শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়টি ভক্তিযোগ নামে পরিচিত, যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে সাকার (ব্যক্তিগত রূপ) ও নিরাকার (অব্যক্ত) উপাসনার মধ্যে ভক্তিযোগের শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যা করেছেন এবং একজন আদর্শ ভক্তের গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, যা শ্রীকৃষ্ণের কাছে অত্যন্ত প্রিয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এই অধ্যায়ে ভক্তির মাধ্যমে পরমেশ্বরকে লাভ করার সহজ ও দ্রুত পথ দেখানো হয়েছে, যেখানে কর্মফল ত্যাগ ও পরমेश्वরে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণই মুখ্য।
ওং শ্রী পরমাত্মনে নমঃ
অথ দ্বাদশোঽধ্যায়ঃ ।
ভক্তিয়োগঃ
অর্জুন উবাচ
এবং সততয়ুক্তা যে ভক্তাস্ত্বাং পর্য়ুপাসতে ।
যে চাপ্যক্ষরমব্যক্তং তেষাং কে যোগবিত্তমাঃ ॥ 1 ॥
শ্রীভগবানুবাচ
ময়্য়াবেশ্য মনো যে মাং নিত্যয়ুক্তা উপাসতে ।
শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ ॥ 2 ॥
যে ত্বক্ষরমনির্দেশ্যমব্যক্তং পর্য়ুপাসতে ।
সর্বত্রগমচিংত্যং চ কূটস্থমচলং ধ্রুবম্ ॥ 3 ॥
সংনিযম্যেংদ্রিয়গ্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ ।
তে প্রাপ্নুবংতি মামেব সর্বভূতহিতে রতাঃ ॥ 4 ॥
ক্লেশোঽধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্ ।
অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং দেহবদ্ভিরবাপ্যতে ॥ 5 ॥
যে তু সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মত্পরাঃ ।
অনন্যেনৈব যোগেন মাং ধ্যায়ংত উপাসতে ॥ 6 ॥
তেষামহং সমুদ্ধর্তা মৃত্য়ুসংসারসাগরাত্ ।
ভবামি ন চিরাত্পার্থ ময়্যাবেশিতচেতসাম্ ॥ 7 ॥
ময়্যেব মন আধত্স্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয় ।
নিবসিষ্যসি ময়্যেব অত ঊর্ধ্বং ন সংশয়ঃ ॥ 8 ॥
অথ চিত্তং সমাধাতুং ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্ ।
অভ্য়াসয়োগেন ততো মামিচ্ছাপ্তুং ধনংজয় ॥ 9 ॥
অভ্য়াসেঽপ্যসমর্থোঽসি মত্কর্মপরমো ভব ।
মদর্থমপি কর্মাণি কুর্বন্সিদ্ধিমবাপ্স্যসি ॥ 10 ॥
অথৈতদপ্যশক্তোঽসি কর্তুং মদ্যোগমাশ্রিতঃ ।
সর্বকর্মফলত্য়াগং ততঃ কুরু যতাত্মবান্ ॥ 11 ॥
শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্য়াসাজ্জ্ঞানাদ্ধ্য়ানং বিশিষ্যতে ।
ধ্যানাত্কর্মফলত্য়াগস্ত্য়াগাচ্ছাংতিরনংতরম্ ॥ 12 ॥
অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ ।
নির্মমো নিরহংকারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী ॥ 13 ॥
সংতুষ্টঃ সততং যোগী যতাত্মা দৃঢনিশ্চয়ঃ ।
ময়্যর্পিতমনোবুদ্ধির্য়ো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ ॥ 14 ॥
যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ ।
হর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈর্মুক্তো যঃ স চ মে প্রিয়ঃ ॥ 15 ॥
অনপেক্ষঃ শুচির্দক্ষ উদাসীনো গতব্যথঃ ।
সর্বারংভপরিত্য়াগী যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ ॥ 16 ॥
যো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাংক্ষতি ।
শুভাশুভপরিত্য়াগী ভক্তিমান্য়ঃ স মে প্রিয়ঃ ॥ 17 ॥
সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ ।
শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ সংগবিবর্জিতঃ ॥ 18 ॥
তুল্যনিংদাস্তুতির্মৌনী সংতুষ্টো যেন কেনচিত্ ।
অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্মে প্রিয়ো নরঃ ॥ 19 ॥
যে তু ধর্ম্যামৃতমিদং যথোক্তং পর্য়ুপাসতে ।
শ্রদ্দধানা মত্পরমা ভক্তাস্তেঽতীব মে প্রিয়াঃ ॥ 20 ॥
।।ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্য়ায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে ভক্তিয়োগো নাম দ্বাদশোঽধ্যায়ঃ ॥
মূল বিষয়বস্তু:
অর্জুনের প্রশ্ন (শ্লোক ১): অর্জুন জিজ্ঞাসা করেন, যিনি সবসময় আপনার (শ্রীকৃষ্ণের) ব্যক্তিগত রূপের উপাসনা করেন এবং যিনি অব্যক্ত ব্রহ্মের উপাসনা করেন—এদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ যোগী?
কৃষ্ণের উত্তর (শ্লোক ২-৪): শ্রীকৃষ্ণ বলেন, যিনি তাঁর ব্যক্তিগত রূপে মন স্থির রেখে ভক্তি সহকারে উপাসনা করেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ। তবে, যারা ইন্দ্রিয় সংযত করে অব্যক্ত ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তারাও অবশেষে তাঁকে লাভ করেন, কিন্তু তাঁদের পথ কষ্টসাধ্য।
ভক্তিযোগের শ্রেষ্ঠত্ব (শ্লোক ৬-৭): যিনি সমস্ত কর্মফল ত্যাগ করে, আমাকে (শ্রীকৃষ্ণকে) আশ্রয় করে, আমার প্রতি সম্পূর্ণ ভক্তি ও একাগ্রতার সাথে কর্ম করেন, আমি তাঁকে জন্ম-মৃত্যুর সংসার-সাগর থেকে দ্রুত উদ্ধার করি।
আদর্শ ভক্তের গুণাবলী (শ্লোক ১৩-১৯): ভগবান তাঁর প্রিয় ভক্তের গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, যেমন—সকলের প্রতি মৈত্রীভাব, করুণা, অহংকার ও আসক্তি বর্জন, সুখ-দুঃখে সমভাব, ক্ষমাশীলতা, সন্তুষ্টি, একাগ্রতা, এবং যিনি জগৎকে উৎপীড়িত করেন না বা জগৎ যাঁকে উৎপীড়িত করে না।
উপসংহার (শ্লোক ২০): যে সকল ভক্ত এই জ্ঞানকে শ্রদ্ধা সহকারে অনুসরণ করেন এবং আমাকেই পরম আশ্রয় মনে করেন, তাঁরা আমার অত্যন্ত প্রিয়।
সারসংক্ষেপ:
এই অধ্যায়টি ভক্তির শক্তি ও গুরুত্ব তুলে ধরে, যেখানে নিষ্কাম কর্ম ও ভগবানে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকে পরম সিদ্ধি লাভের পথ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা কর্ম ও জ্ঞানের মার্গ অপেক্ষা সহজ ও দ্রুত।

