সমাধি পাদ ।
অথ যোগানুশাসনম্ ॥ 1 ॥
যোগশ্চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ ॥ 2 ॥
তদা দ্রষ্টুঃ স্বরূপেঽবস্থানম্ ॥ 3 ॥
বৃত্তি সারূপ্যমিতরত্র ॥ 4 ॥
বৃত্তয়ঃ পঞ্চতয্যঃ ক্লিষ্টাঽক্লিষ্টাঃ ॥ 5 ॥
প্রমাণ বিপর্যয় বিকল্প নিদ্রা স্মৃতয়ঃ ॥ 6 ॥
প্রত্যক্ষানুমানাগমাঃ প্রমাণানি ॥ 7 ॥
বিপর্যয়ো মিথ্যাজ্ঞানমতদ্রূপ প্রতিষ্ঠম্ ॥ 8 ॥
শব্দজ্ঞানানুপাতী বস্তুশূন্যো বিকল্পঃ ॥ 9 ॥
অভাব প্রত্যয়ালম্বনা বৃত্তির্নিদ্রা ॥ 10 ॥
অনুভূত বিষয়াসংপ্রমোষঃ স্মৃতিঃ ॥ 11 ॥
অভ্যাস বৈরাগ্যসভ্য়াং তন্নিরোধঃ ॥ 12 ॥
তত্র স্থিতৌ যত্নোঽভ্যাসঃ ॥ 13 ॥
স তু দীর্ঘকাল নৈরংতর্য় সত্কারাসেবিতো দৃঢভূমিঃ ॥ 14 ॥
দৃষ্টানুশ্রবিক বিষয় বিতৃষ্ণস্য বশীকারসংজ্ঞা বৈরাগ্যম্ ॥ 15 ॥
তত্পরং পুরুষখ্য়াতে-র্গুণবৈতৃষ্ণ্যম্ ॥ 16 ॥
বিতর্ক বিচারানংদাস্মিতারূপানুগমাত্ সংপ্রজ্ঞাতঃ ॥ 17
বিরামপ্রত্যয়াভ্য়াসপূর্বঃ সংস্কারশেষোঽন্যঃ ॥ 18 ॥
ভবপ্রত্যয়ো বিদেহপ্রকৃতিলয়ানাম্ ॥ 19 ॥
শ্রদ্ধা বীর্য় স্মৃতি সমাধিপ্রজ্ঞা পূর্বক ইতরেষাম্ ॥ 20 ॥
তীব্রসংবেগানামাসন্নঃ ॥ 21 ॥
মৃদুমধ্য়াধিমাত্রত্বাত্ততোঽপি বিশেষঃ ॥ 22 ॥
ঈশ্বরপ্রণিধানাদ্বা ॥ 23 ॥
ক্লেশ কর্ম বিপাকাশয়ৈরপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষ ঈশ্বরঃ ॥ 24 ॥
তত্র নিরতিশয়ং সর্বজ্ঞবীজম্ ॥ 25 ॥
স এষঃ পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেনানবচ্ছেদাত্ ॥ 26 ॥
তস্য বাচকঃ প্রণবঃ ॥ 27 ॥
তজ্জপস্তদর্থভাবনম্ ॥ 28 ॥
ততঃ প্রত্যক্চেতনাধিগমোঽপ্যংতরায়াভাবশ্চ ॥ 29 ॥
ব্যাধি স্ত্যান সংশয় প্রমাদালস্যাবিরতি ভ্রান্তি
দর্শনালব্ধভূমিকত্বানবস্থিতত্বানি চিত্তবিক্ষেপাস্তেংঽতরায়াঃ ॥ 30 ॥
দুঃখ দৌর্মনস্যাংগমেজযত্ব শ্বাসপ্রশ্বাসা বিক্ষেপসহভুবঃ ॥ 31 ॥
তত্প্রতিষেধার্থমেকতত্ত্বাভ্য়াসঃ ॥ 32 ॥
মৈত্রী করুণা মুদিতোপেক্ষাণাং সুখ দুঃখ পুণ্যাপুণ্য বিষয়াণাম্-ভাবনাতশ্চিত্তপ্রসাদনম্ ॥ 33 ॥
প্রচ্ছর্দন বিধারণাভ্য়াং বা প্রাণস্য ॥ 34 ॥
বিষযবতী বা প্রবৃত্তিরুত্পন্না মনসঃ স্থিতি নিবংধিনী ॥ 35 ॥
বিশোকা বা জ্য়োতিষ্মতী ॥ 36 ॥
বীতরাগ বিষয়ং বা চিত্তম্ ॥ 37 ॥
স্বপ্ন নিদ্রা জ্ঞানালংবনং বা ॥ 38 ॥
যথাভিমতধ্য়ানাদ্বা ॥ 39 ॥
পরমাণু পরম মহত্ত্বাংতোঽস্য বশীকারঃ ॥ 40 ॥
ক্ষীণবৃত্তেরভিজাতস্য়েব মণের্গ্রহীতৃগ্রহণ গ্রাহ্য়েষু তত্স্থ তদংজনতা সমাপত্তিঃ ॥ 41 ॥
তত্র শব্দার্থ জ্ঞান বিকল্পৈঃ সংকীর্ণা সবিতর্কা সমাপত্তিঃ ॥ 42 ॥
স্মৃতি পরিশুদ্ধৌ স্বরূপ শূন্যেবার্থ মাত্রনির্ভাসা নির্বিতর্কা ॥ 43 ॥
এতয়ৈব সবিচারা নির্বিচারা চ সূক্ষ্মবিষয়া ব্যাখ্যাতা ॥ 44 ॥
সূক্ষ্ম বিষযত্বং চালিংগপর্যবসানম্ ॥ 45 ॥
তা এব সবীজঃ সমাধিঃ ॥ 46 ॥
নির্বিচার বৈশারাদ্যেঽধ্য়াত্মপ্রসাদঃ ॥ 47 ॥
ঋতংভরা তত্র প্রজ্ঞা ॥ 48 ॥
শ্রুতানুমান প্রজ্ঞাভ্য়ামন্যবিষয়া বিশেষার্থত্বাত্ ॥ 49 ॥
তজ্জঃ সংস্কারোঽন্যসংস্কার প্রতিবংধী ॥ 50 ॥
