প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,২৮ জানুয়ারী : পরাধীন ভারতে জন্ম। হাওড়া ব্রিজ তৈরি থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবই দেখেছেন। স্বাধীন ভারতে শুরু হওয়া প্রথম নির্বাচন থেকে ভোট দিয়ে আসছেন । ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন । তবুও মেলনি ছাড়। এসআইআর (SIR) শুনানিতে হাজির হওয়ার ডাক পেলেন ১০৪ বছর বয়সী পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর বিধানসভার বত্রিশবিঘা গ্রামের প্রবীণ শেখ ইব্রাহিম।এই ঘটনায় বত্রিশবিঘা গ্রামের বাসিন্দা মহলে তীব্র আলোড়ন ছড়িয়েছে। বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশনকে অমানবিক আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে বত্রশবিঘা গ্রামের বাসিন্দারা ।
জামালপুর-১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার প্রত্যন্ত গ্রাম বত্রিশবিঘা। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই গ্রামের ১৩৮ নম্বর বুথের ভোটার এবং আদি বাসিন্দা হলেন শেখ ইব্রাহিম।তিনি দাবি করেন,’বাংলার ১৩২৯ সালের মাঘ মাসে তাঁর জন্ম।পুরানো ১৯৯৫ সালের ভোটার কার্ডে তাঁর বয়স ৭৫ বছর উল্লেখ করা রয়েছে।’ শেখ ইব্রাহিমের স্ত্রী আসেমা বেগম ১৮ বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন। ইব্রাহিমের ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েরা বিবাহিত। ছেলেরা বত্রিশবিঘা গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করেন । তাঁরা পরম স্নেহে তাঁদের বৃদ্ধ বাবাকে আগলে রেখেছেন। বত্রিশবিঘা গ্রামের বাসিন্দারাও তাঁদের গ্রামের সব থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ শেখ ইব্রাহিমকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার আসনে স্থান দিয়ে রেখেছেন ।
এহেন প্রবীণ শেখ ইব্রাহিমকে আগামী ২৯ জানুয়ারী জামালপুর বিডিও অফিসে সশরীরে ’শুনানিতে’ হাজির থাকার জন্য নির্বাচন কমিশনের তরফে নোটিশ পাঠানো হয়। ওই নোটিশ তাঁর বাড়িতে পৌছে দেন ১৩৮ নম্বর বুথের বিএলও(BLO) শেখ সাবীর আহমেদ। নোটিশ পাঠানোর কারণ প্রসঙ্গে তিনি জানান ,’সম্ভবত তথ্যগত অসঙ্গতি (Logical Discrepancy) থাকাতেই শেখ ইব্রাহিমের নামে শুনানির নোটিশ ’ইস্যু’ হয়েছে ।যদিও জামালপুরে কর্মরত কমিশন নিযুক্ত এক প্রতিনিধি জানান,ভোটার তথ্যে ওই প্রবীণ ব্যক্তির নাম ! শেখ ইব্রাহিম থাকলেও আধার কার্ডে ওনার নাম ’ইব্রাহিম শেখ’ বলে উল্লেখ করা রয়েছে।
যদিও শুনানিতে ডাকা নিয়ে কমিশনের এই যুক্তি শেখ ইব্রাহিমের ছেলেরা যেমন মানতে পারেননি । তেমনই মানেন নি বত্রিশবিঘা গ্রামের বাসিন্দারা । তাঁরা বলেন,কমিশনেরই তো নির্দেশ রয়েছে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ভোটারদের সশরীরে এসআইআর (SIR) শুনানিতে হাজির হওয়ার কথা বলে নোটিশ পাঠানো যাবে না। তার পরেও কোন যুক্তিতে ১০৪ বছর বয়সী বৃদ্ধ শেখ ইব্রাহিমকে সশরীরে জামালপুর বিডিও অফিসে শুনানিতে হাজির হতে বলে নোটিশ ধরানো হলো? এই প্রশ্ন তুলে কমিশনের বিরুদ্ধে চুড়ান্ত ক্ষোভ উগরে দেন শেখ ইব্রাহিমের ছেলেরা ও পরিজনরা।
বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত শরীর নিয়ে ঘরে বসে থাকা শেখ ইব্রাহিম বলেন,ভারত পরাধীন থাকা কালে আমি জন্মগ্রহন করি।আমি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দেখেছি ,ভারত স্বাধীন হতেও দেখেছি। এমনকি হাওড়া ব্রিজ তৈরি থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও দেখেছি। গন্ধীজীর ডাকা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মিছিলে আমিয়ো ছুটে গিয়েছি। এখন আমার বয়স ১০৪ বছর। বয়সের ভারে আমি এখন ভালো ভাবে হাঁটা চলা করতে পারি না। তবুও কেন আমায় সশরীরে বিডিও অফিসে এসআইআর (SIR)শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিশ দেওয়া হল তা বুঝে উঠতে পারছি না! কমিশনের এমন আচরণে আমি খুবই মর্মাহত। দু-চোখে ভরা জল নিয়ে শেখ ইব্রাহিম এর পর বলেন,“কমিশনের লোকজন কি আমার বাড়িতে এসে তাদের যা জানার ও তথ্য যা নেওয়ার, তা নিয়ে যেতে পারে না? বৃদ্ধর দুই ছেলে শেখ বাগবুল ইসলাম এবং শেখ রায়হান উদ্দিনও কমিশনের উদ্দেশ্যে একই আর্জি রাখেন ।
এদিকে কমিশনের নির্দেশের তোয়াক্কা না করে ১০৪ বছর বয়সী এক প্রবীণ নাগরিককে নোটিশ পাঠিয়ে সশরীরে বিডিও অফিসে হাজির হতে বলা নিয়ে সংবাদ মাধ্যম খবর সংগ্রহে নেমেছে জানতে পেরেই নড়েচড়ে বসেন কমিশনের জামালপুরের প্রতিনিধিরা ।তারা ২৯ জানুয়ারীর আগেই মঙ্গলবার ২৭ জানুয়ারি বেলায় তড়িঘড়ি পৌছে যান শেখ ইব্রাহিমের বাড়িতে।সেখান থেকেই তারা শেখ ইব্রাহিমের ভারতীয় নাগরিকত্ব সংক্রান্ত যাবতীয় নথি সংগ্রহ করে নেন। কোন দুঃশ্চিন্তা না করার কথাও তারা শেখ ইব্রাহিমকে জানিয়ে যান।
এই ঘটনা নিয়ে কমিশনের প্রতিনিধি হিসাবে জামালপুর ব্লকের বিডিও পার্থ সারথী দের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে বিএলও(BLO)কে দায়ী করেন । পরে আবার তিনি বলেন,কোনও ভোটারের বয়স জানার কোন উপায় নাকি তাদের কাছে নেই। তাই ১০৪ বছর বয়সী প্রবীণ নাগরিকে সশরীরে বিডিও অফিসে এসআইআর-এর শুনানিতে হাজির হতে বলার নোটিশ পাঠানো হয়ে গিয়েছিল।।

