প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,০৪ এপ্রিল : প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাশুল গুনতে হল বঙ্গের হাজার হাজার শিক্ষককে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ড নিয়ে সুপ্রিম রায়ে শিক্ষকতার চাকরি বাতিল হল ২৫ হাজার ৭৫২ জন শিক্ষকের। এক সঙ্গে এত শিক্ষকের চাকরি বাতিল হতেই বঙ্গের স্কুল গুলিতে দেখা দিয়েছে শিক্ষকের হাহাকার। শিক্ষকের আকালে স্কুল কি করে চলবে,পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ কি হবে ,তা ভেবেই এখন দিশেহারা অভিভাবকরা।
যোগ্য ও অযোগ্য শিক্ষক বাছাই কোন ভাবে সম্ভব না হওয়ায় ২০১৬ সালের এসএসসি-র পুরো প্যানেলটাই বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই সুপ্রিম রায়ের ধাক্কায় রাজ্যের অনান্য জেলার স্কুলগুলির মতো পূর্ব বর্ধমান জেলার বহু স্কুলে দেখা দিয়েছে শিক্ষকের হাহাকার। পঠনপাঠন শিকেয় ওঠার অবস্থা তৈরি হয়ে গিয়েছে জেলার কৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সৌমেন কোনার জানিয়েছেন,তাঁর স্কুলের দুজন শিক্ষক ও দুজন শিক্ষিকা মিলিয়ে চারজনের চাকরি বাতিল হয়েছে। তার স্কুলে এই মুহূর্তে মোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১০৪৭ জন। এতজন ছাত্র ছাত্রীর পাঠ দেওয়ার দায়িত্ব এতদিন সামলাতেন স্কুলে ২৪ জন শিক্ষক। চারজন শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়ে যাওয়ার এখন সেই দায়িত্ব ২০ জন শিক্ষকে সামলাতে হবে। যে চারজন শিক্ষকের চাকরি চলে গিয়েছে তারা বাংলা,ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও এডুকেশনের শিক্ষক ছিলেন । শিক্ষকের ঘাটতিতে স্কুল কি ভাবে চালানো সম্ভব হবে তা বুঝে উঠতে পারছেন না বলে প্রধান শিক্ষক সৌমেন কোনার জানিয়েছেন।
সুপ্রিম রায়ে কোপে পড়েছে বর্ধমানের নিবেদিতা কন্যা বিদ্যালয় । এই স্কুলের মাধ্যমিক স্তরের একজন এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের দু’জন শিক্ষিকার চাকরি বাতিল হয়েছে। আরও একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরও চাকরি গিয়েছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা স্বাগতা মণ্ডল কোনার জানান,তিন শিক্ষিকার চাকরি বাতিল হওয়ায় স্কুলে এডুকেশন ও সংস্কৃত বিষয়ে পড়ানো নিয়ে সমস্যা হবে।এমনিতেই স্কুলে ছাত্রীর সাথে শিক্ষকের অনুপাত কম ছিল । এখন আরও কমে গেল চতুর্থ শ্রেণির কর্মীর অভাবে স্কুলের কাজ সামলানোও কঠিন হবে বলে প্রধান শিক্ষিকা স্বাগতা মণ্ডল কোনার জানিয়েছেন। এই দুটি স্কুল ছাড়াও বর্ধমান দক্ষিণ মহকুমার জামালপুরের সেলিমাবাদ হাই স্কুল,কালনা কাঁশড়া হাই স্কুল এবং বাণী নিকেতন রঙ্কিনী মহুলা স্কুলের অনেক শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়েছে। সেমিমাবাদ হাই স্কুলের টিচার ইনচার্জ বাসুদেব সাঁতরা জানান,তাঁদের স্কুলের দু’জন শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়ে গিয়েছে । তাদের একজন ছিলেন ভূগোলের শিক্ষক, আপরজন ছিলেন পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক। বাসুদেববাবু দাবি করেন,তাঁদের স্কুলের যে দু’জন শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়েছে তাঁরা কেউ অযোগ্য শিক্ষক হতে পারেন না। ওই দু’জন শিক্ষকই স্কুলে অত্যন্ত ভালো পড়াতেন। সেই কারণে ওই দুই শিক্ষকই পড়ুয়াদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন । এমনিতেই পড়ুয়ারও শিক্ষকের অনুপাতে স্কুলে শিক্ষকের সংখ্যা কম ছিল ।তার উপর দু’জন ভাল শিক্ষকের চাকরি চলে যাওয়ায় সমস্যা আরও তীব্র হল ।