তস্যাপি নিরোধে সর্বনিরোধান্নির্বীজস্সমাধিঃ ॥ 51 ॥
ইতি পাতঞ্জলয়োগদর্শনে সমাধিপাদো নাম প্রথমঃ পাদঃ ।
পঞ্জজলি যোগসূত্র : সমাধি পাদের ব্যাখ্যা
সমাধি পদ হল পতঞ্জলির যোগ দর্শন বা যোগসূত্রের প্রথম অধ্যায় , এবং এটি যোগ অনুশীলন এবং “সমাধি” নামে পরিচিত ধ্যানমগ্নতার অবস্থা অর্জনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
সমাধি পদ-এ, পতঞ্জলি যোগের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন, যা হল মনের ওঠানামা, যাকে “বৃত্তি” বলা হয়, শান্ত করা, যাতে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ অনুভব করা যায়। এটি “সমাধি” অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করা হয়, গভীর একাগ্রতা এবং ধ্যানের একটি অবস্থা যেখানে ব্যক্তির চেতনা মনোযোগের বস্তুর সাথে মিশে যায়, পর্যবেক্ষক এবং পর্যবেক্ষণকারীর মধ্যে বিচ্ছেদের অনুভূতিকে অতিক্রম করে।
সমাধিপদে বিভিন্ন ধরণের সমাধি এবং সেগুলি অর্জনের পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ের একটি কেন্দ্রীয় ধারণা হল “চিত্ত-বৃত্তি- নিরোধ”, যা মন-বস্তু বা “চিত্ত”-এর স্থির বা শান্তকরণকে বোঝায়।
সমাধিপদে সমাধি অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টিকারী বাধা এবং বিক্ষেপগুলি নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি এবং বিতৃষ্ণা। পতঞ্জলি “সংযম” (যম) এবং “আচরণ” (নিয়ম) অনুশীলনের মাধ্যমে এই বাধাগুলি অতিক্রম করার একটি পথ উপস্থাপন করেছেন।
সমাধিপদ দুটি ধরণের সমাধির মধ্যে পার্থক্যও অন্বেষণ করে: “সবিকল্প” (যোগ্য) এবং “নির্বিকল্প” (অযোগ্য)। সবিকল্প সমাধি হল একাগ্র এবং স্থির মনের একটি অবস্থা, কিন্তু মনোযোগের বস্তুর সাথে একীভূত হওয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অন্যদিকে, নির্বিকল্প সমাধি হল এমন একটি অবস্থা যেখানে মন সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত এবং মনোযোগের বস্তুর সাথে মিশে যায়, যার ফলে আত্মবোধ সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়।
পতঞ্জলির যোগসূত্রের সমাধি পদ যোগের মৌলিক নীতিগুলিকে প্রতিষ্ঠা করে যা মনকে শান্ত করে এবং সমাধি অনুশীলনের মাধ্যমে আত্ম-উপলব্ধি অর্জনের উপায়। এটি বিভিন্ন ধরণের সমাধির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, বাধা অতিক্রম করার পথের রূপরেখা দেয় এবং মুক্তি ও আত্ম-উপলব্ধি অর্জনের জন্য সমাধির সর্বোচ্চ অবস্থার গুরুত্বের উপর জোর দেয়।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হল :
০১ – অথ যোগ অনুশাসনম।
