হিমালয় বিশ্বের নবীনতম পর্বতমালা। হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি পর্বতমালা । কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়নের কারনে হিমালয় এক সংকটময় পর্যায়ে পৌঁছেছে । ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ICIMOD)-এর তথ্য অনুযায়ী, হিন্দুকুশ হিমালয় জুড়ে হিমবাহগুলো (Himalayan Glaciers) উদ্বেগজনক হারে গলে যাচ্ছে । বিশ্ব হিমবাহ দিবস উপলক্ষে শনিবার প্রকাশিত দুটি নতুন প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০০ সাল থেকে বরফ ক্ষয়ের হার দ্বিগুণ হয়েছে এবং ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে মোট হিমবাহের আয়তন ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। হিমালয় পর্বতমালায় গত ৫০ বছরে ছয়তলা ভবনের সমান বরফ গলে গেছে৷ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক হিমবাহ, বিশেষ করে পূর্ব হিমালয়ের হিমবাহগুলো, ক্রমবর্ধমান হারে তাদের হিমাবহ হারাচ্ছে, যা জলপ্রবাহের ধরন পরিবর্তন করছে এবং হিমবাহ হ্রদের সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে । নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো ২০০০ সালের আগের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে গলছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি এই অঞ্চলের গলিত জলের উপর নির্ভরশীল ২০০ কোটিরও বেশি মানুষের জল সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলছে।
‘হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহের পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি (১৯৯০-২০২০)’ এবং ‘এইচকেএইচ হিমবাহ পূর্বাভাস ২০২৬’ (Changing Dynamics of Glaciers in the Hindu Kush Himalaya Region (1990– 2020) and HKH Glacier Outlook 2026) শীর্ষক প্রতিবেদন দুটি ১৯৭৫ সাল থেকে বরফের ঘনত্ব ২৭ মিটার পর্যন্ত নাটকীয় হ্রাসকে তুলে ধরেছে, যা এই অঞ্চলে দ্রুত অবনতিশীল জলবায়ু সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরিস্থিতিটিকে “বাস্তব সময়ে উন্মোচিত হওয়া একটি সংকট” হিসেবে বর্ণনা করে আইসিআইএমওডি-র মহাপরিচালক পেমা গিয়ামৎশো সতর্ক করেছেন যে, বরফ ক্ষয়ের এই ত্বরণ একটি সতর্কবার্তা হিসেবে ধরে কাজ করা উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই অঞ্চলটি একটি সংকটপূর্ণ দশকে প্রবেশ করছে, যেখানে জলের অভাব থেকে শুরু করে ভয়াবহ বন্যা পর্যন্ত বিভিন্ন ঝুঁকি বাড়ছে।
হিমালয় পর্বতমালা, যেখানে মেরু অঞ্চলের বাইরে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বরফ রয়েছে, তা এশিয়ার অন্তত দশটি প্রধান নদী ব্যবস্থার উৎস এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনধারণের জোগান দেয়। তবে, ৪,৫০০ থেকে ৬,০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত প্রায় ৭৮ শতাংশ হিমবাহ এলাকা এখন উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, এই অঞ্চল জুড়ে হিমবাহের ক্ষয় অসম। পূর্ব হেংদুয়ান শান পর্বতমালায় শতাংশের হিসাবে সর্বোচ্চ ক্ষয় রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে কিছু এলাকায় তিন দশকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত হিমবাহের আচ্ছাদন বিলীন হয়ে গেছে। অন্যদিকে, সিন্ধু, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় সবচেয়ে বেশি পরম ক্ষয় লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে এই অঞ্চলের ৭৪ শতাংশেরও বেশি হিমবাহ কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা একটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ ঘাটতির কথাও তুলে ধরেছেন। বর্তমানে অধ্যয়নাধীন ৩৮টি হিমবাহের মধ্যে মাত্র সাতটি ওয়ার্ল্ড গ্লেসিয়ার মনিটরিং সার্ভিস কর্তৃক নির্ধারিত বৈশ্বিক মান পূরণ করে। কারাকোরাম, সিকিম, জান্সকার এবং ভুটানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো মূলত পর্যবেক্ষণের বাইরেই রয়ে গেছে। প্রধান লেখক সুদান মহারজনের মতে, ছোট হিমবাহগুলো—অর্থাৎ যেগুলোর আয়তন ০.৫ বর্গ কিলোমিটারের কম—বড়গুলোর চেয়ে দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, যা পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জন্য জল সংকটের তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করছে এবং হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল হিমমণ্ডলের কারণে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি প্রশমিত করতে হিমবাহ পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ,গবেষণা পদ্ধতির মানসম্মতকরণ এবং জলবায়ু অভিযোজন কৌশলে বিনিয়োগের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর আইসিআইএমওডি বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছেন।
প্রতিবেদনটিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “বিপদ আর দূরে নেই—আমরা ঝুঁকির দ্রুত বৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করছি,” যা এশিয়া জুড়ে জল, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর এর সুদূরপ্রসারী পরিণতির ওপর গুরুত্বারোপ করে।।
