এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,৩১ জানুয়ারী : শুক্রবার নবান্ন বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাজ্যের একাধিক শীর্ষ পুলিশকর্তার বদলির কথা জানিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি । সেই তালিকায় যেমন বিভিন্ন কমিশনারেটের সিপি-রা আছেন, তেমনই রয়েছেন ডিজি (অগ্নি) এবং ডিজি (হোমগার্ড)। তাদের মধ্যে এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) থেকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদে নিয়োগ পাওয়া সুপ্রতিম সরকারকে নিয়ে সিঁদূরে মেঘ দেখছেন হিন্দুত্ববাদীরা । এনিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতারা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ।
হিন্দু সমিতির সভাপতি শান্তনু সিনহা নিজের ফেসবুক পেজে লিখেছেন,’যতদূর জেনেছি, উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান । আমার পূর্বপুরুষের মতো এনার পূর্বপুরুষও মুসলমানদের “আয় সকলে হিন্দু মারি – আল্লাহকে খুশি করি”র লাথি ঝাঁটা খেয়ে পশ্চিমবঙ্গ নামক এক “হিন্দু হোমল্যান্ড” এ পালিয়ে এসেছিলেন। উদ্বাস্তু হওয়া মানুষের দুঃখ বেদনা নিয়েই বড় হয়েছেন আমাদের নতুন পুলিশ কমিশনার । আশা করি, কোন অবস্থাতেই পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশ হতে দেবেন না ।’
পাশাপাশি বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালও একটা বড়সড় পোস্ট করেছেন ৷ “সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রাম: বিশ্বাসভঙ্গের দুই অধ্যায়” শীর্ষক শিরোনামের একটি পোস্টে অগ্নিমিত্রা পাল লিখেছেন,’সিঙ্গুরের মানুষের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, তিনি পরিকল্পিতভাবে তাঁদের ব্যবহার করেছেন। আন্দোলনের দিনগুলোয় সিঙ্গুর ছিল তাঁর রাজনৈতিক শক্তির প্রধান ভরকেন্দ্র। সেই মাটি থেকেই তিনি ক্ষমতার সিঁড়ি বানিয়েছিলেন। অথচ ক্ষমতায় বসার পর সেই মাটিকেই তিনি অনাথ করে দিয়েছেন। আজ সিঙ্গুরে না আছে কৃষির নিশ্চয়তা, না আছে শিল্পের ভবিষ্যৎ।আছে শুধু প্রতিশ্রুতি ভাঙার দীর্ঘশ্বাস।’
তিনি লিখেছেন,’নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রেও ছবিটা আলাদা নয়। সেখানেও মানুষের রক্ত, ভয় আর লড়াই ছিল রাজনীতির পুঁজি। ক্ষমতায় আসার আগে যাঁরা গুলি চালিয়েছিলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন গলা ফাটিয়ে বলেছিলেন—এই অফিসারদের তিনি শাস্তি দেবেন। ক্ষমতায় এসে সেই শাস্তির বদলে দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আর রাজনৈতিক আশ্রয় ।’ এরপর অগ্নিমিত্রা লিখেছেন,’সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় হুগলি জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে সুপ্রতিম সরকার চাষীদের ওপর দমননীতি চালিয়েছিলেন। জমি রক্ষা করতে নামা কৃষকদের উপর মামলা, লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার—কিছুই বাদ যায়নি। মহিলাদেরও প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়েছিল। সেই অফিসারকে আজ কলকাতার পুলিশ কমিশনার করা মানে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটা একটি রাজনৈতিক বার্তা—দমনকারীরাই এখানে পুরস্কৃত হন।’
সিঙ্গুরের ‘রক্তাক্ত’ ইতিহাস তুলে ধরে তিনি লিখেছেন,’সিঙ্গুরের সেই দমনপর্বের মতোই রক্তাক্ত অধ্যায় লেখা হয়েছিল নন্দীগ্রামে। ২০০৭ সালে গুলি চলেছিল নিরস্ত্র মানুষের ওপর। নন্দীগ্রামের মাটি সেদিন ভিজেছিল মানুষের রক্তে। সেখানেও রাষ্ট্রের ভাষা ছিল একটাই—দমন। নন্দীগ্রামের গুলি চালনার ঘটনায় যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তদন্তে যাঁদের নাম এসেছিল—তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন আইজি অরুণ গুপ্তা, ডিআইজি এন রমেশ বাবু, অ্যাডিশনাল এসপি সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাশিস বোরাল, নন্দীগ্রাম থানার ওসি শেখর রায়। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম—দুটো ক্ষেত্রেই এই অফিসারদের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে উঠেছিল।’
‘সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—ক্ষমতায় এলে এই দমনকারীদের শাস্তি দেবেন। এই দুই আন্দোলনই ছিল তাঁর রাজনীতির প্রধান অস্ত্র। সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রাম ছাড়া তাঁর সেই উত্থান কল্পনাই করা যায় না।
কিন্তু ক্ষমতায় এসে ছবিটা বদলে গেল। যাঁদের শাস্তির কথা বলা হয়েছিল, তাঁদের অনেকেই পেলেন পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দমনকারীরা পুরস্কৃত হলেন, আর যাঁরা আন্দোলনে নেমেছিলেন, তাঁরা পড়ে রইলেন বিস্মৃতির অন্ধকারে।’
সবশেষে বিজেপি বিধায়ক লিখেছেন,’সিঙ্গুরে না ফিরল কৃষি, না এল শিল্প। নন্দীগ্রামেও মানুষের ক্ষত শুকোয়নি। আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি রয়ে গেল বক্তৃতায়, পোস্টারে, স্মৃতিচারণে। বাস্তবে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম হয়ে উঠল ব্যবহৃত রাজনীতির নিদর্শন।
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের মানুষের লড়াই তাই আজ ইতিহাসের পাতায় চাপা পড়ে যাচ্ছে, আর অত্যাচারের চরিত্ররা উঠে আসছেন ক্ষমতার আলোয়।এটাই এই শাসনের সবচেয়ে বড়ো সত্য।মানুষ বদলায় না, ইতিহাস বদলায় না। শুধু বদলায় শাসকের মুখ আর ভাষা।’
এদিকে কলকাতা পুলিশের কমিশনার পদ থেকে সরিয়ে মনোজ বর্মাকে দেওয়া হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী মমতার নিরাপত্তার দায়িত্ব (ডিরেক্টর, সিকিউরিটি)। এই মনোজ বর্মার বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ তুলেছিল বিজেপি । রদবদল করা অনান্য পুলিশ আধিকারিকদের মধ্যে এডিজি (এসটিএফ) হলেন জাভেদ শামিম। তিনি ছিলেন এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) পদে। তাঁর জায়গায় আনা হয়েছে কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন কমিশনার বিনীত গোয়েলকে। বিনীত ছিলেন এডিজি (এসটিএফ)। আরজি কর কাণ্ডের পর বিনীতকে ওই পদে নিয়ে আসা হয় । আরজি করের ‘অভয়া’র কথা উঠলে আজও বিনীত গোয়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন সাধারণ মানুষ ।।