কালনা কাঁশরা হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক দেবশেখর কোলে জানান , সুপ্রিম রায়ে তাঁদের স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষিকা মিলিয়ে চারজনের চাকরি বাতিল হয়ে গিয়েছে। এছাড়াও স্কুলের একজন ক্লার্কের চাকারি চলে গিয়েছে। ওই শিক্ষকদের মধ্যে দুজন বিজ্ঞান বিষয় পড়াতেন। বাকি দু’জনের একজন ইতিহাস আর একজন ফিলোজফি পড়াতেন। দেবশেখব বাবু বলেন,’আমার স্কুলে সাড়ে সাতশোর বেশী পড়ুয়া রয়েছে । এমনিতেই স্কুলে শিক্ষকের ঘাটতি ছিল । তার উপর একসঙ্গে চারজন শিক্ষক ও একজন অশিক্ষক কর্মচারীর চাকরি বাতিল হয়ে যাওয়ায় এখন স্কুল চালানোই দায় হয়ে পড়লো ।’ চাকরি বাতিল হয়ে যাওয়া একজন শিক্ষক এদিন নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে পৌঁছে ছিলেন । সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার পর চোখের জল ফেলতে ফেলতেই এদিন তিনি স্কুল ছাড়েন । এই ঘটনা কালনা কাঁশরা হাই স্কুলের অন্য শিক্ষকদেরও যথেষ্ট বেদনাতুর করে তোলে।
বাণী নিকেতন রঙ্কিনী মহুলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুব্রত দাস জানান,সুপ্রিম রায়ে তাঁদের স্কুলের দু‘জন শিক্ষিকা ও একজন শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়ে গিয়েছে । দু’জন শিক্ষিকা এদিন স্কুলে উপস্থিত হয়ে ছিলেন । তবে সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার পরেই তারা স্কুল থেকে চলে যান। আর যে শিক্ষকের চাকরি চলে গিয়েছে তিনি কোন এক অদৃশ্য কারণে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন । দুই শিক্ষিকার একজন ইংরাজি আর একজন বাংলা পড়াতেন। সুব্রত বাবু বলেন, এতদিন ১৩ জন শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়ে স্কুল চলছিল । এখন তা কমে গিয়ে ১১ তে নেমে গেল। কি ভাবে স্কুল চালাবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না বলে সুব্রত দাস আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন ।
একই ভাবে এদিনের সুপ্রিম রায়ে কালনা মহকুমার ৪ টি স্কুলের বহু শিক্ষক,শিক্ষিকা ও আশিক্ষক
কর্মীর চাকরি বাতিল হয়ে গিয়েছে। কালনা শ্রী শ্রী নিগমানন্দ বিদ্যামন্দিরে তিন শিক্ষক ও অশিক্ষক এবং দু’জন অশিক্ষক কর্মী মিলিয়ে মোট ৫ জনের চাকরি বাতিল হয়েছে। এছাড়াও শশীবালা সাহা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে দু’জন শিক্ষিকা এবং একজন অশিক্ষক কর্মীরও চাকরি চলে গিয়েছেন। বাদ যায়নি কালনা মহারাজ উচ্চ বিদ্যালয়। ১,৮০০ পড়ুয়া নিয়ে চলা এই স্কুলের ৬ জন শিক্ষক এদিনের সুপ্রিম রায়ে চাকরি খুইয়েছন। কালনা হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী মিলিয়ে ৬ জনে চাকরি বাতিল হয়েছে।একসঙ্গে এতজনের চাকরি বাতিল হয়ে যাওয়ার স্কুল কিভাবে চলবে তা ভেবে এখন দিশেহারা হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ । চাকরি বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ে স্কুলগুলির দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কিছু বলতে চাননি। তবে সুপ্রিম রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে স্কুলগুলিতে যে শিক্ষকের হাহাকারে ভুগবে তা তাঁরা স্বীকার করে নিয়েছেন।।