এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,১৬ জানুয়ারী : সম্প্রতি, বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে একটি নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা একটি সরকার পতনের সমান। এই ঘটনা কেবল লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করেনি, বরং বিশ্বব্যাপী একটি নতুন ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতির ইঙ্গিত দিয়েছে । তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে লক্ষ্যই থাকুকনা কেন, ভেনেজুয়েলার পতনকে অনেক দেশের জন্য অশনি সঙ্কেত বলে মনে করা হচ্ছে । প্রাকৃতিক তেলের ভান্ডার সমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলাকে এক সময় বিশ্বের চতুর্থ ধনী দেশ বলা হত । এই সমৃদ্ধ দেশটা আজ ভিখারিতে পরিনত হয়েছে । আর এরজন্য সম্পূর্ণ দায়ি হল বামপন্থী হুগো শাভেজ (Hugo Chávez)। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে তিনি ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ৷ ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্যাভেজ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ২০১৩ সালের ৫ মার্চ শ্যাভেজ মারা যান এবং মাদুরো অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হন।
সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে শাভেজ ও নিকোলাস মাদুরো কিভাবে একটা সমৃদ্ধ দেশটাকে আজ ধ্বংস করে দিয়েছে,তার ইতিহাস তুলে ধরেছেন দক্ষিণপন্থী লেখক ও ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায় ।
তিনি ভেনেজুয়েলার পতন নিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে একটা বিস্তারিত পোস্ট করেছেন । তার অকাট্য যুক্তি যা সকলকে ভাবিয়ে তুলবে । তিনি ভেনেজুয়েলার পতনকে ভারতের জন্য “একটি ভয়ঙ্কর সতর্কীকরণ” বলেও মনে করছেন ।
তথাগত রায় লিখেছেন,’প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা একটি মনস্তাত্ত্বিক অপরাধ —ভারতের জন্য একটি ভয়ঙ্কর সতর্কীকরণ । এটি এমন একটি দেশের গল্প নয় যা ভেঙে পড়েছে। এটি এমন একটি সমাজের গল্প যা মানসিকভাবে খুন করা হয়েছিল।’ তিনি লিখেছেন,’ভেনেজুয়েলার কথা বলতে গেলে, সবাই একই কথা বলে — আমেরিকার দোষ। হ্যাঁ… তাই। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আসল প্রশ্নগুলি হল: কেন ভেনেজুয়েলা এত দুর্বল হয়ে পড়ল? কীভাবে একটি ধনী জাতি তার নিজের লোকদের হাতে নিজেকে ধ্বংস করে দিল?
উত্তর —একটি মনস্তাত্ত্বিক অপরাধ যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে। একটি ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক গল্প যা একটি সমগ্র জাতির ভাগ্য বদলে দিয়েছে।একসময়, ভেনেজুয়েলা — একটি স্বর্গ,ল্যাটিন আমেরিকার দ্রুততম বিকাশমান দেশ। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি অর্থনীতির মধ্যে একটি। সৈকত পর্যটকে ভরা।যে দেশটি সর্বাধিক সংখ্যক মিস ওয়ার্ল্ড এবং মিস ইউনিভার্স বিজয়ী তৈরি করেছে। ভেনেজুয়েলায় কাজ করা ছিল বিশ্বজুড়ে তরুণদের জন্য একটি স্বপ্ন। আর তবুও, সেই দেশেই…ধ্বংসের বীজ বপন করা হয়েছিল।
প্রথম পর্যায়: জনগণের মনে বিষ ঢেলে দেওয়া । হুগো শ্যাভেজ নামে একজন নেতার আবির্ভাব। তার প্রথম বক্তব্য ছিল: “বড় শিল্পপতিরা দেশ লুট করছে।” এটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ছিল না। এটি ছিল আবেগগত কৌশল। আজ ভারতে আম্বানি এবং আদানির বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক সমালোচনা শোনা যাচ্ছে, ঠিক তার মতোই । শ্যাভেজ ভেনেজুয়েলার আটটি প্রধান তেল কোম্পানিকে জনগণের শত্রু হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন। “কেন এই সমস্ত তেলকূপ কেবল তাদেরই হবে?” তিনি জনসাধারণের মনে ঈর্ষা, রাগ এবং ঘৃণা বপন করেছিলেন। এখান থেকেই মানসিক অপরাধ শুরু হয়। মানুষের মনে, শত্রুদের প্রয়োজন তৈরি হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়: মিথ্যা ত্রাণকর্তার মায়া । তারপর নেতা উঠে দাঁড়িয়ে বলেন: “আমি তোমাদের জন্য লড়াই করব।” মানুষ তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে একজন নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন ত্রাণকর্তা হিসেবে। এখানেই গণতন্ত্র ধীরে ধীরে মারা যেতে শুরু করে।
পর্যায় ৩: বিনামূল্যের নেশার নেশা — স্নায়ুতন্ত্রের উপর আক্রমণ৷ শ্যাভেজ জনগণকে একটি স্বপ্ন বিক্রি করেছিলেন: “আমাদের এত তেল আছে।আমরা আমাদের দেশে প্রতি লিটারে আধা পয়সায় তা বিক্রি করব। প্রতিটি পরিবার মাসে ১০,০০০ বলিভার পাবে শুধুমাত্র ঘরে বসে থাকার জন্য!”
