মাকে বলা হত মালায়লম সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। কেউ কেউ তাকে বলতেন— ‘মাদার অফ মালায়লম পোয়েট্রি’।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ভারতীয় সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘সরস্বতী সম্মান’-এ ভূষিত বালামণি আম্মার কন্যা কমলা যে কালে-কালে লেখক হবেন, তা খানিকটা প্রত্যাশিতই ছিল। বাবা সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং মা বিখ্যাত লেখক হওয়ার সুবাদে তাদের বাড়িতে রাজনীতি ও সাহিত্যের রথী-মহারথীদের আনাগোনা লেগেই থাকত। কমলার বহির্মুখী ও বামপন্থী হয়ে উঠার ক্ষেত্রে এসবই পরোক্ষে প্রেরণা যুগিয়েছিল । এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, কমলার দাদু, বালামণি আম্মার কাকা নালাপ্পাত নারায়ণ মেননও একজন উল্লেখযোগ্য লেখক ছিলেন।
পিতার কর্মসূত্রে খুব ছোটোবেলায় কমলাকে চলে আসতে হল কলকাতায়। তার পিতা তখন ‘বেন্টলে’ ও ‘রোলস্ রয়েস’ গাড়ির বিক্রেতা ওয়ালফোর্ড ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন ।
মাত্র পনেরো বছর বয়সে খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবে স্কুলের পাঠ চলাকালীনই, ১৯৪৯ সালে, কমলার বিয়ে হয় রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার উচ্চপদস্থ আধিকারিক মাধব দাসের সঙ্গে। বিয়ের পর তাঁর নাম হয় কমলা দাস। কমলা দাসের আত্মজীবনী ‘আমার কথা’ থেকে জানা যায়, তাঁর দাম্পত্যজীবন সুখের ছিল না। তিনি স্বামীর সঙ্গে মানসিক ও শারীরিক দূরত্ব, তিক্ত সম্পর্ক এবং যৌনতার জটিল অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন যে মাধব দাস তাঁকে লেখালেখিতে উৎসাহ দিতেন এবং মাধব দাসের উৎসাহ ব্যতীত তিনি হয়তো লেখালেখি শুরুই করতেন না।
বিয়ের পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫০-এ জন্ম নিল তাদের প্রথম পুত্র এম.ডি.নালাপত। কমলার বয়স তখন মাত্র ষোলো, আর তার স্বামী মাধবের একত্রিশ। পরের দুই বছরে আরও দুই পুত্র। দাম্পত্য জীবন কিশোরী কমলার কছে তখন এক যন্ত্রণাময়, বিরক্তিকর দিনযাপন। পরবর্তীতে এক আলাপ চারিতায় কমলা বলেছিলেন, “তৃতীয় পুত্রের জন্মের সময় আমি সাবালকপ্রাপ্ত হয়েছিলাম।”
ছয়ের দশকে ইংরেজি এবং মালয়ালম দুই ভাষাতেই লিখতে শুরু করেন কমলা। ইংরেজিতে কমলা দাস এবং মালয়ালমে ‘মাধবীকুট্টি’ নামে। স্বাধীনতার আগে ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় নারীদের কবিতা নিয়ে সমালোচক মহলে নানা পিতৃতান্ত্রিক রসিকতা চালু ছিল। তথাকথিত দক্ষিণ ভারতীয় ভদ্রলোকরা ইংরেজি ভাষায় কবিতা-চর্চাকারী নারীদের ‘শাড়ি পরিহিতা টিএস এলিয়ট’ বা ‘সালোয়ারে শেলি’ অথবা ‘লুঙ্গিতে লরেন্স’ এই সমস্ত উপমা দিয়ে হীনমন্যতায় ভোগানোর চেষ্টা করতেন। হয়তো খুব সচেতনভাবে তাঁরা এই কাজটি করতেন না, কিন্তু তথাকথিত শিক্ষিত পুরুষের পিতৃতান্ত্রিক অবচেতন এই নিম্নমানের রসিকতাগুলোয় খুব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। তারই মাঝে নিজের সাহিত্য চর্চা অব্যাহত রেখেছেন কমলা দাস ।
কমলা দাসের ‘সামার ইন ক্যালকাটা’ তার একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। প্রেম এবং প্রবঞ্চনা, আর তাই নিয়ে নারীর উদ্বেগ— এ সবই এই কাব্যগ্রন্থের মূল উপজীব্য। আর এমন অকপট লেখার জন্যই রক্ষণশীল সমাজ তার কবিতায় যৌনতার গন্ধ পেল। পুরুষের লেখায় নারীঙ্গের বর্ণনা বা নারীর কামনা সরাসরি ফুটে উঠলেও যে সমাজ চুপ করে না দেখার ভান করে থাকে, তারা এক নারীর লেখায় নারীর আকাঙক্ষাকে ফুটে উঠতে দেখে গেল, গেল রব তুলল। কমলা ভ্রূক্ষেপও করলেন না। তিনি লিখে গেলেন ‘দ্য লুকিং গ্লাস’, ‘দ্য ম্যাগটস’, ‘দ্য স্টোন এজ’-এর মতো কবিতা।
অনেকের মতে, ‘পক্ষীয়ুদে মানাম’ মালায়লম সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি গল্প। তার অন্যান্য গল্পগুলির মধ্যে বিখ্যাত কয়েকটি হল— পুন্যায়ুরকুলাম, নেপায়াসাম, চন্দনা মারাঙ্গল এবং থানুপ্পু । তবে তার লেখায় যৌনতা বারবার স্থান করে নিয়েছে ।
