শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের নাম পুরুষোত্তম যোগ, যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৈরাগ্যের মাধ্যমে সংসার বৃক্ষ (অশ্বত্থ বৃক্ষ) ছেদন করে মোক্ষ লাভের পথ ব্যাখ্যা করেছেন, যা আত্মা ও পরমাত্মার স্বরূপ, এবং সূর্য, চন্দ্র ও অগ্নিতে বিদ্যমান তাঁরই মহিমা বর্ণনা করে, এবং সকল জীব ও জ্ঞানের উৎস হিসাবে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন। এই অধ্যায়ে, পুরুষোত্তম যোগ নামে পরিচিত, যা জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির সমন্বয়ে মোক্ষ লাভের উপায় নির্দেশ করে, যেখানে বৈরাগ্য অত্যাবশ্যক, এবং বৈদিক জ্ঞান ও বেদান্তের মূল বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ওং শ্রী পরমাত্মনে নমঃ
অথ পংচদশোঽধ্য়ায়ঃ ।
পুরুষোত্তমপ্রাপ্তিয়োগঃ
শ্রীভগবানুবাচ
ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখমশ্বত্থং প্রাহুরব্যয়ম্ ।
ছংদাংসি যস্য পর্ণানি যস্তং বেদ স বেদবিত্ ॥ 1 ॥
অধশ্চোর্ধ্বং প্রসৃতাস্তস্য় শাখা গুণপ্রবৃদ্ধা বিষযপ্রবালাঃ ।
অধশ্চ মূলান্যনুসংততানি কর্মানুবংধীনি মনুষ্যলোকে ॥ 2 ॥
ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে নাংতো ন চাদির্ন চ সংপ্রতিষ্ঠা।
অশ্বত্থমেনং সুবিরূঢ়মূলমসংগশস্ত্রেণ দৃঢেন ছিত্ত্বা ॥ 3
ততঃ পদং তত্পরিমার্গিতব্য়ং যস্মিন্গতা ন নিবর্তংতি ভূয়ঃ।
তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী ॥ 4 ॥
নির্মানমোহা জিতসংগদোষা অধ্যাত্মনিত্যা বিনিবৃত্তকামাঃ।
দ্বংদ্বৈর্বিমুক্তাঃ সুখদুঃখসংজ্ঞৈর্গচ্ছংত্যমূঢাঃ পদমব্যয়ং তত্ ॥ 5 ॥
ন তদ্ভাসযতে সূর্য়ো ন শশাংকো ন পাবকঃ ।
যদ্গত্বা ন নিবর্তংতে তদ্ধাম পরমং মম ॥ 6 ॥
মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ ।
মনঃষষ্ঠানীংদ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি ॥ 7 ॥
শরীরং যদবাপ্নোতি যচ্চাপ্যুত্ক্রামতীশ্বরঃ ।
গৃহীত্বৈতানি সংয়াতি বায়ুর্গংধানিবাশয়াত্ ॥ 8 ॥
শ্রোত্রং চক্ষুঃ স্পর্শনং চ রসনং ঘ্রাণমেব চ ।
অধিষ্ঠায় মনশ্চায়ং বিষয়ানুপসেবতে ॥ 9 ॥
উত্ক্রামংতং স্থিতং বাপি ভুংজানং বা গুণান্বিতম্ ।
বিমূঢা নানুপশ্যংতি পশ্যংতি জ্ঞানচক্ষুষঃ ॥ 10 ॥
যতংতো যোগিনশ্চৈনং পশ্যংত্য়াত্মন্যবস্থিতম্ ।
যতংতোঽপ্যকৃতাত্মানো নৈনং পশ্যংত্যচেতসঃ ॥ 11 ॥
যদাদিত্যগতং তেজো জগদ্ভাসযতেঽখিলম্ ।
যচ্চংদ্রমসি যচ্চাগ্নৌ তত্তেজো বিদ্ধি মামকম্ ॥ 12 ॥
গামাবিশ্য চ ভূতানি ধারয়াম্যহমোজসা ।
পুষ্ণামি চৌষধীঃ সর্বাঃ সোমো ভূত্বা রসাত্মকঃ ॥ 13 ॥
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ ।