মানুষ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আজ আমরা যে ধরণের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শুনি -“খটাখট… খটাখট…”। এটি নীতি নয়। এটি জনগণের স্নায়ুতন্ত্রের দখল।কাজের পুরষ্কারের মধ্যে যোগসূত্র ভেঙে গেছে।শ্রমের মূল্য মারা যায়। দেশ টিকে থাকে…কিন্তু চিন্তাভাবনা বন্ধ করে দেয়। শ্যাভেজ ক্ষমতায় আসেন।
পর্যায় ৪: অর্থনীতি ভেঙে ফেলা । সমস্ত বেসরকারি কোম্পানি জাতীয়করণ করা হয়েছিল।বিনিয়োগকারীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।জনগণের জন্য বিনামূল্যে টাকা। আর কাজ করার দরকার নেই। উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে । জিডিপি ভেঙে পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছুঁয়েছে ।
পর্যায় ৫: মুদ্রার বিভ্রম – অর্থনৈতিক আত্মহত্যা । অর্থনীতি ভেঙে পড়ার সাথে সাথে, শ্যাভেজ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন: “আসুন আরও মুদ্রা ছাপাই – দারিদ্র্য দূর হবে!” অতীতে, রাহুল গান্ধী এবং সাংবাদিক রবীশ কুমারও একই রকম ধারণা প্রকাশ করেছিলেন। এই অত্যন্ত বিপজ্জনক ধারণাটি বাস্তবায়িত হয়েছিল৷ ফলাফল?
অবশেষে, এমনকি ১,০০০ কোটি টাকার একটি বলিভার নোটও ছাপাতে হয়েছিল। মুদ্রা নোট আবর্জনার মতো রাস্তায় পড়ে ছিল। পৌর কর্মীরা সেগুলো সংগ্রহ করে ট্রাকে করে ফেলেছিলেন।এটি কোনও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ছিল না -এটি একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তির পতন ছিল।
পর্যায় ষষ্ঠ: প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানসিক উত্তরাধিকার৷ এই নীতিমালার অধীনে বেড়ে ওঠা শিশুরা শিখেছে: বিনামূল্যে অধিকার,কঠোর পরিশ্রম বোকামি, প্রশ্নবিদ্ধকরণ হল বিশ্বাসঘাতকতা । এটি সভ্যতার মস্তিষ্কের ক্ষতি।
পর্যায় ৭: রাজবংশীয় একনায়কতন্ত্র । মৃত্যুর আগে, শাভেজ নিকোলাস মাদুরোকে তার উত্তরসূরি হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। শাভেজ → মাদুরো ; নেহেরু → ইন্দিরা → রাজীব → রাহুল । ভেনিজুয়েলায়ও একই রাজনৈতিক ডিএনএ বিদ্যমান ছিল।যোগ্যতা আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না;একটি নির্দিষ্ট পরিবারে জন্মগ্রহণ করা শাসন করার যোগ্যতা হয়ে ওঠে। পারিবারিক শাসন স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে। নির্বাচন অপ্রয়োজনীয় মনে হতে শুরু করে। এটি কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয় – এটি একটি মানসিক ফাঁদ। মাদুরো তার পরামর্শদাতা শাভেজের চেয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন।।

