শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়টি “বিভূতি যোগ” নামে পরিচিত, যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ঐশ্বরিক মহিমা, বিভূতি এবং সমস্ত সৃষ্টির উৎস ও ধারক হিসেবে নিজের স্বরূপ বর্ণনা করেছেন, যা মানুষকে ভগবানের উপলব্ধি ও ভজনায় উদ্বুদ্ধ করে; এই অধ্যায়ে তিনি দেখিয়েছেন যে বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা তাঁর এই মহিমা জেনে ভক্তি সহকারে তাঁর উপাসনা করে।
ওং শ্রীপরমাত্মনে নমঃ
অথ দশমোঽধ্য়ায়ঃ ।
বিভূতিয়োগঃ
শ্রীভগবানুবাচ
ভূয় এব মহাবাহো শৃণু মে পরমং বচঃ ।
যত্তেঽহং প্রীয়মাণায় বক্ষ্যামি হিতকাম্যয়া ॥ 1 ॥
ন মে বিদুঃ সুরগণাঃ প্রভবং ন মহর্ষয়ঃ ।
অহমাদির্হি দেবানাং মহর্ষীণাং চ সর্বশঃ ॥ 2 ॥
যো মামজমনাদিং চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্ ।
অসংমূঢঃ স মর্ত্য়েষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে ॥ 3 ॥
বুদ্ধির্জ্ঞানমসংমোহঃ ক্ষমা সত্যং দমঃ শমঃ ।
সুখং দুঃখং ভবোঽভাবো ভয়ং চাভয়মেব চ ॥ 4 ॥
অহিংসা সমতা তুষ্টিস্তপো দানং যশোঽযশঃ ।
ভবংতি ভাবা ভূতানাং মত্ত এব পৃথগ্বিধাঃ ॥ 5 ॥
মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারো মনবস্তথা ।
মদ্ভাবা মানসা জাতা যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ ॥ 6 ॥
এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ ।
সোঽবিকংপেন যোগেন যুজ্যতে নাত্র সংশয়ঃ ॥ 7 ॥
অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে ।
ইতি মত্বা ভজংতে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ ॥ 8 ॥
মচ্চিত্তা মদ্গতপ্রাণা বোধয়ংতঃ পরস্পরম্ ।
কথয়ংতশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যংতি চ রমংতি চ ॥ 9 ॥
তেষাং সততয়ুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্ ।
দদামি বুদ্ধিয়োগং তং যেন মামুপয়াংতি তে ॥ 10 ॥
তেষামেবানুকংপার্থমহমজ্ঞানজং তমঃ ।
নাশয়াম্য়াত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা ॥ 11 ॥
অর্জুন উবাচ
পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্ ।
পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভুম্ ॥ 12 ॥
আহুস্ত্বামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষির্নারদস্তথা ।
অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে ॥ 13 ॥
সর্বমেতদৃতং মন্যে যন্মাং বদসি কেশব ।
ন হি তে ভগবন্ব্যক্তিং বিদুর্দেবা ন দানবাঃ ॥ 14 ॥
স্বযমেবাত্মনাত্মানং বেত্থ ত্বং পুরুষোত্তম ।
ভূতভাবন ভূতেশ দেবদেব জগত্পতে ॥ 15 ॥
বক্তুমর্হস্যশেষেণ দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ ।
