এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,০১ ফেব্রুয়ারী : গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারী), কলকাতার পার্ক স্ট্রিট এলাকার একটি সুপরিচিত রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের সঙ্গে নৈশভোজ সারতে গিয়ে একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে অভিনেতা সায়ক চক্রবর্তীকে (Sayak Chakraborty) । সায়ক একটি ভিডিও প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন যে খাসির মাংস অর্ডার দেওয়া সত্ত্বেও গরুর মাংসের স্টেক পরিবেশন করা হয়েছে তাঁদের । পরে এনিয়ে তিনি পার্কস্ট্রিট থানায় এফআইআর দায়ের করেছিলেন। তার ভিত্তিতেই শনিবার গ্রেপ্তার করা হয় গোমাংসের স্টেক পরিবেশন করা রেস্তোরাঁর ওই বেয়ারাকে । পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতের নাম শেখ নাসির উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ২৯৯ ধারায় (কোনও শ্রেণির ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে ইচ্ছাকৃত আঘাত করা) মামলা রুজু করা হয়েছে ।
এদিকে সিপিএমের নেতা সুজন চক্রবর্তী একটা অদ্ভুত দাবি করেছেন । তার দাবি যে পার্কস্ট্রিটের রেস্তোরাঁর “গোমাং বিতর্ক” নাকি বিজেপি ও আরএসএস-এর সৃষ্টি । রেস্তোরাঁর ওই “গরীব” বেয়ারাকে গ্রেপ্তার করায় তার চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি সুজন চক্রবর্তী অভিযোগকারীকেও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন । সেই সাথে বিজেপি ও আরএসএস-এর “পাতা ফাঁদে পা দেওয়ায়” তিনি তৃণমূলেরও সমালোচনা করেছেন ।একটা ভিডিও বার্তায় সুজন চক্রবর্তী বলেছেন,’পার্ক স্ট্রিটের রেস্টুরেন্টের ঘটনা, তাকে নিয়ে যা চলছে বা হয়েছে,এতো লজ্জার কোনো সীমা থাকবে না । ভয়ংকর । বোঝা যাচ্ছে যে ভোট এগিয়ে আসছে । এতদিন পর্যন্ত বিভাজন বা হিংসা মিডিয়াকে দিয়ে করাচ্ছিল । কিন্তু এখন এই ব্লগারদেরকে ব্যবহার করে এই অসভ্যতার রাজনীতি, তাও করে ? তাও করবে ?’
সিপিএমের ওই বর্ষীয়ান নেতা বলেন,’যিনি অভিযোগ করছেন সায়ক সম্ভবত নাম নাকি, তিনি বিফ স্টেক খেয়েছেন । এক ঘন্টা ধরে খেয়েছেন বোঝেননি ? এক ঘন্টা ধরে খেয়েছেন । এর আগে তিনি অনেকবার বিফ খেয়েছেন । তখন তার মনে পড়েনি ? এখন ঘন্টাখানেক পড়তে আর মনে হল যে মাংস পরিবেশন করছে সে মুসলমান এবং তাকে শুয়োরের মাংস খেতে হবে । এবং তারপর তাকে নিয়ে একদম বাজার গরম করে দেওয়া ? এটা বোঝা গেল বিজেপি করছে, আরএসএস করছে । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারও সেই ফাঁদে পা দিয়ে কাজ করছে । বিজেপির স্বার্থ রক্ষা করার জন্য,ভাগাভাগি করার জন্য অ্যারেস্ট করলো? সায়ককে তো অ্যারেস্ট করলো না । করলো তো ওই ছেলেটিকে । ওই ছেলেটি গরিব ছেলে ওয়েটার । ওর চাকরি চলে গেলে দায়িত্ব কে নেবে? কি হচ্ছে এগুলো ? কোথায় যাচ্ছি আমরা? ওই ব্রিগেডে৷ নাকি চিকেন প্যাটিস খাইয়েছে । ব্যাস হয়ে গেল, বাজার গরম? তার কাজ চলে গেল । আজকে কলকাতায় আসতে পারবে না ?’
