প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,২৪ জানুয়ারী : এক কাপড়ে ভিটেমাটি ছেড়ে “কাঁটাতার’ পেরিয়ে ভারতে চলে আসতে হওয়ার বেদনা আজও দগদগে হয়ে আছে উদ্বাস্তুদের মনে। সেই ’কাঁটাতার’ তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এবছর জায়গা করে।নিল সরস্বতী পুজোর থিম ভাবনায়।চলতি এসআইআর আবহে পূর্ব বর্ধমানের কালনার বকুলতলা রুপালিকা ক্লাব “কাঁটাতার’কে থিম।করে সরস্বতী পুজোর আয়োজন করে সাড়া ফেলে দিয়েছে। শুক্রবার সরস্বতী পুজোর দিন সকাল থেকেই রুপালিকা ক্লাবের এই মণ্ডপের সামনে উপচে পড়লো দর্শনার্থীদের ভিড়।
কালনার ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবী সরস্বতীর আরাধনা। অভিনব থিম ভাবনা ও শৈল্পিক উপস্থাপনা প্রকাশ ঘটে কালনার সরস্বতী পুজোয়। থিম ভাবনায় একে অপরকে টেক্কা দিতে পুজো আয়োজকরা কোন খামতি রাখেন না। তারই মধ্যে কালনার রুপালিকা ক্লাব “কাঁটাতার“কে থিম করে এবছর সরস্বতী পুজোর মণ্ডপ গড়ে তুলে সাড়া ফেলে দিয়েছে।বর্তমান সময়ে SIR, NRC-সহ নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপট থেকেই এই থিম ভাবনার জন্ম বলে মনে করছেন অনেকেই।
ক্লাবের সভাপতি বুবাই সিংহ বলেন,আমদের ক্লাবের মণ্ডপে মূলত ১৯৭১ সালে “কাঁটাতার” পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তু মানুষদের জীবনযুদ্ধের এক অমোঘ কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কি কারণে ও কীভাবে অসংখ্য মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে সীমান্ত পেরোতে বাধ্য হয়েছিল‘সেই সময়ের জীবনযাত্রা,মানসিক টানাপোড়েন,খাদ্যাভ্যাস এবং নিত্যদিনের সংগ্রামের ছবি অত্যন্ত বাস্তব ধর্মীভাবে আমাদের মণ্ডপে তুলে ধরেছেন শিল্পী। ক্লাব সদস্য শ্যামল বিশ্বাস বলেন,’কাঁটাতারের বেড়া, উদ্বাস্তুদের ক্লান্ত মুখ,অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্ক,এইসব কিছু মিলিয়ে মণ্ডপজুড়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর অনুভবের পরিবেশ।’সেটাই দর্শনার্থীদের মন কাড়ছে বলে ক্লাব সদস্য দাবি করেছেন।
কাঁটাতার কে থিম করে এবছর কালনার রুপালিকা ক্লাবের মণ্ডপ তৈরি করেছেন শিল্পী সন্দীপ সাঁতরা। তিনি জানান,’১৯৭১ সালে ওপার বাংলার বহু মানুষ এক কাপড়ে তাঁদের ভিটেমাটি ছেড়ে এসে কাঁটাতারের বেড়ার সামনে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়েছেন। বর্তমান সময়টা যেন সেইসব দিনের কথাই সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
আমাদের মণ্ডপে অনেকটা তারই প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হচ্ছে।’ পুজো উদ্যোক্তাদের কথা অনুযায়ী,প্রায় দেড় মাস ধরে শিল্পী অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই থিমকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন। প্রথম যখন শিল্পী এই ভাবনার কথা আমাদের জানান, তখনই বিষয়টি আমাদের খুব পছন্দ হয়। ধাপে ধাপে যেভাবে তিনি চিন্তাটাকে মণ্ডপে রূপ দিয়েছেন,তা সত্যিই সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ক্লাব সভাপতি বুবাই সিংহ অবশ্য পরিস্কার জানিয়ে দেন, তাঁরা তাঁদের সরস্বতী পুজোর থিমের সঙ্গে কখনোই SIR বা NRC-কে সরাসরি যুক্ত করতে চান না। তাঁদের মতে,“কাঁটাতার“ থিমকে দর্শক তাদের মতোকরে গ্রহণ করতে পারে। তবে এই থিম ভাবনায় মণ্ডপ তৈরি নিয়ে তাঁদের উদ্দেশ্য হলো, ১৯৭১ সালে কাঁটাতার পেরিয়ে আসা মানুষের জীবনযন্ত্রণার ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।’ দর্শনার্থীরা কিন্তু রুপালিকা ক্লাবের এই সাহসী ও সময়োপযোগী ভাবনাকে বর্তমান প্রেক্ষাপটেরই তুলনা টেনেছেন।অনেকে বলছেন,সরস্বতী পুজোয় রুপালিকা ক্লাবের ‘কাঁটাতার’ থিম শুধুমাত্র শৈল্পিক উপস্থাপনাই নয়, এই থিমের মধ্যদিয়েই ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে উপস্থাপিত করা হয়েছে।।