যাভির্বিভূতিভির্লোকানিমাংস্ত্বং ব্য়াপ্য তিষ্ঠসি ॥ 16 ॥
কথং বিদ্যামহং যোগিংস্ত্বাং সদা পরিচিংতয়ন্ ।
কেষু কেষু চ ভাবেষু চিংত্য়োঽসি ভগবন্ময়া ॥ 17 ॥
বিস্তরেণাত্মনো যোগং বিভূতিং চ জনার্দন ।
ভূয়ঃ কথয় তৃপ্তির্হি শৃণ্বতো নাস্তি মেঽমৃতম্ ॥ 18 ॥
শ্রীভগবানুবাচ
হংত তে কথয়িষ্যামি দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ ।
প্রাধান্যতঃ কুরুশ্রেষ্ঠ নাস্ত্যংতো বিস্তরস্য মে ॥ 19 ॥
অহমাত্মা গুডাকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ ।
অহমাদিশ্চ মধ্যং চ ভূতানামংত এব চ ॥ 20 ॥
আদিত্যানামহং বিষ্ণুর্জ্য়োতিষাং রবিরংশুমান্ ।
মরীচির্মরুতামস্মি নক্ষত্রাণামহং শশী ॥ 21 ॥
বেদানাং সামবেদোঽস্মি দেবানামস্মি বাসবঃ ।
ইংদ্রিয়াণাং মনশ্চাস্মি ভূতানামস্মি চেতনা ॥ 22 ॥
রুদ্রাণাং শংকরশ্চাস্মি বিত্তেশো যক্ষরক্ষসাম্ ।
বসূনাং পাবকশ্চাস্মি মেরুঃ শিখরিণামহম্ ॥ 23 ॥
পুরোধসাং চ মুখ্যং মাং বিদ্ধি পার্থ বৃহস্পতিম্ ।
সেনানীনামহং স্কংদঃ সরসামস্মি সাগরঃ ॥ 24 ॥
মহর্ষীণাং ভৃগুরহং গিরামস্ম্যকমক্ষরম্ ।
যজ্ঞানাং জপযজ্ঞোঽস্মি স্থাবরাণাং হিমালয়ঃ ॥ 25 ॥
অশ্বত্থঃ সর্ববৃক্ষাণাং দেবর্ষীণাং চ নারদঃ ।
গংধর্বাণাং চিত্ররথঃ সিদ্ধানাং কপিলো মুনিঃ ॥ 26 ॥
উচ্চৈঃশ্রবসমশ্বানাং বিদ্ধি মামমৃতোদ্ভবম্ ।
ঐরাবতং গজেংদ্রাণাং নরাণাং চ নরাধিপম্ ॥ 27 ॥
আয়ুধানামহং বজ্রং ধেনূনামস্মি কামধুক্ ।
প্রজনশ্চাস্মি কংদর্পঃ সর্পাণামস্মি বাসুকিঃ ॥ 28 ॥
অনংতশ্চাস্মি নাগানাং বরুণো যাদসামহম্ ।
পিতৄণামর্যমা চাস্মি যমঃ সংযমতামহম্ ॥ 29 ॥
প্রহ্লাদশ্চাস্মি দৈত্যানাং কালঃ কলয়তামহম্ ।
মৃগাণাং চ মৃগেংদ্রোঽহং বৈনতেযশ্চ পক্ষিণাম্ ॥ 30 ॥
পবনঃ পবতামস্মি রামঃ শস্ত্রভৃতামহম্ ।
ঝষাণাং মকরশ্চাস্মি স্রোতসামস্মি জাহ্নবী ॥ 31 ॥
সর্গাণামাদিরংতশ্চ মধ্যং চৈবাহমর্জুন ।
অধ্য়াত্মবিদ্য়া বিদ্যানাং বাদঃ প্রবদতামহম্ ॥ 32 ॥
অক্ষরাণামকারোঽস্মি দ্বংদ্বঃ সামাসিকস্য চ ।
অহমেবাক্ষয়ঃ কালো ধাতাহং বিশ্বতোমুখঃ ॥ 33 ॥
মৃত্যুঃ সর্বহরশ্চাহমুদ্ভবশ্চ ভবিষ্যতাম্ ।
কীর্তিঃ শ্রীর্বাক্চ নারীণাং স্মৃতির্মেধা ধৃতিঃ ক্ষমা ॥ 34 ॥
বৃহত্সাম তথা সাম্নাং গায়ত্রী ছংদসামহম্ ।
মাসানাং মার্গশীর্ষোঽহমৃতূনাং কুসুমাকরঃ ॥ 35 ॥
দ্যূতং ছলয়তামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্ ।
জয়োঽস্মি ব্যবসায়োঽস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্ ॥ 36 ॥
বৃষ্ণীনাং বাসুদেবোঽস্মি পান্ডবানাং ধনঞ্জয়ঃ ।
মুনীনামপ্যহং ব্যাসঃ কবীনামুশনা কবিঃ ॥ 37 ॥
দণ্ডো দমযতামস্মি নীতিরস্মি জিগীষতাম্ ।
