এইদিন ওয়েবডেস্ক,বাঁকুড়া,২৬ ফেব্রুয়ারী : টেরাকোটা ও পাথরের মন্দিরের জন্য বিখ্যাত বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর৷ সেই বিষ্ণুপুরের মল্লেশ্বর মন্দির সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৫০ বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা বাবা জল্লেশ্বর মহাদেবের একটি প্রাচীন শিব মন্দির খুঁড়ে বের করেছেন স্থানীয় ও ক্লাবের সদস্য ও মল্লেশ্বর গাজন কমিটির যুবকরা । এই মন্দিরটি উদ্ধারের লক্ষ্যে বেশ কয়েকদিন ধরেই স্থানীয় যুবকরা খননকাজ চালাচ্ছিলেন। অবশেষে গত রবিবার বিকেলে তাঁরা সাফল্যের মুখ দেখেন। মাকড়া পাথরের সিঁড়ি সহ ইটের তৈরি মন্দির এবং শিবলিঙ্গ বের করতে সমর্থ হন তারা । দীর্ঘ ৫০ বছর বাদে জলেশ্বর বাবার দর্শন পেতে এদিন প্রচুর মানুষ ভিড় জমায়। কাদা সরিয়ে দুধ ও জল দিয়ে শিবলিঙ্গ স্নান করানো হয়। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার বিষ্ণুপুর সার্কেলের আধিকারিক সন্দীপ সিংহ বলেন, এএসআইয়ের অধীনে থাকা মল্লেশ্বর মন্দিরের কাছে অবৈজ্ঞানিকভাবে খোঁড়াখুঁড়ির খবর পেয়ে আমরা নোটিস পাঠিয়েছিলাম। সেখানে একটি শিবলিঙ্গ পাওয়া গিয়েছে বলে শুনেছি। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দেখছি।
এদিকে বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁ মন্দিরটি পুনঃনির্মাণের দাবিতে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া(এএসআই)-কে চিঠি লিখেছেন । বুধবার(২৫ ফেব্রুয়ারী) পাঠানো চিঠিতে বিজেপি সাংসদ দাবি জানিয়েছেন,’লোকসভার একজন সংসদ সদস্য হিসেবে, আমি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য লিখছি, সম্প্রতি বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে ঐতিহাসিক মল্লেশ্বর মন্দিরের কাছে একটি প্রাচীন শিব মন্দির বাবা জলেশ্বরের আবিষ্কারের দিকে। মন্দিরটি, যা প্রায় ১১৯ বছর আগে মল্ল যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ঐতিহ্যগতভাবে সেবাইত ভট্টাচার্য পরিবারের অধীনে পূজা করা হত, কয়েক দশক ধরে পলি এবং বৃষ্টিপাতের কারণে ধীরে ধীরে মাটির নিচে চলে গিয়েছিল।
২০২৬ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারী স্থানীয় বাসিন্দারা এবং মল্লেশ্বর গাজন কমিটি এই স্থানে একটি প্রাচীন কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ সহ একটি শিব লিঙ্গ আবিষ্কার করে। যদিও সম্প্রদায়টি প্রার্থনা শুরু করেছে, ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কর্তৃক আরোপিত বিধিনিষেধের ফলে আরও কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে গেছে। এই বিষয়ে, আমি সম্মানের সাথে ASI-কে অনুরোধ করছি যে তারা দয়া করে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করুন :
স্থানটির একটি বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা,স্থানটির বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা যা এটি স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রকৃত সাংস্কৃতিক অনুভূতির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি কাঠামোর ঐতিহাসিক অখণ্ডতা রক্ষা করতে সহায়তা করবে। ASI যদি ঐতিহ্যবাহী নিয়ম অনুসারে বাবা জলেশ্বর মন্দিরের সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধারের সুবিধা প্রদানের কথা বিবেচনা করে তবে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। এই বিষয়ে যে কোনও সহায়তার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ থাকব।’