এখন যোগ সম্পর্কে অনুশাসন বা বিধি-উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। অথ অর্থাৎ এখন। আসলে এইসব উপদেশ চিরকালীন। তাই অথ। না ভূত না ভবিষ্যৎ সবসময়ই বর্তমান। কারুর কারুর মতে, অথ শব্দের অর্থ অধিকার। অর্থাৎ একমাত্র অধিকারীই এই উপদেশ শ্রবণ যোগ্য। যোগ অর্থাৎ মিলন, একের সঙ্গে অন্যের মিলন বা যোগ । যিনি এই যোগের প্রক্রিয়ায় বা চেষ্টায় রত তিনিই যোগী। অনুশাসনম অর্থাৎ সুক্ষ নিয়ন্ত্রণ। অনু কথাটার মানে সুক্ষ, শাসন অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ। তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম – যোগ্যব্যক্তিকে বর্তমানে (চিরকালীন) মিলনের বা যোগের সুক্ষ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করা হচ্ছে।
০২ – যোগ চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ।
যোগ হচ্ছে চিত্তবৃত্তির নিরোধ। যোগ প্রক্রিয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে চিত্তবৃত্তিকে নিরোধ করা অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ করা । এখন চিত্ত কী আর তার বৃত্তিই বা কী ? আমরা পঞ্চ ইন্দ্রিয়দ্বারা (চক্ষু, নাসিকা, জিহ্ববা ত্বক) যখনি বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হই, তখন আমাদের গ্রাহক গ্রন্থির সাহায্যে গ্রন্থিচক্রে স্পন্দন তোলে। এবং গ্রন্থিচক্রের প্রধান কর্মকেন্দ্র মস্তিষ্কে আলোড়ন তোলে। সেখানে সঞ্চিত স্মৃতি-অভিজ্ঞতা দ্বারা বহির্জগতের ক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করা হয়। এবং তত্ক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, এবং বাহক গ্রন্থির সাহায্যে কর্মকেন্ত্রগুলিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠায়। সেইমত ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। এই গ্রন্থিচক্রগুলোই চিত্ত। আর এই চিত্তে যখন আলোড়ন হয় অর্থাৎ বহির্জগতের ক্রিয়া, দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ, আস্বাদ, ইত্যাদি যখন গ্রাহক যন্ত্রের সাহায্যে প্রতিফলিত হয়, তখন চিত্ত বা গ্রন্থিচক্রের রসে আন্দোলন তোলে। এবং আমরা বিচলিত হয়ে উঠি। অর্থাৎ গ্রন্থিরসে আন্দোলন না হলে আমাদের চিত্ত বিক্ষিপ্ত হবে না। তাই পতঞ্জলি বলছেন চিত্তবৃত্তিকে নিরোধ করতে পারলেই যোগ সম্পাদিত হবে। অর্থাৎ চিত্তবৃত্তিকে নিরোধ করো।
০৩ – তদা দ্রষ্টূ স্বরূপে অবস্থানম।
সেই অবস্থায় দ্রষ্টা স্ব-রূপে অবস্থান করে।পতঞ্জলি বলছেন এই যোগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে, দ্রষ্টা অর্থাৎ সত্যিকারের আমি স্বরূপে অবস্থান করবে। সে তখন ইন্দ্রিয় প্রদত্ত্ব তথ্য দ্বারা আবেশিত হবে না। এখন এই দ্রষ্টাই বা কে ? আর স্বরূপ-ই বা কি ? দ্রষ্টা হচ্ছেন আত্মা, আর স্ব-রূপ হচ্ছে সৎ-চিৎ-আনন্দম। অর্থাৎ সত্য, চিন্ময়স্বরূপ, আনন্দ স্বরূপ। মহর্ষি পতঞ্জলি এর আগের শ্লোকে বলেছিলেন, চিত্তবৃত্তি নিরোধ করতে হবে। এখন বলছেন, এই অবস্থায় অর্থাৎ নিরোধ কালে, যোগী স্বরূপে অবস্থান করবেন। অর্থাৎ পরমপুরুষ পরম-ঈশ্বর বা দ্রষ্টা স্বরূপে অবস্থান করবেন। তাহলে বলা যেতে পারে, দ্রষ্টার স্বরূপে অবস্থিতির জন্য, চিত্ত বৃত্তির নিরোধ আবশ্যিক, এবং চিত্তবৃত্তি নিরোধ হলে, পরমপুরুষ চিত্তে সঠিক ভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।
