এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,২৬ জানুয়ারী : শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির “কিংপিন” পার্থ চ্যাটার্জি জামিনে মুক্ত । রেশন দুর্নীতির “মাস্টারমাইন্ড” জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকও জামিন পেয়ে গেছেন অনেক দিন আগেই । তারপরেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপর বঙ্গের অনেক মানুষই আস্থা হারাননি । কিন্তু আজ নরেন্দ্র মোদী যা করেছেন তাতে তার উপর বাংলার মানুষের আশাভরসা সব উবে গেছে । যে আরজি করের ‘অভয়া’র ধর্ষণ-খুন নিয়ে দেশ-বিদেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল, পরবর্তী কালে সিবিআইয়ের তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো প্রশ্ন ওঠে, সেই সিবিআইয়ের পিঠ চাপড়ে দিয়ে নরেন্দ্র মোদী শুধু এরাজ্যের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গই করেননি, বরঞ্চ তৃণমূলের সঙ্গে যে বিজেপির “গোপন আঁতাত” আছে সেটা তিনি প্রমান করে দিলেন বলে মনে করা হচ্ছে ।
আজ সোমবার সাধারণতন্ত্র দিবসের দিন নরেন্দ্র মোদী সরকার আরজি করের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুন ও হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতি মামলায় তদন্ত প্রক্রিয়াকে “সফল” বলে সিলমোহর দিয়ে দিয়েছেন ৷ এজন্য পুরষ্কৃতও করা হয়েছে সিবিআই -কে । যার নেতৃত্বে এই তদন্ত প্রক্রিয়া চলেছিল সেই মণীশকুমার উপাধ্যায়কে “বিশেষ পুলিশ পদকে” সম্মানিত করেছে মোদী সরকার । দিল্লির কর্তব্যপথে সাধারণতন্ত্র দিবসের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে মণীশের হাতে এই পদক তুলে দেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। যা নিয়ে “ধিক্কার” জানিয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট । তারা এই পদককে “সমাজ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার সম্মিলিত ব্যর্থতার এক নগ্ন দলিল” বলে আখ্যা দিয়েছেন । মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারছেন না এরাজ্যের সাধারণ মানুষও । তারা প্রশ্ন তুলছেন, এত দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, নারী সুরক্ষার অভাবের পরেও মোদী সরকার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি কেন এত সংবেদনশীল ?
প্রসঙ্গত,আর জি কর-এর ‘অভয়া’র ধর্ষণ বা গনধর্ষণ ও খুন মামলায় সিবিআইয়ের তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ এরাজ্যের সাধারণ মানুষ । অনেকেই মনে করেন যে এই নৃশংস বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আরও অনেকেই যুক্ত ছিল । বিশেষ করে এই ঘটনায় যাকে সবচেয়ে বেশি সন্দেহের চোখে দেখা হয় সেই আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ আজ জামিনে মুক্ত । ‘অভয়া’র ধর্ষণ বা গনধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় সন্দীপ ঘোষের সম্পৃক্ততা নিয়ে সিবিআইয়ের যত না আগ্রহ ছিল, তার থেকে বেশি আগ্রহ ছিল দুর্নীতির বিষয়ে । তখন থেকেই সিবিআইয়ের তদন্ত প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে । তার উপর তৎকালীন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের নেতৃত্বে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে একরাশ প্রশ্ন ওঠে । সন্দীপ ঘোষ ও টালা থানার ওসি অভিজিৎ মণ্ডলের বিরুদ্ধে প্রমান লোপাটের মত গুরুতর অভিযোগও ওঠে । যে কথা এক সময় সিবিআই নিজেও কবুল করেছিল। কিন্তু সন্দীপ ঘোষ ও অভিজিৎ মণ্ডলকে ৯০ দিন হেফাজতে রাখার পরেও তাদের বিরুদ্ধে কোনও চার্জশিট দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা জামিন পেয়ে যায় । এক্ষেত্রে সিবিআইয়ের তদন্ত প্রক্রিয়া ও উদেশ্য নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন ওঠে ।
তবে,আর জি কর-এর ‘অভয়া’র ধর্ষণ বা গনধর্ষণ ও খুন মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের অযাচিত হস্তক্ষেপের পর থেকেই সুপ্রিম কোর্ট ও মোদী সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে । আসলে,২০২৪ সালের ৯ অগস্ট আরজি করে চিকিৎসক-ছাত্রীর হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে রক্তাক্ত দেহ উদ্ধারের পর প্রথমে তদন্ত শুরু করে কলকাতা পুলিশ । ওই ঘটনার পরের দিনই কলকাতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় টালা থানার সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়। কিন্তু সেই সময় পুলিশের বিরুদ্ধেই ওঠে প্রমান লোপাটের অভিযোগ । যেকারণে সিবিআই তদন্ত চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অভয়ার বাবা-মা । হাইকোর্ট সিবিআই তদন্তের আদেশ দেয়। হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্ত প্রক্রিয়া ঠিকঠাকই চলছিল । কিন্তু পরে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে এই মামলা হাতে তুলে নেন সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় । আর তারপর থেকেই এত গুরুত্বপূর্ণ একটা মামলায় ডেটের পর ডেট দিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করা হয় । সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হল যে, চন্দ্রচূড়ের অবসরের সেই সুপ্রিম কোর্টই আরজি কর মামলা ফের কলকাতা হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেয় । অভিযোগ যে মামলাটিকে ভুল পথে পরিচালিত করতেই সর্বোচ্চ আদালতকে কাজে লাগিয়ে একটা বৃহত্তর ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল ।
আজও এরাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন যে আসন্ন বিধানসভার ভোটে বিজেপি জিতলে ‘অভয়া’র পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন৷ সন্দীপ ঘোষ,বিনীত গোয়েলদের জেলে পাঠাবেন৷ কিন্তু কেন্দ্রে তাদের সরকার আজ আর জি কর-এর ‘অভয়া’র ধর্ষণ বা গনধর্ষণ ও খুন মামলায় যেভাবে সিবিআইয়ের তদন্ত প্রক্রিয়াকে “সফল” আখ্যা দিল, নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে তা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হলে কি উত্তর দেবেন সেটাই দেখার বিষয় । তবে আজকে মোদী সরকারের এই পদক্ষেপের ফল যে আসন্ন বিধানসভার ভোটে ভুগতে হবে এটা কার্যত নিশ্চিত ৷ কারন আরজি কর কান্ডের মত একটা সংবেদনশীল মামলায় সিবিআইয়ের তদন্তের প্রশংসা করে মোদী সরকার কার্যত তৃণমূলের সঙ্গে “সেটিং তত্ত্ব” তেই সিলমোহর দিল বলে মনে করা হচ্ছে । যার ফল সুদুরপ্রসারি হতে পারে ।।