তার লেখা গল্প ও কবিতায় যেভাবে বারবার অভিঘাত সৃষ্টি করেছিলেন কমলা, ঠিক সেভাবেই জীবনের শেষ অভিঘাতটি তিনি রচনা করলেন তার অগণিত পাঠক, রক্ষণশীল মালায়লম সমাজ এবং আত্মীয়–বন্ধুদের জন্য। স্বামীর মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস পরে ১৯৯৯–এর ডিসেম্বরে ৬৭ বছর বয়সে কমলা তার আজন্মলালিত হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। হিন্দুত্ববাদীরা তার ধর্মান্তরিত হওয়াকে “লাভ জিহাদ” হিসাবে বর্ণনা করেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর, কমলা দাস একাকী ছিলেন..কিন্তু তখনো শারীরিক আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ ছিলেন…তার তিনটি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ছিল, সকলেই উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত…এক ছেলে, মাধব দাস নালাপাট, টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রধান সম্পাদক ছিলেন । পরে তিনি ইউনেস্কোর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হন…তার স্ত্রী ট্রাভাঙ্কোর রাজ্যের রাজকন্যা । মেজো ছেলে, চিম্মন দাস, একজন বিদেশী পরিষেবা কর্মকর্তা, এবং অন্যজন কেরালার একজন কংগ্রেস বিধায়ক । আর এই বিধায়ক পুত্রের এক বন্ধু, আবদুসসামাদ সামদানী, যিনি সাদিক আলী নামেও পরিচিত ছিলেন, একজন মুসলিম লীগ সাংসদ এবং কমলা দাসের চেয়ে ৩২ বছরের ছোট, তার বাড়িতে প্রায়ই আসতেন।
আবদুসসামাদ সামদানী তার মায়ের বয়সী কমলাকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়েছিল । কমলা নিজেই সামদানীর সাথে তার সাক্ষাতের বর্ণনা দিয়েছেন এমনভাবে যা রাস্তায় বিক্রি হওয়া রাস্তার অশ্লীল বইগুলিতে পাওয়া যায়। কমলা লিখেছেন যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে, কোনও অজানা কারণে তার শারীরিক আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায় । আবদুসসামাদ সামদানী এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ইচ্ছুক ছিলেন, তাই তিনি তার প্রেমে পড়ে যান ।
পরে, কমলা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নাম পরিবর্তন করে কমলা সুরাইয়া রাখেন । এদিকে তিন ছেলে তাদের মায়ের অপকর্মে এতটাই আহত হয়েছিল যে তারা তার সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল । সবচেয়ে মর্মান্তিক খবর ছিল যে কমলার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর, সৌদি আরবের যুবরাজ একজন দূতকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে তাকে একটি ফুলের তোড়া উপহার দিয়েছিলেন, কিন্তু ভারতের কংগ্রেস সরকার কোনও আপত্তি জানায়নি।
কমলা সুরাইয়া হওয়ার আগে তিনি ভগবান কৃষ্ণের উপর অসংখ্য কবিতা লিখেছিলেন এবং নিজেকে কৃষ্ণের ভক্ত বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু তারপর, তার একটি বক্তব্য বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যখন তিনি বলেছিলেন, “আমি আমার হৃদয়ে ভগবান কৃষ্ণকেও ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছি।”
তারপর, ২০০৯ সালে, তার ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং কেরালা সরকার তাকে প্রথমে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে এবং পরে পুনের একটি একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে। তিন ছেলে এবং সমস্ত আত্মীয়স্বজন ইতিমধ্যেই তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। তার মুসলিম স্বামী, যার তৃতীয় স্ত্রী তিনি ছিলেন, একবারও তার সাথে দেখা করতে যাননি ।
মৃত্যুর আগে তিনি লিখেছিলেন, “আমি যখন সামদানির প্রেমে পড়ি, তখন কেউ যদি আমাকে গুলি করতো… আমি বুঝতে পারিনি যে কেরালার হিন্দু মহিলাদের ইসলামে আকৃষ্ট করার জন্য আমাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ফাঁসানো হয়েছে, এবং সৌদি আরবের অনেক লোক এতে জড়িত ছিল।’
আট মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় প্রতি মুহুর্ত তিনি ক্যান্সারের যন্ত্রণার মাঝে তিনি তার ছেলে এবং নাতিদের স্মরণ করেছেন । কিন্তু মায়ের প্রতি তীব্র অভিমানে তার তিন ছেলের কেউই একটা বারের জন্য তার খবর নিতে আসেননি । অবশেষে ২০০৯–এর ৩১ মে পুনের ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় । মৃত্যুর পরেও পাশে পাননি ছেলেদের । কেরালা সরকার দেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে উদ্যোগী হয় । কমলা সুরাইয়ার দেহ পুনের সরকারি হাসপাতাল থেকে তিরুবনন্তপুরমে নিয়ে আসে । তারপর তাকে মালাবারের জামা মসজিদের পাশের কবরস্থানে কবর দেয় । মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন ও বামপন্থী ছাড়া সেই সময় কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে সেখান্ব দেখা যায়নি বলে মনে যায় ।।

