প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,২৪ জানুয়ারী : “ভ্যালেন্টাইন্স ডে” বা “ভালোবাসা”র দিন হিসাবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারী দিনটি নির্ধারিত । কিন্তু এরাজ্যের গ্রামবাংলার তরুন- তরুনীরা বাগদেবীর আরাধানার দিনটাকে কার্যত “প্রেমের দিন” হিসাবে পালন করে আসেন । তবে কবে এবং কি উপলক্ষে দেবী সরস্বতীর পূজোর দিনের সঙ্গে “প্রেম”কে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল তা অজানা । বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলাপবাগ ক্যাম্পাসে কিন্তু প্রতি বছরই সরস্বতীর পূজোর পরের দিনটিতে “তত্ত্ব আদান -প্রদান”-এর মাধ্যমে মন ঘটা করে দেওয়া নেওয়ার পর্ব সেরে নেয় ছাত্রছাত্রীরা । কয়েক দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীবাস ও ছাত্রাবাসের আবাসিক পড়ুয়ারা বিয়ের তত্ত্বের মত ফুল,মিষ্টি ও উপহারের ডালা সাজিয়ে একে অপরের হাতে তুলে দিয়ে আসেন। সত্তরের দশক ধরে এই রীতি চলে আসছে । এবারেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি । আজ শনিবার, রীতিমতো ঢাক,কাঁসর,ঘন্টা বাজিয়ে “তত্ত্ব আদান-প্রদান”-এর মাধ্যমে কার্যত মন দেওয়া নেওয়ার পর্ব সেরে নিলেন । শুরু হল নতুন একটা সম্পর্কের পথচলা !
গোলাপবাগ ক্যাম্পাসে রয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের পৃথক আবাসিক ভবন । ছাত্রীদের জন্য গার্গী,নিবেদিতা, সরোজিনী এবং মীরাবাঈ প্রভৃতি হোস্টেল রয়েছে । ছাত্রদের জন্য চিত্তরঞ্জন, অরবিন্দ, নেতাজি, বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্র নামের ভবন রয়েছে । এমনিতে সারাবছর ছেলেদের হোস্টেলে মেয়েদের আর মেয়েদের হোস্টেলে ছেলেদের অলিখিত “নো এন্ট্রি” থাকে । ব্যতিক্রম থাকে শুধুমাত্র সরস্বতী পুজোর দিনগুলি । সত্তরের দশক থেকে রীতিমেনে সরস্বতী পুজোর পরের দিনটায় ছাত্র ছাত্রীদের একে অপরের আবাসে যাবার বিধি নিষেধের বাঁধন ছিন্ন থাকে তত্ত্ব আদান প্রদানের জন্য। পরস্পরের আবাসে পৌছে যাবার এই দিনটিকে ঐতিহ্যের উৎসবের মতন করে পালন করেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা ।
আজ ছিল সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি । ছাত্রীরা রঙবেরঙের শাড়ি পরে হাতে ফুল,মিষ্টি ও উপহারের দিয়ে সাজানো তত্ত্ব নিয়ে ছাত্রাবাসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় । সটান ঢুকে যান ছাত্রাবাসে ।এরপর একই কায়দায় ছাত্ররাও রঙচঙে পাঞ্জাবি পরে তত্ত্ব হাতে নিয়ে ছাত্রীবাসে ঢোকে। রীতিমত ঢাক, কাঁসর ঘন্টা বাজিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা তত্ত্ব আদান প্রদান সারেন ।কারো কারোর কথায় এটা আদপে এটা হল ঐতিহ্যের মোড়কে ক্যাম্পাসে ’বসন্তের দ্যুতি’ ছড়ানো’ ।
তবে এই রীতি কবে, কেন চালু হয়েছিল তা স্পষ্ট করে কেউ বলতে পারেননি। অনেকেই মনে করেন সত্তরের দশকে এই বিশেষ রীতির সূচনা হয়েছিল ।এর কারণ হিসাবে মনে করা হয় নিছক একে অপরের কৌতুহল নিরসন ৷ কারন বছরের অন্য সময় নিরাপত্তার কারনে ছাত্রী আবাসনে ছাত্রদের প্রবেশের খুব একটা সুযোগ থাকে না । বিপরীত দিকেও একই কঠোর নিয়ম প্রযোজ্য । ফলে প্রেমের মানুষটা কেমন অবস্থায় আছে,এই কৌতুহল রয়েই যায় । আর সেই কৌতুহলের নিরসন হয় সরস্বতী পূজোর দিনগুলিতে । উঠে যায় “নো এন্ট্রি” । সেই সুযোগে সরস্বতী পুজোর পরের দিনটা তত্ত্ব আদান প্রদানের মাধ্যমে মনের মানুষের একটু কাছাকাছি আসার সুযোগ তৈরি হয়ে যায় । যদিও ছাত্র-ছাত্রীদের মতে,’এদিনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বন্ধুত্বের সুসম্পর্ক আরও নিবিড় হয়’ । তবে যে যাই বলুক, বসন্ত মানেই প্রেম, ভালোবাসার রঙে রাঙানো এক অপরূপ অনুভূতির ঋতু । নবপল্লব,ফুলের কুঁড়ি, উষ্ণ আবহাওয়া এবং পাখিদের ডাক মানুষের মনে রোমান্টিকতার সঞ্চার করে । তাই প্রেম নিবেদনের সুবর্ণ সুযোগ এদিন পড়ুয়াদের কেউই হাতছাড়া করতে চাইলেন না । আজ সকালে হলুদ পাঞ্জাবি পরে সৌম্যদীপ মণ্ডল ও হলুদ শাড়িতে পপি দাসরা যখন তত্ত্ব আদান প্রদান করেন তখন তাদের মুখ অজান্তেই যেন “লাজে রাঙা” হয়ে যায় । শুধু তারা দু’জনেই নন,বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নতুন যুগলের মধ্যেই অভিব্যক্তি । সৌম্যদীপ,পপিরা বলেন,’এবারে আমরা তত্ত্ব আদান প্রদানের আনন্দ খুব ভালো ভাবে উপভোগ করেছি । এবারের সরস্বতী পূজো খুব ভালো কেটেছে আমাদের ।’।

