এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,০৬ জানুয়ারী : আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা মাস৷ তারপরেই এরাজ্যের বিধানসভার ভোট । ৩৫ শতাংশ মুসলিম ভোট এককাট্টা করে,৬৫ শতাংশ হিন্দু ভোটের কিছু অংশ ভাঙিয়ে নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার সমীকরণ এবারে তেমন কাজ করবে বলে মনে হচ্ছে না ৷ কারন রাজ্য রাজনীতিতে হুমায়ূন কবির ও আসাদউদ্দিন ওয়াইসির আবির্ভাব ঘটে গেছে । পাশাপাশি রয়েছেন রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের “ভাইজান” নওসাদ সিদ্দিকি । মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া রয়েছে । তাই অগত্যা হিন্দু ভোট টানার লক্ষ্যকে সামনে রেগে এগিয়ে চলেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি । দিঘার “জগন্নাথ মন্দির”, শিলিগুড়িতে ‘মহাকাল মন্দির’, কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরের আধুনিকীকরণ— এসবই আসলে বিজেপির ‘রাম’ ইমেজের বিপরীতে বাংলার নিজস্ব ‘শিব’ বা ‘বিষ্ণু’ সংস্কৃতিকে হাতিয়ার করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি । পাশাপাশি “ধর্মনিরপেক্ষ ইমেজ” থেকে একটু সরে এসে “সফট হিন্দুত্ব”-এর কার্ড খেলছেন৷ তাই এখন প্রতিটি জনসভায় বিজেপিকে হিন্দুত্বের পাঠ পড়াতে বিভিন্ন মন্ত্র উচ্চারণ ও হিন্দু শাস্ত্রের কথা শোনা যাচ্ছে মমতার মুখে ।
কিন্তু বারবার মমতার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে ভুল মন্ত্র । যাতে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নিশানায় পড়তে হচ্ছে তাকে । গতকাল গঙ্গাসাগরে মুড়িগঙ্গার উপর ‘গঙ্গাসাগর সেতু’র শিলান্যাস করতে গিয়ে জনসভায় ভাষণে বিজেপিকে “ধর্মের পাঠ” পড়াতে গিয়ে রামকৃষ্ণ ও শ্রীকৃষ্ণ গুলিয়ে ফেললেন মমতা । সেই সাথে ফের তিনি ভুল মন্ত্র উচ্চারণ করলেন । যেকারণে মমতাকে পালটা “ধর্মের পাঠ” পড়িয়ে দিলেন শুভেন্দু ।
মমতা বলেন,”শ্রীকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন, কি বলেছিলেন ? ধর্ম মানে ধারন৷ ধর্ম মানে মানবতা৷ ধর্ম মানে পবিত্রতা৷ ধর্ম মানে বিদ্বেষ নয়৷ ধর্ম মানে শান্তি৷ এটা বলেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ পরমহংসদেব৷ যিনি গীতায় বাণী লিখেছিলেন৷ উপদেশ দিয়েছিলেন ।” তার বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ এক্স-এ শেয়ার করে শুভেন্দু লিখেছেন,’ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এর মধ্যে গুলিয়ে ফেললেন, লক্ষীর পাঁচালী বলতে গিয়ে ভুলভাল সরস্বতী মন্ত্র আওড়ালেন !!!হিন্দু ধর্ম কে যিনি ‘গন্দা ধর্ম’ বলেন, মহাকুম্ভ কে মৃত্যুকুম্ভ বলেন, তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে, ভাগবদ্গীতা সম্পর্কে কতটুকু জানেন সে নিয়ে বাস্তবিকই সন্দেহ রয়েছে। মাননীয়া আপনি হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে যখনই মুখ খোলেন, তখনই আপনি কাল্পনিক, আজগুবি, অসত্য সব কথাবার্তা বলেন।
মাননীয়া আপনার জ্ঞাতার্থে বলি ‘পরমহংস’ একটি সংস্কৃত উপাধি, পরমহংস হিন্দু ধর্মের সেই গুরুদেব কে বলা হয় যিনি একজন আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ, যিনি পরম জ্ঞান অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকারী বা মোক্ষ লাভ করেছেন, শুদ্ধমনা, সংযত আত্মা, নির্বিকার, সমদর্শী এবং জাগতিক মায়া ও আসক্তি থেকে যিনি সম্পূর্ণ মুক্ত। ‘পরমহংস’ শব্দের অর্থ ‘সর্বোচ্চ রাজহাঁস’। রাজহাঁস যেমন জল ও স্থল উভয় স্থানে বিচরণ করতে পারে, তেমনি পরমহংস প্রাপ্ত গুরুদেবের জাগতিক ও আত্মিক উভয় বাস্তবতায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ। যে কারণে শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবকে পরমহংস বলা হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান, সৃষ্টির স্বামী, তিনিই সম্পূর্ণ জগতের সৃষ্টিকর্তা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণর উপাসক পরমহংস হতে পারেন, কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কে পরমহংস বলা যায় না, বললে ভগবানকে অসম্মান করা হয়।