০৪ – বৃত্তি সারূপ্যম ইতর অত্র।
এই সময় বৃত্তি স্বরূপে অবস্থান করে, অন্য সময় বৃত্তি অন্যত্র অবস্থান করে।এই যোগে অবস্থিত করতে পারলে, বৃত্তি অর্থাৎ গ্রন্থিরস স্থির, আন্দোলনহীন অবস্থায় অবস্থান করবে এবং এই আন্দোলনহীন অবস্থায় পরম-আত্মা চিত্তে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু অন্য সময় চিত্ত যখন ইন্দ্রিয় লব্ধ অনুভূতিতে স্পৃষ্ট থাকবে, তখন বৃত্তি প্রতিনিয়ত চঞ্চল ও বাহ্যিক ক্রিয়াশীল থাকবে।
বৃত্তি সারূপ্যম, অর্থাৎ এই সময় বৃত্তি স্ব-রূপে অবস্থান করে। চিত্ত আসলে যেন একটা চুম্বক, পরম-পুরুষের কাছে আসা মাত্র, চিত্ত পরম-পুরুষের নিজস্ব স্ব-রূপ হয়। সেই জন্য, চিত্তবৃত্তি জ্ঞানের সঙ্গে পরম-পুরুষের একাত্মতা অনুভব হয়। এবং এই সম্বন্ধন আদি অনাদি। এই পুরুষ হলো ভোক্তা। আর চিত্ত হলো ভোগ্য দৃশ্য। এবং বৃত্তি হলো বিষয়। চিত্তই বিষয় আকারে পরিমিত হয়ে আমিত্ত্বযুক্ত জ্ঞানবান পুরুষের সামনে তুলে ধরে। এবং আমিত্ত্বযুক্ত জ্ঞানবান পুরুষ তখন দ্রষ্টা। আর দ্রোষ্টা-ই সাক্ষী-চৈতন্য। আমাদের শরীরে চেতন-পুরুষের অবস্থান হওয়ায় ইন্দ্রিয় ও করণগুলি চেতনের মতো কাজ করে। তাই চিত্তবৃত্তি তার দর্শিত বিষয় চেতনপুরুষকে ভোগ করায়। তাই পরম-পুরুষ নিজে ভোগাতীত হয়েও যেন ভোগাধীন হয়ে যান। নিজেকে বৃত্তির অধীনে রেখে বৃত্তির সঙ্গে অভেদ প্রতিপন্ন হন। অনন্ত কালের এই অজ্ঞানতা আমাদের সংস্কার রূপে দৃঢ় হয়ে গেছে। তাই সংস্কারবসত আমাদের চিত্তের সঙ্গে পরম-পুরুষের একতানতা অনুভব হয়। দ্রষ্টা ও দৃশ্য আমরা এক করে ফেলি। দ্রষ্টা স্বয়ং-প্রকাশ, আর দৃশ্য প্রকাশ সাপেক্ষ। ভোগ্য, ভোক্তা, দ্রষ্টা। ভোগ্য হচ্ছে দৃশ্য। ভোক্তা হচ্ছে আমিত্ত্বযুক্ত পুরুষ, দ্রষ্টা হচ্ছেন পরম-পুরুষ। একটা সুন্দর উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানো হয়েছে। একটা গাছে দুটো পাখি। গাছের সুমিষ্ট পার্থিব ফল একটা পাখি খাচ্ছে, তিনি আমিত্বযুক্ত পুরুষ, আর একটা পাখি দেখছে, যিনি দ্রষ্টা অর্থাৎ পরম পুরুষ ।
যুক্ত করে রাখাকেই বলে যোগ। এককে অগ্রাধিকার দিয়ে মনকে স্থির করতে পারলেই যোগ সম্ভব। চিত্ত সদা চঞ্চল। বহু বিষয়ে ধাবিত। চিত্তকে বহুমুখী অবস্থান থেকে সরিয়ে একমুখী করে যোগ। আমাদের চিত্তে পরস্পর বিচ্ছিন্ন চিন্তাধারার স্রোত বইছে। বিরামহীন, নিয়ন্ত্রণহীন এই চিন্তাস্রোত। এবং এসবই বিষয়মুখী। প্রকৃতি থেকে উৎপন্ন। এ যেন এক বহমান নদী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের মন থাকবে আর তার চঞ্চলতা থাকবে না সেটা তো হতে পারে না। এইখানেই যোগের কারিকুরি। যোগ আমাদের শেখায়, বহমান চঞ্চল ধারাকে অবিচ্ছিন্ন ধারায় প্রবাহিত করা যায় কি না। নদী বয়ে চলবে। কিন্তু তার ঢেউকে প্রশমিত করবার জন্য, আমাদের বুঝতে হবে ঢেউ কেন হয়। নদীর ভেতরের ভূমিকে যদি সমতল করা যায়, তবে বহমান নদী তার চঞ্চলটাকে