বিষ্ণুপুরের ঐতিহাসিক মল্লেশ্বর মন্দিরের ঠিক পাশেই রয়েছে এই প্রাচীন মন্দিরটি । এলাকার প্রবীণদের মুখে এই মন্দিরের কথা শুনেছিলেন স্থানীয় যুবকরা। সেই সূত্র ধরেই গত কয়েকদিন ধরে চলে খনন কাজ। প্রায় ১০ ফুট মাটির নিচে পাওয়া যায় ইটের তৈরি মন্দির, মাকড়া পাথরের সিঁড়ি এবং একটি শিবলিঙ্গ। সঙ্গে মিলেছে একটি পাথরের মূর্তিও। শোনা যায়, মল্লরাজ বীর হাম্বির এই মন্দিরের সেবাকার্যের জন্য বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসেছিলেন। যেহেতু ‘জলেশ্বর’ (জলের অধিপতি), তাই মন্দিরটি সমতল থেকে অনেকটাই নিচে অবস্থিত ছিল।স্থানীয় প্রবীন বাসিন্দাদের দাবি, মন্দিরটি ১৭শ শতকে মল্ল রাজাদের আমলে নির্মিত। এই মন্দির নির্মাণ করেন মল্লরাজা দুর্জন সিংহ (প্রায় ১৬২২ খ্রিষ্টাব্দে)। মল্ল রাজারা শিল্প, সঙ্গীত ও ধর্মীয় স্থাপত্যের বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁদের আমলেই বিষ্ণুপুরে বহু বিখ্যাত মন্দির গড়ে ওঠে।মল্লেশ্বর মূলত ভগবান শিবের মন্দির। প্রতি বছর মহাশিবরাত্রিতে এখানে বহু ভক্তের সমাগম হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর মহাদেবকে ফিরে পেয়ে আনন্দাশ্রু স্থানীয়দের চোখে। কাদা সরিয়ে দুধ ও জল দিয়ে মহাদেবকে স্নান করানো হয়েছে। উপচে পড়ছে মানুষের ভিড়। যদিও খনন কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন,মল্লরাজ বীরহান্বির আমাদের পূর্বপুরুষকে মন্দিরের সেবাকার্যের জন্য বাইরে থেকে এনেছিলেন। ঐতিহাসিক মল্লেশ্বর মন্দিরের পাশেই জলেশ্বর মন্দির। স্থাপন করা হয়েছিল। প্রভু জলে থাকেন বলে মন্দিরটিও সমতল থেকে বেশ কিছুটা নীচুতে অবস্থিত। একসময় এখানে গাজন উৎসব হত। পরবর্তীকালে কোনো দুষ্ট চক্র পুরনো বাড়ির ভাঙা ইট-পাথর এখানে ফেলে দিয়ে চলে যায়। মন্দিরটি ক্রমশ পুরোপুরি মাটির তলায় চলে যায়। এখন স্থানীয়রা ফের নতুন করে মাটি খুঁড়ে জলেশ্বরকে বের করছেন। এতে আমরা খুব খুশি। তবে অর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ মন্দিরটি সংরক্ষণ ও সংস্কার করলে ভালো হবে।
এলাকার আরও এক প্রবীণ বাসিন্দা অজিত সূত্রধর বলেন,আমি ছোটবেলায় বাবা জলেশ্বরকে পুজো দিয়েছি। ৫০বছর পরও সেই স্মৃতি জ্বলজ্বল করছে। নবীন প্রজন্মের ছেলেরা প্রথমে সেকথা বিশ্বাস করতে চায়নি। পরে আরও কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বলে ওরা নিশ্চিত হয়। এরপরই মন্দির উদ্ধারের লক্ষ্যে মাটি খোঁড়া শুরু হয়। এলাকার বাসিন্দারা জানান, তাঁরা ছোটোবেলা থেকে এখানে খেলাধুলো করে এসেছেন। কিন্তু, এখানেই যে মাটির নীচে মন্দির রয়েছে, সেকথা বিশ্বাস করেননি। পরে অনেক প্রবীণ ব্যক্তির কাছ থেকে একই কথা শোনার পর তাঁরা সবাই মিলে মাটি খুঁড়ে বাবা জলেশ্বরকে বের করার সিদ্ধান্ত নেন। সেইমতো কয়েকদিন ধরে খননকাজ চলছে। রবিবার সকাল থেকে পুরোদমে মাটি খোঁড়া শুরু হয়। তাতেই আস্ত মন্দির বেরিয়ে আসে। এই মন্দিরে চারটি দরজা রয়েছে। সমতল থেকে অন্তত ১০ফুট নীচে মন্দিরের ভিতরে জলেশ্বর। শিবলিঙ্গ মিলেছে। সেইসঙ্গে পাথরের একটি। মূর্তিও বেরিয়েছে। নীচে নামার জন্য মাকড়া পাথরের তৈরি কয়েকটি ধাপ রয়েছে। সবটাই মাটির নীচে ছিল। ৫০বছর বাদে দেবতাকে মাটির তলা থেকে উদ্ধার করতে পেরে স্থানীয়রা নিজেদের ধন্য মনে করছেন।।