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনকে যে জ্ঞান প্রদান করেছিলেন তাই ভাগবদ্গীতা, যা পরবর্তীকালে মহর্ষি বেদব্যাস লিখেছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতার কথক, লেখক নন, তাই মাননীয়া আপনি মিথ্যাচার করছেন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম সম্পর্কে বলেছেন আত্মার ধর্ম হল ‘স্বধর্ম’। সঠিক কর্ম, কর্তব্যনিষ্ঠা, এবং ঈশ্বরের প্রতি পূর্ণ ভক্তি, জ্ঞান ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আত্ম-উপলব্ধি ও পরম শান্তি লাভ করাই ধর্ম। অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং নিজের মুক্তি ও জগতের কল্যাণের জন্য প্রচেষ্টা করাই ধর্ম। মাননীয়া আপনি নিজের মতো করে ধর্মের যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন সেটা ভাগবদ্গীতায় লেখা নেই আপনি আপনার কাল্পনিক ভাষনকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নামে, গীতার বাণী বলে চালিয়ে দেবার দুঃসাহস করছেন।’
সেই সাথে “লক্ষ্মীর পাঁচালি”-এর নামে রাজ্যে কথিত উন্নয়নের যে প্রচার তৃণমূল শুরু করেছে,তার পালটা ‘অনুন্নয়নের প্রকৃত পাঁচালী’ নামক প্রচার শুরু করেছে বিজেপি । শুভেন্দুর নির্বাচনী ক্ষেত্র নন্দীগ্রাম থেকে বিজেপির এই প্রচার শুরু হয়েছে । যানিয়ে মমতাকে ক্ষিপ্ত দেখা যায় এদিন । মমতা বলেন,’যারা গীতা নিয়ে, গীতাকে অপমান করে, তাদের বলি, ওরে উন্নয়নের পাঁচালিকে নিয়ে তুই ওটা চাচালি করছিস ? যায় আসে না৷’এরপর তিনি বলেন, কোনো দিন পড়েছ,পাঁচালি ? এস মা লক্ষ্মী, বসো মা লক্ষ্মী,থাকো মা লক্ষ্মী আমার ঘরে । কোনো দিন পড়েছ,পাঁচালি ? জয় জয় দেবী চরাচর সারে৷ কুচ শুভিত মুস্ত হারে৷ বীনা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে । ভবগতী ভারতী দেবী নমস্তে৷’
এর জবাবে শুভেন্দু লিখেছেন,’পশ্চিমবঙ্গের কেউ ‘এসো মা লক্ষ্মী, বসো মা লক্ষ্মী’ এরকম পাঁচালী পড়েছেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এমনকি ভুলভাল সরস্বতী প্রণাম মন্ত্রকেও পাঁচালী বলে আপনি চালানোর আজ চেষ্টা করলেন।আসলে হিন্দুদের আপনি সবসময় অপমান করছেন শুধুমাত্র ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির জন্য। প্রত্যেক হিন্দু এবার আপনাকে সব অপমানের জবাব দেবে।’
প্রসঙ্গত,পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, ওবিসি-তে প্রকৃত উপভোক্তাদের বঞ্চিত করে মুসলিমদের ঢোকানোর চেষ্টা, আইনশৃংখলার অবনতি,নারী সুরক্ষা প্রভৃতি একাধিক ইস্যুতে ব্যাকফুটে তৃণমূল । চাকরি হারা যোগ্য শিক্ষক- শিক্ষিকারা প্রতিদিন রাস্তায় নেমে ন্যায় বিচারের দাবি করলেও তেমন মিডিয়া ফুটেজ পাচ্ছে না । শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড পার্থ চ্যাটার্জি, রেশন দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকরা জামিনে মুক্ত হয়ে আজ বহাল তবিয়তে রয়েছেন । কিন্তু তারা আজ আলোচনার বাইরে । এখন চর্চার বিষয় শুধু হুমায়ূনের “বাবরি মসজিদ” ও মমতার “মহাকাল মন্দির” । স্পষ্টতই ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটা প্রচেষ্টা চলছে বঙ্গে । এখন দেখার বিষয় যে মমতার “সফট হিন্দুত্ব” কতটা কাজে আসে তার দলের জন্য । তবে চলতি নির্বাচনী প্রচারে তৃণমূল ও বিজেপির জনসভায় ভিড়ের নিরিখে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে । যেখানে মমতার সভায় তেমন উন্মাদনা নজর না পড়লেও শুভেন্দুর সভাতে উলটো চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছে গেরুয়া শিবির ।।

