উগান্ডার সামরিক শাসক ইদি আমিন (১৯২৪/১৯২৮–২০০৩) ছিলেন ১৯৭০-এর দশকের অন্যতম কুখ্যাত ও নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক, যিনি ১৯৭১ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। ‘উগান্ডার কসাই’ হিসেবে পরিচিত আমিনের শাসনকালে জাতিগত নিধন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অর্থনৈতিক পতনে ১ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ নিহত হয় । এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিল্টন ওবোতেকে অস্ত্রের বলে হঠিয়ে তিনি ক্ষমতা দখল করেন ।
এটাও জানা জরুরি যে,ইদি আমিন ক্ষমতায় এসেই ১৯৭২ সালে উগান্ডা থেকে অবিলম্বে সকল ভারতীয় নাগরিককে দেশ ছেড়ে যাওয়ার আদেশ দেন । যেকারণে ভারতীয় বংশভূতদের সবকিছু ফেলে রাতারাতি পালাতে হয়, যা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয় ।
সেই সময় উগান্ডায় কেবল দুটি ভারতীয় গোষ্ঠী বাস করত: গুজরাটি এবং পাঞ্জাবি। উগান্ডার মোট ভারতীয় জনসংখ্যার মধ্যে গুজরাটিরা ছিল ৯০% এবং পাঞ্জাবিরা ১০%। তাদের অবিলম্বে আদেশ দেওয়া হয় যে, উগান্ডা ত্যাগকারী ভারতীয়রা কেবল তিন জোড়া পোশাক সঙ্গে নিতে পারবে; এর বাইরে আর কিছুই নেওয়ার অনুমতি ছিল না। উগান্ডা ছাড়ার আগে প্রতিটি বিমানবন্দর এবং বাস স্টেশনে লোকজনকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি করা হতো।
এবং এক নিমেষে, প্রায় ৮ লক্ষ ভারতীয়কে তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়, এমন একটি দেশ থেকে যেখানে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কঠোর পরিশ্রম করে হাজার হাজার একর জুড়ে খামার গড়ে তুলেছিল। তারা সম্পদ সঞ্চয় করেছিল, বিলাসবহুল ভিলা তৈরি করেছিল এবং সিমেন্ট, লোহা ও তামা উৎপাদনকারী বড় বড় কারখানা স্থাপন করেছিল, কিন্তু তাদের সবকিছু ত্যাগ করে উগান্ডা ছেড়ে যেতে হয়েছিল।
কিন্তু এটাও জেনে রাখা দরকার যে তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী । যাকে “লৌহমানবী” হিসাবে তুলে ধরে তার দল কংগ্রেস ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিল সেই সময় । কিন্তু কংগ্রেস পার্টির এই কথিত লৌহমানবী তখন চুপ ছিলেন । তবে শুধু দিল্লিতেই নয়,বরঞ্চ পাঞ্জাব ও গুজরাটেও কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু উগান্ডার মতো একটি ছোট্ট দেশের সামনে কংগ্রেসের কথিত “লৌহমানবী” একটি কথাও উচ্চারণ করেননি। তিনি কোনো বিবৃতিও দেননি, কিংবা উগান্ডার সঙ্গে কোনো আলোচনাও করেননি, যদিও সেই সময়ে ব্রিটেন ভারতীয়দের সাহায্য করেছিল। কারণ তারা বিশ্বাস করত যে ব্রিটিশরাই তাদের উগান্ডায় নিয়ে গিয়েছিল এবং উগান্ডা তখন একটি ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল।
সেই সময় ব্রিটেন তার নৈতিক কর্তব্যের কথা স্মরণ করেছিল: যদি এই লোকেরা আমাদের কারণে এখানে এসে থাকে, তবে তাদের প্রয়োজনের সময় সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য। তাই, ব্রিটেন সেখানে শিবির স্থাপন করে ভারতীয়দের সাহায্য করার পাশাপাশি উগান্ডা ছেড়ে আসা গুজরাটিদের ব্রিটিশ নাগরিকত্বও প্রদান করেছিল। আর আজ, ব্রিটেনে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ গুজরাটি হলেন উগান্ডা থেকে বিতাড়িত গুজরাটিরা।
এছাড়াও, আমেরিকাও ভারতীয়দের অনেক সাহায্য করেছিল এবং ঘোষণা করেছিল যে উগান্ডা থেকে বিতাড়িত ভারতীয়দের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।এবং বিপুল সংখ্যক উগান্ডান গুজরাটি আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে যে কংগ্রেসের লৌহমানবী কেন উগান্ডার মতো একটি ছোট্ট দেশকে ভয় পেয়েছিলেন ? গান্ধী-নেহেরু পরিবারের অনান্য সমস্ত বিতর্কিত বিষয়গুলির মতই এক্ষেত্রেও কংগ্রেসের কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি এযাবৎ ।।
