এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,০২ ফেব্রুয়ারী : এসআইআর ইস্যুতে উত্তপ্ত রাজনীতি । একদিকে মানুষকে হয়রানির অভিযোগ তুলে মমতা ব্যানার্জি, অভিষেক ব্যানার্জিরা যখন কালো চাদড় গায়ে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে নালিশ জানাতে গেছেন । সঙ্গে নিয়ে গেছে কথিত হয়রানির শিকার “হিন্দু-মুসলিম” প্রমাণ । তখন অন্যদিকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীরা রাজভবনে রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের কাছে রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে এলেন । সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন যে মমতা ব্যানার্জি দিল্লিতে নাটক করতে গেছেন । তার আসল উদ্দেশ্য হল এসআইআর ভন্ডুল করে ২০২৪ সালের ভোটার তালিকায় ভোট করা৷
রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু অধিকারী জানান যে তারা রাজ্যপালের কাছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন । তিনি বলেন,’আমরা রাজ্যপাল মহোদয়ের কাছে কেন এলাম ? কেন আমরা সিও-এর কাছে বা মুখ্য সচিবের কাছে গেলাম না এই প্রশ্ন উঠতে পারে ।’ তিনি বলেন,’গত ২৯ শে জানুয়ারি মুখ্য সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমরা আবেদন জানিয়েছিলাম । মুখ্য সচিব রাজ্যের একজন প্রশাসনিক কত্রী । তিনি ইলেকশন কমিশনের সঙ্গে আর্টিকেল ৩২৪ থেকে ৩২৯ অনুযায়ী তার যা যা রিকোয়ারমেন্ট তা দিতে বাধ্য হন৷ আমরা তার সাথে দেখা করে দাবিপত্র দিয়ে তার নিযুক্ত বিএলও, ই আর ও,এ ই আর ও এবং ডিও-রা কিভাবে রাজনীতি করছেন, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুখ্যমন্ত্রী পরিকল্পনাতে এবং আইপ্যাকের নির্দেশনায় । আমরা সেই বিষয়ে বলতে চেয়েছিলাম । কিন্তু উনি আমাদের রিটার্ন ইমেলে বলেছেন ৬ তারিখের আগে তিনি এলওপি-র সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না । আবার গতকালের রিমাইন্ডার দিলাম । কিন্তু সেই রিমাইন্ডারের উনি রেসপন্স করেননি । আজকে এখানে আসার আগে ওনাকে চিঠি পাঠিয়েছিলাম যে ধরে নিলাম আপনি আছেন এবং আমরা যাচ্ছি । তখন উনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে লিখলেন যে আজকে উনি দেখা করতে পারছেন না,তিনি অপারগ।’
শুভেন্দু অধিকারী বলেন,’আমরা রাজ্যপাল মহোদয় কে দেখা করতে চেয়েছিলাম । উনি আমাদের চারটার সময় টাইম দিয়েছিলেন। আমরা চারটে পনেরো নাগাদ ওনার সঙ্গে দেখা করেছি। আমরা এস আই আর সংক্রান্ত বিষয়ে সিও বা ইসিআই-তে না গিয়ে রাজ্যপাল বা মুখ্য সচিবের কাছে যেতে চেয়েছিলাম কেন ? কারন মুখ্য সচিবের কাছে যেতে চেয়েছিলাম এইজন্য তার নিযুক্ত প্রশাসনিক আধিকারিকরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের হয়রানি, এস আই আর কেন্দ্রগুলোকে মাছের বাজার,হিয়ারিংয়ের নামে বিশৃঙ্খলা, তৃণমূল কংগ্রেসের গুন্ডাদের এস আই আর হিয়ারিং সেন্টারে ঢুকিয়ে নৈরাজ্য তৈরি করতে উৎসাহিত করছেন বা অনুপ্রাণিত করছেন ।’
মুখ্যসচিবকে পরামর্শ দেওয়ার আবেদন রাজ্যপালের কাছে
শুভেন্দু অধিকারী বলেন,’ আমরা সাংবিধানিক প্রধানের কাছে চারটি দাবি রেখেছি । এবং আমরা বলেছি আপনি এর ইমপ্লিমেন্ট করতে পারেন না এক্সিকিউশনের পার্ট আপনার নেই । আপনি পরামর্শ দিতে পারেন সেই অধিকার সংবিধান আপনাকে দিয়েছে । আপনি দয়া করে মুখ্য সচিব কে পরামর্শ দিন যে এই এই জিনিসগুলো হচ্ছে।’
এসআইআর-কে প্রভাবিত করার অভিযোগ
এসআইআর সংক্রান্ত কোন ফাইল এলে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তারা অনুমতি নিতে হয় না। এটা এই রাজ্যের জন্য নয়, গোটা ভারতের জন্য । গোটা দেশে একই আইন । ইলেকশন কমিশনের সাংবিধানিকভাবে এই ক্ষমতা আছে যে তারা যা যা চাইবে প্রতিটা রাজ্য সরকার তা দিতে বাধ্য । আগের মুখ্য সচিব মনোজ পন্থ এবং বর্তমান মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী প্রত্যেকটা ফাইল মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠান । আমরা ডকুমেন্ট নিয়ে কথা বলছি । মুখ্যমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি গৌতম সান্যাল নোট করেন৷ এবং মুখ্যমন্ত্রীকে এপ্রুভড, কেপ্ট ইন এভিয়েন্স, রিজেক্ট, পেন্ডিং এসব কথাগুলো উনি লেখেন । যেগুলো সরাসরি সংবিধানকে ভায়োলেশন বলে আমরা মনে করি ।
ভুয়ো ভোটার রেখে দিতে চাইছেন মমতা ব্যানার্জি
মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতা হারানোর ভয়ে মৃত ভোটার, ভুয়া ভোটার, ডবল ট্রিপল এন্ট্রি ভোটার, বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী মুসলমান এবং রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় রাখতে চান। এই মুখ্যমন্ত্রীর পূর্ণ পরিকল্পনা হচ্ছে এস আই আর কে ভণ্ডুল করো । প্রয়োজনে রাস্তায় গোলমাল করো । জ্ঞানেশ কুমার কে ভ্যানিশ কুমার বলো।মনোজ আগরওয়ালকে ভয় দেখাও । আরএসআইআর আটকিয়ে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের পুরনো ভোটার লিস্টে ভোট করানোর জন্য সুপ্রিমকোর্টে গিয়ে আবেদন করো । চাল ধরা পড়ে গেছে ।
বিডিও, জেলাশাসকদের ভুয়ো নাম রেখে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি
তিনি মমতা ব্যানার্জিকে নিশানা করে বলেন,ছত্রে ছত্রে ড্রামা আর নাটক । মিথ্যাচার ছাড়া সত্য কথা বলে না । আপনারা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন, আমি এলওপি এভিডেন্স নিয়ে বলছি, এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী ২৭ শে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে ২১ শে জুলাই, পরে বোলপুরের প্রশাসনিক সভা থেকে সরাসরি বিএলও,বিডিও, ডিএম-দেরকে ভয় দেখিয়েছে… “আমি ছিলাম আমি থাকবো, ভেবেচিন্তে কাজ করবেন” ।
শুধু এই কথাই নয়, উন্নয়নের নামে ডিএম-দের নবান্নে ডাকা হয়েছে । ডেকেছেন কে? আগের মুখ্য সচিব মনোজ পন্থ । ডেকেছেন কে ? বর্তমান মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী । ডিএম-দের মোবাইল ফোন বাইরে রাখা হয়েছে । যে মিটিংয়ে মুখ্যমন্ত্রী থাকার কথা নয়, হঠাৎ করে মিটিং শুরু হওয়ার পরে ওনার উদয় হয়েছে । মনোজ পন্থ এবং মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি করে এটা করেছেন এবং নন্দিনী চক্রবর্তী ও মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি করে আর একটা মিটিং করেছেন । সেখানে ঢুকে ডি এম দের বলেছেন কোন নাম যাতে বাদ না যায়, দেখার দায়িত্ব তোমার ।
জেলাশাসকদের পদন্নোতির প্রলোভন
শুভেন্দু দাবি করেছেন,তোমার প্রমোশন, পোষ্টিং, তোমার যা যা পারসোনাল এটাই এজেন্ডা আছে, তোমার যা যা স্বপ্ন আছে, আমি পূরণ করে দেব । কিন্তু নাম যেন বাদ না যায় । এটা জানার পরে আমি দিল্লি থেকে ইসিআই-এর কাছে দুটো দাবি করেছিলাম । পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য এবং স্বচ্ছ ভোটার তালিকার জন্য । দাবি এক, কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারীদের মাইক্রো অফ্জার্ভার করতে হবে । দাবি দুই, সিসিটিভি এবং লাইভ ওয়েব কাস্টিং করে শুনানির কার্যক্রম করতে হবে । ইলেকশন কমিশন একটি দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করেন । তারা কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের আধিকারিকদের মাইক্রো অবজারভার করেন । কিন্তু দ্বিতীয় দাবি কেন মানেননি আমরা জানি না ।
অনুপ্রবেশকারীদের ঢালাও বার্থ সার্টিফিকেট ডমিসাইল সার্টিফিকেট
তিনি বলেন,এই মাইক্রো অবজার্ভার আসার পরে মুখ্যমন্ত্রী যে প্ল্যান ছিল সফল হয়নি । দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে ডিএম সুমিত গুপ্তাকে তুলে এনে কলকাতা কর্পোরেশনে বসিয়ে বার্থ সার্টিফিকেট ঢালাওভাবে দিয়েছেন এবং গোটা রাজ্যে করেছেন । এছাড়া কলকাতা পুলিশকে দিয়ে রাতারাতি অবৈধ বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের ডমিসাইল সার্টিফিকেটও হাজারে হাজারে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন । এর জন্য কলকাতা পুলিশের কুড়িজন এসআই-কে আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার ডকুমেন্টও আমাদের আছে । এমসিসি চালু হলে ওদের যেখানে ভোগানোর আমরা ভোগাবো । বিজেপি তৈরি আছে।
মমতা ব্যানার্জির হুমকির রাজনীতি
শুভেন্দু বলেন,এত কিছু করার পরেও ইলেকশন কমিশন আধুনিক সফটওয়্যার নিয়ে এনেছে, এজন্য জ্ঞানেশ কুমার-মনোজ আগরওয়ালের পরে সীমা খান্নাকে পর্যন্ত আক্রমণ করে । একদম সুপরিকল্পিতভাবে হয়েছে । ব্যক্তিগত আক্রমণ করে যেমন সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে দেয়, যেমন আমলাতন্ত্রকে ভয় দেখায়,ডাক্তার বিধায়ক সাংসদদের ভয় দেখায় । আমাকে নিয়ে বলেছিল ।
শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন যে বিএলও-দের দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে নামে ভুল করিয়ে শুনানি ক্যাম্পে ভিড় জমাচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি । মানুষকে শুনানি ক্যাম্পে নিয়ে এসে খেপিয়ে অশান্তির সৃষ্টি করে তিনি এসআইআর প্রক্রিয়াকে ভন্ডুল করে দিতে চাইছেন বলে অভিযোগ করেছেন শুভেন্দু ।।

