এইদিন স্পোর্টস নিউজ,১৪ নভেম্বর : ২০৩০ ফুটবল বিশ্বকাপ বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের ১০০ বছর পূজার করবে । মহাদেশের ছয়টি দেশে টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে । ইউরোপের দুই দেশ স্পেন ও পর্তুগাল, আফ্রিকার মরক্কো এবং লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে- এই ৬ দেশ আসন্ন বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক। কিন্তু বিশ্বকাপের আয়োজন করতে গিয়ে যাবতীয় রোষ এসে পড়ছে পথকুকুরের উপর । নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হচ্ছে হাজার হাজার পথ কুকুর । আর বর্বরোচিত কান্ড ঘটাচ্ছে আফ্রিকান দেশ মরক্কো । এ নিয়ে দেশটিসহ বিশ্বজুড়েই বাড়ছে ক্ষোভের আগুন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।
মরক্কোতে কুকুর হত্যার একটি ভিডিও ফুটেজ পেয়েছে টেলিগ্রাফ। সেই ভিডিওর বর্ণনায় সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, গভীর রাতে একটি সাদা ভ্যানে করে উজদা শহরের একটি আবাসিক এলাকায় যান দুই ব্যক্তি। গাড়ি থেকে নেমে দুজনের একজন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কুকুরের দিকে গিয়ে তার লেজ ধরে টেনে গাড়ির দিকে নিয়ে যান। আরেকজন রাইফেল তাক করে গুলি চানাল। মুহূর্তেই কুকুরটি মারা যায়। এরপর মৃত কুকুরটিকে তারা ভ্যানের পেছনে ছুড়ে ফেলেন।
টেলিগ্রাফ স্পোর্টস জানিয়েছে, পুরো ‘অপারেশনটি’ সম্পন্ন হতে সময় লেগেছে মোটে ৯০ সেকেন্ডেরও কম সময়। ঘটনার ফুটেজ প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে টেলিগ্রাফ। ঘটনাটি শুধু নৃশংস বলেই নয়, বরং যে দ্রুততা ও দক্ষতার সঙ্গে কুকুরটিকে মেরে ফেলা হয়েছে, সেটা চমকে দেওয়ার মতো। আর মেরে ফেলার পর কুকুরটিকে যে ভ্যানে ফেলা হয়েছিল, সেটি আগে থেকেই মৃত কুকুরে ভর্তি ছিল।
টেলিগ্রাফ লিখেছে, মরক্কোর রাস্তায় থাকা কুকুরদের এমন নির্মম মৃত্যু কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা অনেক সংগঠন অভিযোগ করেছে, দেশটিতে অসংখ্য কুকুরকে বিষ খাইয়ে, না খাইয়ে, পিটিয়ে কিংবা জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। সেখানকার কুকুরদের বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রমাণও সংগ্রহ করেছে তারা।
মরক্কোর রাস্তাঘাটে বেওয়ারিশ কুকুরের সমস্যা আগে থেকেই ছিল। আর সে কুকুর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বহু বছর আগে থেকেই করে আসছে দেশটি। তবে প্রাণী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, দেশটি ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ সহ-আয়োজক হওয়ার পর থেকে কুকুরদের ওপর নির্যাতন আরও বেড়েছে এবং বর্বরতা আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।
মরক্কোর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, ২০৩০ বিশ্বকাপ ও আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের আয়োজন ঘিরে ‘রাস্তা পরিষ্কার’ করার নামে লাখ লাখ বেওয়ারিশ কুকুর হত্যা করছে। একইসঙ্গে ফিফা অভিযুক্ত যে তারা মরক্কোয় চলমান এই অমানবিক হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ উপেক্ষা করছে। এ ঘটনায় ফিফা উপরেও দায় চাপিয়েছে সংগঠনগুলো । তাদের অভিযোগ, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কুকুর হত্যার প্রমাণ পাঠালেও দেখেও না দেখার ভান করে আছে ।