মৌনং চৈবাস্মি গুহ্যানাং জ্ঞানং জ্ঞানবতামহম্ ॥ 38 ॥
যচ্চাপি সর্বভূতানাং বীজং তদহমর্জুন ।
ন তদস্তি বিনা যত্স্যান্ময়া ভূতং চরাচরম্ ॥ 39 ॥
নাংতোঽস্তি মম দিব্যানাং বিভূতীনাং পরন্তপ ।
এষ তূদ্দেশতঃ প্রোক্তো বিভূতের্বিস্তরো ময়া ॥ 40 ॥
যদ্যদ্বিভূতিমত্সত্ত্বং শ্রীমদূর্জিতমেব বা ।
তত্তদেবাবগচ্ছ ত্বং মম তেজোংঽশসংভবম্ ॥ 41 ॥
অথবা বহুনৈতেন কিং জ্ঞাতেন তবার্জুন ।
বিষ্টভ্যাহমিদং কৃত্স্নমেকাংশেন স্থিতো জগত্ ॥ 42 ॥
।। ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে বিভূতিয়োগো নাম দশমোঽধ্যায়ঃ ॥
অধ্যায়ের মূল বিষয়:
মহিমা বর্ণনা (শ্লোক ১-৩): কৃষ্ণ বলেন যে দেবগণ, ঋষিগণ বা অন্য কেউ তাঁর উৎপত্তির কারণ জানেন না, কারণ তিনিই সমস্ত কিছুর উৎস; যিনি তাঁকে জন্মহীন, অনাদি এবং সর্বলোকের অধিপতি রূপে জানেন, তিনিই পাপ থেকে মুক্ত হন।
গুণাবলী ও সৃষ্টির উৎস (শ্লোক ৪-৭): বুদ্ধি, জ্ঞান, ক্ষমা, সত্য, ইন্দ্রিয় সংযম, সুখ-দুঃখ, জন্ম-মৃত্যু, ভয়-অভয়, অহিংসা, সমতা, তপস্যা, দান ইত্যাদি সমস্ত গুণাবলী তাঁর থেকেই উদ্ভূত; সাতজন মহর্ষি এবং মনুগণ তাঁর মন থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন, যা থেকে সকল জীব এসেছে।
সর্বভূত ও বিভূতি (শ্লোক ৮-১৯): আমিই সমস্ত আধ্যাত্মিক ও বৈশ্বৈক জগতের উৎস; বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা এই বিভূতি জেনে ভক্তি সহকারে তাঁর উপাসনা করে; তিনি বিভিন্ন রূপে কীভাবে প্রকাশিত, যেমন – ঋষি, দেবতা, স্থান, গুণ, সময়, এবং জীবনের বিভিন্ন অংশে তাঁর উপস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন, যা অর্জুনকে তাঁর স্বরূপ বুঝতে সাহায্য করে।
অর্জুনের জিজ্ঞাসা ও কৃষ্ণের উত্তর (শ্লোক ১২-১৯): অর্জুন জিজ্ঞাসা করেন, “কেমন করে আমি আপনাকে নিরন্তর ধ্যান করব এবং কোন কোন বস্তুতে আপনাকে দেখব?” উত্তরে কৃষ্ণ বিভিন্ন বস্তুর উদাহরণ দেন, যা তাঁর বিভূতির অংশ।
কৃষ্ণের বিশ্বরূপের আভাস (শ্লোক ২০-৪২): তিনি নিজেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বস্তু ও সত্তার মধ্যে, যেমন – বিষ্ণু, আদিত্য, বায়ু, মেরু, বেদ, ইন্দ্রিয়, মন, ঋতু, জয়ের কারণ, এবং সমস্ত কিছুর মধ্যে ‘আমি’ রূপে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন যে তাঁর এই অসীম বিভূতির শেষ নেই এবং তিনি সমস্ত কিছুর সার ও আত্মা।
গুরুত্ব:
এই অধ্যায়টি ভগবানের সর্বব্যাপী ও সর্বশক্তিমান রূপকে তুলে ধরে, যা ভক্তদের ভগবানের উপলব্ধি ও তাঁর প্রতি ভক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।এটি দেখায় যে ঈশ্বর কেবল সৃষ্টির বাইরে নন, বরং সৃষ্টির প্রতিটি কণার মধ্যে তিনি বিরাজমান।