স্তিমিত করে দেবে। আর আমরা এই চিত্তনদীতে পরম-পুরুষের স্থির প্রতিফলন অনুভব করতে পারবো। এই জন্য প্রথমে দুটো ঢেউয়ের মাঝের সময়কে আমাদের ধরতে হবে। এবং তখনি আমরা ধরতে পারবো ভূমির অচঞ্চল অবস্থা। আর আমাদের চিন্তা যেহেতু বিষয় ভিত্তিক, এবং বিষয় যেহেতু প্রকৃতির অঙ্গ মাত্র তাই প্রকৃতির পরিবর্তনের ক্ষণটিকে ধরতে হবে। অর্থাৎ বৃত্তির বিষয়ান্তরে যাবার ক্ষণটিকে ধরতে হবে। প্রকৃতির যেমন পাঁচটি সন্ধিক্ষণ আছে অর্থাৎ সকাল, সন্ধ্যা, দুপুর গভীর রাত ও ব্রাহ্মমুহূর্ত। এই সময়গুলোকে কাজে লাগাতে হবে। যোগ দর্শন এক যুক্তিভিত্তিক, পৃকৃতিবন্ধু চিত্ত দিয়েই চিত্তকে উদ্ধারের প্রক্রিয়া।
০৫ -বৃত্তয়ঃ পঞ্চতয্য ক্লিষ্টা অক্লিষ্টাঃ।
বৃত্তি পাঁচ প্রকার – ক্লেশ সহ ও ক্লেশ বিহীন। মহর্ষি পতঞ্জলি বলছেন বৃত্তি পাঁচ প্রকার, অর্থাৎ বৃত্তির ক্রিয়াফল পাঁচ রকম। এর মধ্যে কিছু আছে ক্লেশকর আর কিছু আছে ক্লেশবিহীন। সেগুলি কী ? পরের শ্লোকে বলছেন :
০৬ – প্রমান-বিপর্যয়-বিকল্প-নিদ্রা-স্মৃত্যঃ ।
প্রমান অর্থাৎ প্রত্যক্ষ জ্ঞান ,বিপর্যয় অর্থাৎ বিপরীত জ্ঞান বা ভ্ৰম , বিকল্প অর্থাৎ প্রায় একই রকম, এর পর আছে নিদ্রা, ও স্মৃতি ইত্যাদি।
প্রমান বা প্রতক্ষ্য জ্ঞান তিন রকম।
এক ) ইন্দ্রিয় উপলব্ধি : আমরা ইন্দ্রিয় দিয়ে যা উপলব্ধি করি। যদিও ইন্দ্রিয় আমাদের মাঝে মধ্যে বিভ্রম ঘটায়। এই বিভ্রম বাদ দিলে, যা কিছু আমরা অনুভব করছি বা দেখতে পারছি সেটাই আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ জ্ঞান বা প্রমান। আমার চারিপাশে যা কিছু দেখছি, এটাই যথেষ্ট প্রমান যে এইসব দৃশ্যমান বস্তু আছে।
০৭ – প্রত্যক্ষ অনুমান আগমঃ প্রমাণানি
প্রমান হচ্ছে তিন প্রকার – প্রত্যক্ষ, অনুমান, ও আগম অর্থাৎ আপ্তবাক্য।
প্রত্যক্ষ জ্ঞান : আমাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভের উপায় বা মাধ্যম হচ্ছে ইন্দ্রিয়বর্গ । আমরা চোখ দিয়ে দেখি, কান দিয়ে শুনি, নাক দিয়ে ঘ্রান নেই, জিভ দিয়ে আস্বাদ নেই, ত্বক বা চামড়া দিয়ে স্পর্শ করি। এগুলোর সাহায্যেই আমরা অকাট্য প্রমান পাই। এই ইন্দ্রিয় লব্ধ জ্ঞানই আমাদের সাক্ষাৎ জ্ঞান।
অনুমান : প্রতক্ষ্য পূর্ব-অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞানকে আশ্রয় করে মানুষ অনুমানের সাহায্যে নতুন জ্ঞান আহরণ করতে পারে। বাঘের পদ-চিহ্ন দেখে জঙ্গলে বাঘের বাস অনুমান করতে পারি ।
আগম বা আপ্তবাক্য : অর্থাৎ বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তির কাছ থেকে, আমরা জ্ঞান সংগ্রহ করতে পারি।
০৮ – বিপর্যয়ো মিথ্যা জ্ঞানম তদ্রুপ প্রতিষ্ঠম।
বিপর্যয় হলো মিথ্যা জ্ঞান অর্থাৎ আপাততঃ মনে হয় সত্য এবং সেইমতো জ্ঞান প্রতিষ্ঠা হয়।