বিষয়টি নিয়ে শুধু যে মরক্কোতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, এমন নয়। বরং ক্ষোভ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে বলে উল্লেখ করেছে টেলিগ্রাফ। আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, মানবাধিকার সংস্থা ও প্রাণী অধিকারকর্মীরা শুধু প্রাণীর কল্যাণ নিয়ে নয়, বরং মরক্কোর এ ইস্যুতে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অনেক ঘটনায় দেখা গেছে, শিশুদের সামনেই এসব নির্মম হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে। এ বছরের শুরুতে ফেয়ারস্কয়ার নামের একটি সংস্থা জানিয়েছিল, এসব হত্যাকাণ্ড দেখা শিশুরা গুরুতর মানসিক আঘাতের শিকার হচ্ছেন, এ নিয়ে তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আছে।
আন্তর্জাতিক প্রাণী কল্যাণ জোট (IAWPC) স্থানীয়দের সহায়তায় এসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অসংখ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। তারা যেসব ভিডিও ও ছবি পেয়েছে, সেগুলো এতটাই ভয়ংকর যে, সাধারণ মানুষ তা সহ্য করতে পারবে না বলে উল্লেখ করেছে টেলিগ্রাফ। IAWPC এর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মরক্কো বিশ্বকাপ সহ-আয়োজক হওয়ার পর থেকে, বিশেষত আফ্রিকা কাপের আগে পরিস্থিতি ভয়াবহরূপ নিয়েছে।
কুকুর নিধন নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেসব দাবি উড়িয়ে দিয়েছে মরক্কোর সরকার। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করছে, তারা কুকুর নিধনের কোনো পরিকল্পনা নেয়নি। বরং ২০১৯ সালে ‘ট্র্যাপ-নিউটার-ভ্যাকসিন-রিটার্ন’ (TNVR) পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এতে কুকুর ধরার পর বন্ধ্যাকরণ, টিকা প্রয়োগ ও পুনরায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
দেশটির সরকার দাবি করছে, প্রাণী নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোতে গত ৫ বছরে ২ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছেন তারা। কিন্তু IAWPC বলছে, এসব শুধু ‘দেখানোর জন্য’, বাস্তবে কুকুর হত্যা অব্যাহত রয়েছে। IAWPC-এর চেয়ারম্যান লেস ওয়ার্ড বলেছেন, ‘এটা স্পষ্ট যে, মরক্কো কোনো ধরনের অর্থবহ TNVR কার্যক্রম চালাচ্ছে না।’
তাহলে কুকুর হত্যার দায় মূলত কার? মরক্কোর সরকার বলছে, তারা প্রাণী হত্যা সমর্থন করেন না। এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে যারা আছেন, বিপদগামী প্রাণীদের ব্যবস্থাপনা করা তাঁদের দায়িত্ব। কিন্তু এ বছরের শুরুতে রাবাতের এক আদালত এক রায়ে জানিয়েছে, রাষ্ট্র সর্বোচ্চ তত্ত্বাবধায়ক হওয়ায় এই হত্যার দায় সরকারের ওপরই পড়ে।
মরক্কোর এ ঘটনায় চাপ বাড়ছে ফিফার ওপরও। অবিলম্বে এ ইস্যুতে পদক্ষেপ নিতে ফিফাকে আহ্বান জানিয়েছে প্রাণী অধিকার সংস্থা পেটা। সংস্থাটি বলছে, গণহারে কুকুর হত্যা করে প্রাণী অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি সরাসরি লঙ্ঘন করছে মরক্কো।
ফিফার ওপর দায় চাপিয়ে ফেয়ার স্কয়ারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নিকোলাস ম্যাকগীহান বলেছেন, ‘এটা একদিকে যেমন ভয়ংকর, অন্যদিকে ফিফার শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতারও প্রমাণ। তারা শুধু চায় মরক্কো যেন স্পনসরদের চোখে সুন্দর দেখায়।’ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এক বিবৃতিতে টেলিগ্রাফকে ফিফা জানিয়েছে, বেওয়ারিশ কুকুর নিধন ইস্যুতে মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনকে সতর্ক করেছে তারা।।