সুজন চক্রবর্তী আরো বলেন,’উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির কালো ছায়া । আরএসএসের রাজনীতির বিভাজনের কালো ছায়া । গরিব মানুষকে বিপদে ফেলার রাজনীতির কালো ছায়া । এবং কার্যত ধর্মকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতার একটা ভয়ংকর খেলা ভোট যত এড়িয়ে আসছে ততই এই খেলাটা আরও বাড়ছে । মানুষ পারলে বুঝতে পারছেন,কি ভয়ংকর জায়গায় পশ্চিমবাংলাকে বিজেপি আর তৃণমূল মিলে নিয়ে যাচ্ছে। এর কখনো ক্ষমা হতে পারে না ।’
জানা গেছে,শুক্রবার পার্ক স্ট্রিটের “অলিপাব” নামে ওই রেস্তোরাঁয় দুই বন্ধু অনন্যা গুহ এবং সুকান্ত কুণ্ডুর সাথে খাবার খেতে গিয়েছিলেন টেলিপাড়ার সেলেব ইনফ্লুয়েন্সার সায়ক চক্রবর্তী । মাটন স্টেক অর্ডার করেছিলেন তাঁরা । সায়কের কথায়, “ওয়েটার খাবার পরিবেশন করার পর প্রথমটায় খিদের পেটে না বুঝে খেয়ে ফেলেছিলাম। তবে উনি আরেকটা স্টেকের প্লেট এনে আমাদের টেবিলে রাখাতে আমরা বিষয়টা বুঝতে পারি। অনেকেই বলছেন, পুরো প্লেট শেষ করে আমরা প্রতিবাদ করেছি, ব্যাপারটা সেটা নয়। আমি এবং অনন্যা শুধু চেখে দেখছিলাম। এর মাঝেই উনি আমাদের টেবিলে মাটনের পদ রেখে যান। অথচ আমরা একটাই স্টেক অর্ডার করেছিলাম। তখনই ওই বেয়ারাকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বলেন, আমরা নাকি ২টো স্টেকের পদ অর্ডার করেছি। একটা মাটন আরেকটা বিফ! সেসময়ে আমি প্রতিবাদ করি। অজান্তে গরুর মাংস খাওয়ায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম।’
ফেসবুক লাইভে গোটা ঘটনার বিবরণ দিয়ে সায়ক চক্রবর্তী বলেছিলেন,’আমরা পার্ক স্ট্রিটের একটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁয় ছিলাম। আমরা মাটন স্টেক অর্ডার করেছিলাম, কিন্তু তাদের গরুর মাংস পরিবেশন করা হয়েছিল। আমরা জানতাম না যে এটি গরুর মাংস। আমরা মাটন ভেবে খেয়েছিলাম। যখন আমরা বুঝতে পারলাম, তখন আমরা তাদের ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কি জানো আমি একজন ব্রাহ্মণ?’ তারপর তিনি ওয়েটারের কাছে তার ধর্ম জিজ্ঞাসা করলেন। ওয়েটারের পরিচয় যখন তিনি নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিলেন, তখন সায়ক চক্রবর্তী জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি যদি তোমাকে শুয়োরের মাংস পরিবেশন করি, তাহলে তুমি কি খাবে? তুমি আমাদের গরু খাইয়েছো।”
বিতর্ক আরও তীব্র হতে থাকলে, ওয়েটার অভিনেতার কাছে ক্ষমা চান, কিন্তু হট্টগোল থামেনি। সায়ক জানিয়েছেন, যখন তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করেন, তখন তাকে হাসতে দেখা যায়। চক্রবর্তী এটিকে একটি গুরুতর বিষয় বলে জিজ্ঞাসা করেন, “এটা কি সবই রসিকতা?” অন্যদিকে তার বন্ধু অনন্যা গুহ বলেন, “এটা কোনও হাসির বিষয় নয়।’ সায়ক চক্রবর্তী জানতে চান যে ওয়েটার ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে গরুর মাংস পরিবেশন করেছেন কিনা। বর্তমানে, এই ঘটনা সম্পর্কে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করা হয়নি। তবে গোমাংসের স্টেক পরিবেশন করা পাবের ওই বেয়ারার বিরুদ্ধে যে ধারায় মামলা রজু করেছে পুলিশ, তাতে তাকে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের মুখোমুখি হতে পারে ।।