বিপর্যয় বা মিথ্যা জ্ঞান অর্থাৎ আমরা যে প্রতক্ষ্য করছি এটা সত্য, কিন্তু যা প্রতক্ষ্য করছি সেটাই সত্য এমন নয়। অথবা এমন অনেক কিছু আছে, যা আমাদের প্রত্যক্ষের বাইরে, কিন্তু সত্য। আসলে আমাদের ইন্দ্রিয়বর্গের একটা নিজস্ব সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা অতিরিক্ত কাছের বস্তু দেখতে পাই না। আমরা অতিরিক্ত দূরের কিছু দেখতে পাই না। আলো কম হলে আমরা দেখতে পাই না। আলো বেশি হলে আমরা দেখতে পাই না। এই সীমাবদ্ধতা চোখের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনি আমাদের কানের ক্ষেত্রেও সত্য। খুব উঁচুগ্রাম বা খুব নিচুগ্রামের শব্দ আমরা শুনতে পাই না। আমাদের চোখের দৃষ্টিগ্রাহ্যতার যেমন একটা সীমা আছে। আমাদের কানেরও তেমনি শ্রূতিগ্রাহ্যতার একটা সীমা আছে। তাই ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে লব্ধ প্রতক্ষ্য জ্ঞান আমাদের সম্পূর্ণ জ্ঞান দান করতে পারে না।
০৯ – শব্দ-জ্ঞানানুপাতী বস্তূ শূন্য বিকল্পঃ।
শব্দ জ্ঞানের অনুধাবনকারী বস্তূ বিহীন বিকল্প।
শব্দজ্ঞান আসলে বস্তু নিরপেক্ষ জ্ঞান। কোনো শব্দই আমাদের বস্তুর জ্ঞান দিতে পারে না।
“বাঘ” বলতে আমাদের মনে একটা বাঘের ছবি ভেসে ওঠে মাত্র। বাঘের গর্জন আমাদের কাছাকাছি বাঘ আছে এই জ্ঞান দিতে পারে মাত্র। তার বেশি কিছু নয়।
১০ – অভাব প্রত্যয়ালম্বনা বৃত্তিঃ নিদ্রা।
(জ্ঞানের) অভাবকে আশ্রয় করে যে প্রত্যয় বৃত্তি-তে হয় তাকে নিদ্রা বলে। নিদ্রা তিনটি স্তরে বিভক্ত। আচ্ছন্ন, স্বপ্ন, সুষুপ্তি। আচ্ছন্ন অবস্থায় আমরা বিশ্রাম করি মাত্র। স্বপ্নে আমরা ক্রিয়াশীল হয়ে যাই। সুষুপ্তিতে আমরা সাম্যাবস্থায় থাকি। স্বপ্নে আমাদের কর্ম-ইন্দ্রিয়গুলো ও জ্ঞান ইন্দ্রিয় গুলো জড়বৎ থাকে, কিন্তু মন, বুদ্ধি,চিত্ত অহংকার ইত্যাদি এবং মস্তিষ্কের পরিচালন অংশ অর্থাৎ মধ্যে-মস্তিস্ক সচেষ্ট থাকে।
১১ – অনুভূত বিষয় অসম্প্রমোষঃ স্মৃতিঃ।
শুধুমাত্র অনুভূত হয়েছে, অন্যগুলো নয় , হচ্ছে স্মৃতি। যা অনুভব হয়েছে, তাই স্মৃতি। আসলে সমগ্র আধ্যাত্মিক জগতে সবথেকে গুরুত্ত্বপূর্ন হচ্ছে স্মৃতি। এই স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলাই সাধনা। আমি কে, তা এই স্মৃতিতে আছে। সমস্ত জ্ঞান ভান্ডার এই স্মৃতি। আমরা নতুন করে কিছু জানি না। স্মৃতিতে যা আছে, তাকে উন্মোচন করাই জ্ঞানের সাধনা, আধ্যাত্মিক সাধনা।
১২ – অভ্যাস বৈরাগ্যাভ্যাং তন্ নিরোধঃ।
অভ্যাস ও বৈরাগ্যের সাহায্যে এদের নিরোধ করতে হবে।
১৩ – তত্র স্থিতৌ যত্ন অভ্যাসঃ।
এই অবস্থায় থেকে অর্থাৎ অভ্যাস ও বৈরাগ্যের সাহায্যে বৃত্তি নিরোধ ক্রিয়া অবিরাম অভ্যাস করে যেতে হবে।
১৪ – স তু দীর্ঘকাল নৈরন্তর্য সৎকার আসেবিতো দৃঢ়ভূমিঃ।
সেই অভ্যাস কিন্তু দীর্ঘকাল আদরের সঙ্গে পালন করলে, তা দৃঢ় স্থান করে নেয়।
১৫ – দৃষ্ট আনুশ্রবিক বিষয় বিতৃষ্ণস্য বশীকার সংজ্ঞা বৈরাগ্যম।
দেখা বা শোনা সমস্ত বিষয়ে বিতৃষ্ণাকারীর বাশিকার নামক বৈরাগ্য উৎপন্ন হয়।
১৬ – তৎ পরং পুরুষখ্যাতেঃ গুনবৈতৃষ্ণ্যম্।
তারপর পুরুষখ্যাতি সিদ্ধ হলে গুণে বিতৃষ্ণার উদয় হয়।
১৭ – বিতর্ক বিচার আনন্দ অস্মিতা রূপানুগমাৎ সম্প্রজ্ঞাতঃ।