প্রাণাপানসমায়ুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্ ॥ 14 ॥
সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ।
বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো বেদাংতকৃদ্বেদবিদেব চাহম্ ॥ 15 ॥
দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ ।
ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কূটস্থোঽক্ষর উচ্যতে ॥ 16 ॥
উত্তমঃ পুরুষস্ত্বন্যঃ পরমাত্মেত্যুধাহৃতঃ ।
যো লোকত্রযমাবিশ্য বিভর্ত্যব্যয় ঈশ্বরঃ ॥ 17 ॥
যস্মাত্ক্ষরমতীতোঽহমক্ষরাদপি চোত্তমঃ ।
অতোঽস্মি লোকে বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ ॥ 18 ॥
যো মামেবমসংমূঢো জানাতি পুরুষোত্তমম্ ।
স সর্ববিদ্ভজতি মাং সর্বভাবেন ভারত ॥ 19 ॥
ইতি গুহ্যতমং শাস্ত্রমিদমুক্তং ময়ানঘ ।
এতদ্বুদ্ধ্বা বুদ্ধিমান্স্যাত্কৃতকৃত্যশ্চ ভারত ॥ 20 ॥
।। ওং তত্সদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্য়ায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে পুরুষোত্তময়োগো নাম পংচদশ অধ্যায়ঃ ॥
মূল বিষয়বস্তু:
অশ্বত্থ বৃক্ষ (সংসার): ঊর্ধ্বমূল ও অধঃশাখাবিশিষ্ট এই শাশ্বত বৃক্ষকে সংসার-চক্রের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার পত্রস্বরূপ বেদ মন্ত্রগুলি; এই বৃক্ষকে ছেদন করতে পারলে মুক্তি লাভ হয়।
আত্মা ও পরমাত্মা: ভগবান নিজেকে সকল জীবের মধ্যে বিদ্যমান এবং তাদের সকল কর্ম ও চেতনার উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ঈশ্বরের মহিমা: সূর্য, চন্দ্র ও অগ্নিতে বিদ্যমান আলোক, পৃথিবীতে আমার শক্তি, এবং বৈশ্বানর রূপে অগ্নিরূপে সকল জীবের মধ্যে থেকে খাদ্য পরিপাক করার কথা বলা হয়েছে।
জ্ঞান ও ভক্তি: জ্ঞান ও ভক্তির মাধ্যমে পরমেশ্বরকে লাভ করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে বৈরাগ্য অপরিহার্য।
পুরুষোত্তম: ভগবান নিজেকে সকল জ্ঞান ও বেদান্তের জ্ঞাতা এবং জ্ঞানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
মূল শ্লোক (উদাহরণ):
প্রথম শ্লোক: “উর্ধ্বমূলম-অধঃশাখম্ অশ্বত্থম্ প্রাহুঃ অব্যয়ম্ |” (যাহার মূল উপরে ও শাখা নিচে, সেই অব্যয় অশ্বত্থ বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে)।
সপ্তম শ্লোক: “মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ सनातनঃ |” (আমার সনাতন অংশই এই জগতে জীব রূপে বিরাজমান)।
পঞ্চদশ শ্লোক: “বেদে চ সর্বেষু বেদন্তবিদেব চ |” (সকল বেদে, বেদান্তের জ্ঞাতা হিসাবে আমিই উপাসনার যোগ্য)।
এই অধ্যায়টি বৈরাগ্য, জ্ঞান, ভক্তি ও পরমাত্মার স্বরূপ উপলব্ধির মাধ্যমে মোক্ষ লাভের এক গভীর পথ নির্দেশ করে।
