এইদিন স্পোর্টস নিউজ,০৪ জানুয়ারী : মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া টানাপোড়েনের জের ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে আসবে না । বিসিবি পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন আজ রবিবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে বলেন, বিস্তারিত জানিয়ে দ্রুতই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। তবে সেটি দেওয়া হয় বিকেল সাড়ে ৫টায়।সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে,’বর্তমান পরিস্থিতি ও ভারতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমেই বাড়তে থাকা দুর্ভাবনা বিশদ পর্যালোচনার পর এবং বাংলাদেশ সরকারের পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড পরিচালকরা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয় দল এই টুর্নামেন্ট খেলতে ভারতে যাবে না। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশের ম্যাচগুলি ভারতের বাইরে আয়োজনের ব্যাপারটি বিবেচনা করতে।’বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর ঘণ্টা দুয়েক আগেই ক্রীড়া উপদেষ্টা সামাজিকমাধ্যমে জানিয়ে দেন বিসিবির সিদ্ধান্তের কথা।
বিসিবির এই সিদ্ধান্ত ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছেই বিস্ময় হয়ে এসেছে। কারণ,রবিবার দুপুরের আগে পর্যন্ত বোর্ডের ভাবনা ছিল অন্যরকম।মুস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর শনিবার সন্ধ্যায় সিলেটে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিসিবি সভাপতি বেশ সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন । ভারতীয় বোর্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি দাবি করে প্রসঙ্গটির গভীরে তিনি যেতে চাননি। বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাওয়া ঠিক হবে কি না, এই প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, বোর্ড পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন।
পরে রাতে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করেন কয়েকজন পরিচালক। সেই আলোচনা খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। আলোচনায় অংশ নেওয়া অন্তত দুজন পরিচালক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, অতি উত্তেজিত না হয়ে ‘ধীরে চলো’ নীতি নিতেই একমত হন তারা।বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছিল, আইসিসির কাছে চিঠি দিয়ে নিজেদের দুর্ভাবনার কথা জানানো হবে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে জানতে চাওয়া হবে। ভেন্যু সরানো সংক্রান্ত কোনো কিছু চিঠিতে উল্লেখ থাকবে না বলেও ঠিক করা হয়েছিল।
বিসিবির এক পরিচালক সোমবার সকালে বলেন, তারা বাস্তবতা মাথায় রেখেই এগোবেন।“ভেন্যু বদলানোর কথা তো আমরা বলতে পারি না, এটা আইসিসির ব্যাপার। আমরা আমাদের নিরাপত্তার ব্যাপার নিয়ে জানতে চাইতে পারি। বিশ্বকাপের মতো আসরে আইসিসির সঙ্গে আয়োজক বোর্ডের চুক্তিতে নিরাপত্তার ব্যাপারটি এমনিতেও থাকে। তার পরও নিজেদের কথা আমরা জানাব।”
তবে ভেন্যু সরানোর ব্যাপার তো সহজ নয়। ভ্রমণ, লজিস্টিকস, ব্রডকাস্ট, টিকেট বিক্রি, অনেক ইস্যু জড়িয়ে আছে এসবে। বিশ্বকাপের এক মাস আগে হুট করে ভেন্যু বদলাতে বলাটা খুব বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের ছেলেদের নিরাপত্তা অবশ্যই আমাদের অগ্রাধিকার। সেটা নিশ্চিত করতে বলব আমরা।”
বিসিবির আর এক পরিচালক তুলে ধরেছিলেন তাদের আরও কিছু ভাবনার কথা। গত বছর ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরে আসার কথা থাকলেও সেটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বছরের অগাস্টে তাদের আসার কথা। আগামী বছর বাংলাদেশে হওয়ার কথা এশিয়া কাপ। পরে আছে নারী অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ, ২০৩১ সালে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজন করার কথা ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ভারতীয় বোর্ডের সঙ্গে টানাপোড়েনের জায়গায় তাই যেতে চায়নি বোর্ড।
কিন্তু দুপুরে সেই অবস্থানই বদলে গেল। কৌতূহল জাগে সেই কারণেই, নরম অবস্থান থেকে হঠাৎ বিসিবির কঠোর পথ বেছে নেওয়ার পেছনের ঘটনা কী।
বিসিবির তিনজন পরিচালক নিশ্চিত করেন, মূলত সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর ভাবনার কারণেই বিসিবি সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে, সরকারের একজন উপদেষ্টা এখানে অনড় অবস্থানে ছিলেন।ওই বিসিবি পরিচালকরা জানান, এমন কঠোর সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে বেশির ভাগ পরিচালকদের মধ্যে নানা শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে। বিশেষ করে, সূচি চূড়ান্ত হওয়ার পর বিশ্বকাপের মাত্র এক মাস আগে ভেন্যু পরিবর্তন করা যে আইসিসির জন্য অসম্ভবের কাছাকাছি, সেটা অনুধাবন করতে পারছেন সবাই। শেষ পর্যন্ত ভেন্যু পরিবর্তন না করা হলেও বাংলাদেশ নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো দলকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে, এমন শঙ্কাও দেখছেন পরিচালকরা।
কিন্তু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের জোর নির্দেশনার পর বিসিবি সভাপতি ও পরিচালকরা অন্য কোনো পথ আর খুঁজে পাননি।
ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল রবিবার রাতেই সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কড়া সিদ্ধান্তের আভাস দিয়ে রাখেন।“উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দিয়েছে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
আইসিসির চেয়ারম্যান এখন জয় শাহ, যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে এবং ভারতীয় বোর্ডের প্রাক্তন সচিব। ভারতীয় ক্রিকেটে তার প্রভাব এখনও প্রবল। আইসিসির বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ভারতের প্রভাব কত বেশি, সেটা তো গোটা ক্রিকেট বিশ্বেরই জানা। কাজেই বাংলাদেশের ভাবনা জয় শাহ কতটা অনুধাবন করবেন বা করতে পারবেন, সেটি নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ও শঙ্কা বিসিবি পরিচালকদের অনেকেরই আছে।আপাতত অপেক্ষা আইসিসির কাছ থেকে জবাব পাওয়ার। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সামনের সময়টা যে বেশ উত্তাল থাকবে, তা ধরেই নেওয়া যায়।।