বিতর্ক, বিচার, আনন্দ ও অস্মিতা রূপে অনুগমনের পরে যে অবস্থা বা সমাধি তাকে সম্প্রজ্ঞাত বলে।
১৮ – বিরাম প্রত্যয় অভ্যাস-পূর্বঃ সংস্কার-শেষঃ অন্যঃ ।
বিরামের প্রত্যয় অভ্যাস পূর্বক সংস্কারের যে শেষ অবস্থা তাকে অন্য অর্থাৎ সম্প্রজ্ঞাত থেকে অন্য অর্থাৎ অসম্প্রজ্ঞাত বলে।
১৯ – ভব প্রত্যয়ো বিদেহ প্রকৃতিলয়ানাম্ ।
বিদেহ ও প্রকৃতিলয় পুরুষদের ভব-প্রত্যয় হয়।
২০ – শ্রদ্ধা বীর্য স্মৃতি সমাধি প্রজ্ঞা পূর্বক ইতরেষাম্।
শ্রদ্ধা, বীর্য, স্মৃতি, প্রজ্ঞা সমাধি দ্বারাই অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি লাভ হয়, অন্যথা নয়।
২১ – তীব্র সংবেগানাম আসন্নঃ।
তীব্র বেগশালীদের সমাধি আসন্ন।
২২ – মৃদু মধ্য অধিক মাত্র ত্বাৎ ততো অপি বিশেষঃ।
বেগের মাত্রার তারতম্যে অর্থাৎ মৃদু, মধ্যে, বা অধিক বেগের জন্য আসন্ন সমাধির তারতম্য রয়েছে।
২৩ – ঈশ্বর প্রণিধানৎ বা ।
অথবা ঈশ্বরেতে প্রণিধান থেকেও সমাধি লাভ হয়।
২৪ – ক্লেশ কর্ম বিপাকশৈঃ অপরামৃষ্টঃ পুরুষ বিশেষ ঈশ্বরঃ ।
অবিদ্যা জনিত যে ক্লেশ, ক্লেশ জনিত যে কর্মের উদ্ভব , আবার কর্ম জনিত যে ফল তার সঙ্গে যিনি অপরামৃষ্ট অর্থাৎ সম্মন্ধ বিহীন সেই পুরুষই ঈশ্বর।
২৫ – তত্র নিরতিশয়ং সর্বজ্ঞ বীজম।
সেখানে সর্বজ্ঞ বীজ সদা সর্বদা বিরাজমান।
২৬ – পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেন অনবচ্ছেদাৎ।
তিনি পূর্ব পূর্ব গুরুদেরও গুরু, কারন কাল দিয়ে তাকে ছেদন করা যায় না।
২৭ – তস্য বাচকঃ প্রণবঃ।
সেই বাচক অর্থাৎ শব্দই প্রণব বা ওঁ-কার।
২৮ – তৎ জপ তদ্ অর্থ ভাবনম্।
তৎ অর্থাৎ প্রণব বা ওঁ জপ করো, এবং তার অন্তর্নিহিত অর্থ ভাবো। তারই জপ্ তারই অর্থ ভাবনা।
২৯ – তৎ প্রত্যেক চেতন অধিগমঃ অপি অন্তরায় অভাবশ্চ ।
তৎ অর্থাৎ এই ভাবে জপ্ করলে প্রত্যেক চেতনে অধিগমন হয় অর্থাৎ সমস্ত চেতনার জ্ঞান হয়, এবং সমস্ত অন্তরায় দূর হয় বা অন্তরায়ের অভাব হয়।
৩০ – ব্যাধি স্তান্যং সংশয়ঃ প্রমাদঃ আলস্যাৎ অবিরতি ভ্রান্তি দর্শন অলব্ধ
ভুমিকত্বং অনবস্থিত ত্বানি চিত্ত বিক্ষেপাঃ তে অন্তরায়াঃ।
ব্যাধি, চিত্তের অলসতা, সংশয়, প্রমাদ, আলস্য, অবিরাম ভ্রান্তি দর্শন, অলব্ধ ভূমিকত্ব অর্থাৎ সমাধি লাভ করতে দেয় না। চিত্ত বিক্ষেপের কারন তাই এগুলি সমাধির অন্তরায়।
৩১ – দুঃখম দৌর্মনস্য অঙ্গমেজয়ত্বং শ্বাস-প্রশ্বাসঃ বিক্ষেপসহ ভুবঃ।
দুঃখ, দূর্দমনস্য অর্থাৎ ইচ্ছায় বাঁধা সৃষ্টি হলে চিত্তে যে বিক্ষেপ জন্মায়, অঙ্গমেজয়ত্ব মানে শরীরের কম্পন, শ্বাস-প্রশ্বাস অর্থাৎ বায়ু গ্রহণ ও ত্যাগ, বিক্ষেপসহ ভুবঃ অর্থাৎ এই চিত্ত বিক্ষেপের সঙ্গে জন্ম।
অদমনীয় এবং অপূরণীয় ইচ্ছার ফলে যে চিত্ত বিক্ষেপ হয় তাই দুঃখ।
৩২ – তৎ প্রতিষেধার্থম একতত্ব অভ্যাসঃ।
তৎ অর্থাৎ এই দুঃখ উপশমের জন্য এক তত্বের অভ্যাস করা উচিত।
৩৩ – মৈত্রী করুনা মুদিতা উপেক্ষানাম সুখ দুঃখ পুন্যা-পুন্য বিষয়াণাং ভাবনাতঃ চিত্ত প্রসাদনম্।
