এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,২১ জানুয়ারী : ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের(এস আই আর) কাজ শুরু হতেই প্রবল বিরোধিতায় নেমেছে এরাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস । এস আই আর শুনানিকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও হিংসাত্মক বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে ৷ বিরোধিতায় যোগ দিয়েছে সিপিএম ও কংগ্রেসও । বিশেষ করে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ (Logical Discrepancy) বা যুক্তিগত গরমিল সম্বলিত ভোটারদের নোটিশ দেওয়ার প্রবল বিরোধিতা করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি । কিন্তু সুপ্রিমকোর্টে নির্বাচন কমিশনের দাখিল করা এক হলফনামায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় যে অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে তা চমকে দেওয়ার মত । ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী আসানসোল জেলার বারাবানি বিধানসভা কেন্দ্র (নম্বর ২৮৩)-এ এক ব্যক্তিকে মোট ৩৮৯ জন ভোটারের বাবা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে । শুধু একটা নয়, ৩০০-এর অধিক সন্তানের জনকের সন্ধান আরও আছে ।
বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা তাপস রায় বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরে মন্তব্য করেছেন যে ‘ভোটার তালিকায় ভয়াবহ অনিয়মের পর্দাফাঁস হয়েছে’ বলেই মমতা ব্যানার্জি ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’-এর এত বিরোধিতা করছেন৷ তিনি লিখেছেন,মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেস কেন “Logical Discrepancy” চিহ্নিত ভোটারদের নোটিস দেওয়ার বিরোধিতা করছে ? উত্তর এখানেই ।’ তিনি লিখেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দাখিল করা এক হলফনামায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় ভয়াবহ অনিয়মের পর্দাফাঁস হয়েছে। বিধানসভা কেন্দ্র ২৮৩ (বারাবনি, আসানসোল জেলা)-তে একজন ব্যক্তিকে ৩৮৯ জন ভোটারের বাবা হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিধানসভা কেন্দ্র ১৬৯ (বালি, হাওড়া জেলা)-তে আরেকজনকে ৩১০ জন ভোটারের বাবা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।হলফনামায় আরও যে তথ্য উঠে এসেছে— ৭ জন ব্যক্তিকে ১০০ জনের বেশি ভোটারের অভিভাবক হিসেবে দেখানো হয়েছে । ১০ জনকে ৫০ জন বা তার বেশি ভোটারের অভিভাবক বলা হয়েছে । আরও ১০ জনকে ৪০ জনের বেশি ভোটারের অভিভাবক। ১৪ জনকে ৩০ জনের বেশি ভোটারের অভিভাবক । ৫০ জনকে ২০ জনের বেশি ভোটারের অভিভাবক । ৮,৬৮২ জনকে ১০ জনের বেশি ভোটারের অভিভাবক।
২,০৬,০৫৬ জনকে ৬ জনের বেশি ভোটারের অভিভাবক৷ ৪,৫৯,০৫৪ জনকে ৫ জনের বেশি ভোটারের অভিভাবক হিসেবে দেখানো হয়েছে । এবার বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করুন। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (২০১৯–২১) অনুযায়ী, ভারতে গড় পারিবারিক সদস্য সংখ্যা মাত্র ৪.৪।’
এরপর তিনি লিখেছেন,’এই পরিসংখ্যান কোনো “কেরানিগত ভুল” নয়। এগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে ভোটার তালিকায় ভুয়ো, নকল ও অবৈধ নাম ঢুকিয়ে একটি সংগঠিত কারসাজি করা হয়েছে।এতেই বোঝা যায় আতঙ্কের কারণ।এই ফুলে-ফেঁপে ওঠা, জাল ভোটার তালিকা থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল ভোটব্যাঙ্ক তৈরি হয়েছে। প্রকৃত যাচাই শুরু হলে সেই সাজানো অঙ্ক ভেঙে পড়বে। এই কারণেই তৃণমূল যাচাই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে। এই কারণেই তারা চায় না এই নামগুলো ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ুক। কারণ পরিষ্কার ভোটার তালিকা মানেই তাদের কৃত্রিম ম্যান্ডেটের অবসান।’
বারাবানি বিধানসভার মতই হাওড়া জেলার বালি বিধানসভা কেন্দ্র (নম্বর ১৬৯)-এ, যেখানে এক ব্যক্তির নাম রয়েছে ৩১০ জন ভোটারের বাবার জায়গায়। নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চের সামনে এই ধরনের বেশ কিছু ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা যুক্তিগত গরমিল তুলে ধরে কেন নোটিশ করা জরুরি হয়ে পড়েছে তা ব্যাখ্যা করেছে । নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী বেঞ্চের কাছে জানিয়েছেন,এগুলি সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট ভোটারদের নোটিস পাঠানো হয়েছে এবং সঠিক তথ্য প্রমাণ করার দায়িত্ব ভোটারদেরই। তিনি আরও জানিয়েছেন যে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (২০১৯-২১) অনুযায়ী, ভারতে গড় পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৪.৪। অর্থাৎ সাধারণত একটি পরিবারে ২ থেকে ৩ জন সন্তান থাকার কথাই স্বাভাবিক। সেখানে কোনও কোনও ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির সঙ্গে ৫০ জনেরও বেশি ভোটারের নাম যুক্ত থাকা স্বাভাবিক নয় এবং তা গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।এই কারণেই কমিশনের সিদ্ধান্ত, যেখানে ছয় জন বা তার বেশি ভোটার একই অভিভাবকের সঙ্গে যুক্ত, সেই সব ক্ষেত্রকে বিশেষ নজরে রেখে যাচাই করা হবে।
শুধু অভিভাবকের সংখ্যার গরমিলই নয়, আরও চার ধরনের ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের ভোটার তালিকার নামের সঙ্গে ২০০২ সালের এস আই আর তালিকার নামের অমিল, ভোটারের বয়স ও অভিভাবকের বয়সের পার্থক্য ১৫ বছরের কম হওয়া, আবার ৫০ বছরের বেশি হওয়া, কিংবা ভোটারের সঙ্গে দাদু-দিদার বয়সের পার্থক্য ৪০ বছরের কম হওয়া। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যে তৃণমূল কংগ্রেস নয় ফের ক্ষমতায় আসতে ভুয়ো ভোটার রেখে দিতে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ ) বা যুক্তিগত গরমিল সম্বলিত ভোটারদের নোটিশ দেওয়ার বিরোধিতা করছে, কিন্তু সিপিএম আর কংগ্রেস কেন এর বিরোধিতা করছে ? তৃণমূলকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে নাকি গরমিল সম্বলিত ভোটারদের ভাগ তারাও পায় ? এর উত্তর অবশ্য অজানা ।।