সুখী, দুঃখী, পুণ্যবান, অপূণ্যবান সবার প্রতি মৈত্রী, করুণা, মুদিতা অর্থাৎ হর্ষ বা উৎফুল্ল, উপেক্ষা – এইরূপ ভাবনা থেকেই চিত্ত প্রসন্ন হয়।
৩৪ – প্রচ্ছর্দন-বিধারণাভ্যাং বা প্রাণস্য।
প্রাণবায়ু ছেড়ে দিয়ে সেই অবস্থাকে ধারণ করা অর্থাৎ কুম্ভক করলে চিত্ত স্থির করা যায়।
৩৫ – বিষয়বতী বা প্রবৃত্তিঃ উৎপন্না মনসঃ স্থিতি নিবন্ধিনী।
বিষয়বতী অর্থাৎ কোনো বিষয়ের প্রতি নিবিষ্ট চিত্ত হলে বা মনে উৎপন্ন প্রবৃত্তির প্রতি স্থিত হলে চিত্ত স্থির হতে পারে।
৩৬ – বিশোকা বা জ্যোতিষ্মতি।
শোক রোহিত অথবা জ্যোতিতে স্থির হলে চিত্ত শান্ত হয়।
৩৭ – বীতরাগ বিষয়ং বা চিত্তম।
বিষয়ে যার বীতরাগ অর্থাৎ বিতৃষ্ণা হয়েছে – সেই চিত্ত শান্ত।
৩৮ – স্বপ্ন নিদ্রা জ্ঞান আলম্বনং বা।
স্বপ্নজ্ঞান বা নিদ্রাজ্ঞান ভাবনাতেও চিত্ত স্থির হয়।
৩৯ – যথাভি মত ধ্যানাৎ বা।
যেমন যেমন নিজের অভিমত সেই বস্তুতে ধ্যান করলে চিত্ত স্থিত হয়।
৪০ – পরমাণু-পরম-মহত্ত্বন্তঃ অস্য বশীকারঃ
পরমাণু অর্থাৎ সুক্ষ থেকে পরম মহৎ তত্ত্ব অর্থাৎ স্থুল যা কিছুতেই আপনি ধ্যানের মাধ্যমে পৌঁছান তাতেই চিত্ত বশিকার অর্থাৎ পরম বৈরাগ্য লাভ হয়।
৪১ – ক্ষীণবৃত্তেঃ অভিজাতস্য এব মণেঃ গ্রহীতৃ- গ্রহণ – গ্রাহ্যেষু তৎস্থ তদঞ্জনতা সমাপত্তিঃ।
ক্ষীনবৃত্তে অর্থাৎ বৃত্তি যার ক্ষীণ হয়েছে এমন চিত্ত মনি সম স্বচ্ছ। গ্রহীতা, গ্রহণ, ও গ্রাহ্য অর্থাৎ ধ্যেয় বিষয়ের মধ্যে তদঞ্জনতা অর্থাৎ তন্ময়তা বা স্থিতি এসেছে সেটাই সমাপত্তি অর্থাৎ জ্ঞানের সমাধি।
৪২ – তত্র শব্দার্থজ্ঞান বিকল্পৈঃ সংকীর্ণা সবিতর্কা সমাপত্তিঃ।
সেখানে শব্দের যে জ্ঞান, শব্দের বিষয়ের যে জ্ঞান, আর উভয়ের মিশ্রিত যে একত্ত্ব তাকেই সবিতর্কা বলে।
৪৩ – স্মৃতি পরিশুদ্ধৌ স্বরূপ শূন্যে এব অর্থ মাত্র নির্ভাসা নির্বিতর্কা।
স্মৃতি যখন পরিশুদ্ধ হয়ে যায়, স্ব-রূপ অর্থাৎ অহং যখন শুন্য হয় বা বিস্মৃত হয় তখন লক্ষিত বিষয়েই স্থিত হয় – এবং এটাকেই বিতর্করহিত সমাপত্তি বলে।
৪৪ – এতয়া এব সবিচারা নির্বিচারা চ সূক্ষ্ম বিষয়া ব্যাখ্যাতা।
অতয়েব এই ভাবে বিচার দ্বারা নির্বিচারে পৌঁছে সূক্ষ্ম বিষয়ের ব্যাখ্যা করা হল।
৪৫ – সূক্ষ্ম বিষয় ত্বং চ অলিঙ্গ পর্যবসানম।
সূক্ষ্ম বিষয়কে আবার শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করতে হবে।
৪৬ – তা এব সবীজঃ সমাধিঃ।
সেগুলিই সবীজ সমাধি।
৪৭ – নির্বিচার বৈশারদ্যে অধ্যাত্ম প্রসাদঃ।
নির্বিচার-বিশেষ অবস্থায় অধ্যাত্ম প্রসাদ লাভ হয়।
৪৮ – ঋতম্ভরা তত্র প্রজ্ঞা।
যেখানে সত্য প্রতিষ্ঠিত সেখানেই প্রজ্ঞা।
৪৯ – শ্রুত অনুমান প্রজ্ঞাভ্যম অন্য বিষয়া বিশেষ অর্থ ত্বাৎ।
শোনা কথা, অনুমান এই দুটি জ্ঞান থেকে পৃথক, কারন তার বিশেষ অর্থ রয়েছে।
৫০ – তজ্জঃ সংস্কারঃ অন্য সংস্কার প্রতিবন্ধী।
সেই সংস্কার অন্য সংস্কারের প্রতিবন্ধী।
৫১ – তস্যাপি নিরোধে সর্ব নিরোধাৎ নির্বীজঃ সমাধিঃ।
তারও নিরোধে, সবকিছুর নিরোধে নির্বীজ সমাধি।

