নরনারী তাদের জীবনের প্রথম প্রেম আর প্রথম চুম্বনের স্মৃতি কখনও ভুলতে পারে না । আপাত দৃষ্টিতে এটা নিছক প্রেমের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ । কিন্তু আপনি শুনলে অবাক হয়ে যাবেন যে গভীর আবেগের মুহুর্তে প্রেমিক যুগলের ঠোঁটে ঠোঁটে উষ্ণ ছোঁয়া নিছক মানবীয় প্রেমের অনুভূতি নয়,এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে রসায়ন…প্রকৃতির সৃষ্টি এক অনন্য বিজ্ঞান । চুম্বন কেবল ভালোবাসার একটি নিদর্শন নয় – এটি একটি শক্তির উৎস, মানসিক শক্তি বৃদ্ধি! আধুনিক বিজ্ঞান বলে, যখন আমরা চুম্বন করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ডোপামিন, অক্সিটোসিন এবং সেরোটোনিন রাসায়নিক নিঃসরণ করে যা মেজাজ উন্নত করে, আবেগের বন্ধন তৈরি করে এবং চাপ কমায়। এটি কর্টিসল কমায়, প্রশান্তি এবং সংযোগের অনুভূতি তৈরি করে। চুম্বন মস্তিষ্কের স্নায়ু কেন্দ্রগুলিকেও সক্রিয় করে, সম্পর্ককে শক্তিশালী করে, আত্মসম্মান বৃদ্ধি করে এবং সুখ বৃদ্ধি করে।একটি মাত্র চুম্বন হৃদয় এবং মনের জন্য থেরাপি হতে পারে।
উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার চিকিৎসক ও ‘ইট ইওর ওয়ে টু ওয়েলনেস’-এর লেখক ডাঃ কাসেনিন বলেছেন,’চুম্বন আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো । চুম্বন অক্সিটোসিন নিঃসরণ করে, যা “ভালোবাসা বা আনন্দের হরমোন” নামেও পরিচিত।অক্সিটোসিন শক্তি বৃদ্ধি করে, মানসিক চাপ কমায়, রক্তচাপ কমায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং হজমের স্বাস্থ্য উন্নত করে! আপনি যত বেশি আবেগপ্রবণ হবেন, তত ভালো।’
চিকিৎসকেরা কী বলছেন জানেন? বিশেষজ্ঞদের দাবি চুমু কিন্তু কেবল প্রেম বাড়াতেই নয় আপনাদের স্বাস্থ্যের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তচাপ কমায় – চুম্বনের সময় আপনার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। শিরা, ধমনীগুলি প্রসারিত হয়ে স্বাভাবিকের চেয়েশরীরের রক্ত সঞ্চালনের হারও বেড়ে যায় । ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
মানসিক উদ্বেগ – চুম্বনের সময় মস্তিষ্কের কর্টিসল হরমোনের ক্ষরণ কমে যায়। এই হরমোন স্ট্রেস হরমোন নামেও পরিচিত। পরিবর্তে অক্সিটোসিন,সেরাটোনিন, ডোপামিন নামক হরমোন বেশি মাত্রায় ক্ষরিত হয়। এই সব হরমোন, শরীর এবং মস্তিষ্ক ভাল রাখতে সাহায্য করে ।
মুখের বাড়তি মেদ ঝরায় – জিমে গিয়ে যতই ওজন কমান না কেন, মুখের মেদ ঝরানো কঠিন কাজ ।মুখে মেদ জমলে দেখতেও ভাল লাগে না! সেই মেদ ঝরাতে নানা কসরত করতে হয়। চুম্বনে কিন্তু পারে এই মুশকিল আসান করতে । চুমু খাওয়ার সময়ে মুখের পেশিগুলি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। চুমু খেলে প্রতি মিনিটে প্রায় ৮-১৬ ক্যালোরি খরচ হয়। তাই মুখের বাড়তি মেদ ঝরিয়ে ত্বক টানটান রাখতেও চুম্বন কিন্তু বেশ উপকারী।
দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষা করে – চুমু খেলে দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য ভাল থাকে। চুমু খাওয়ার সময়ে লালারসের ক্ষরণ বৃদ্ধি পায় এবং তাতেই দাঁত, মাড়ি ও মুখের স্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতি ঘটে।
বয়সের ছাপ কমায় – চুম্বনের সময় মুখে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, ফলে কোলাজেন উৎপাদনের হারও বেড়ে যায়। এর ফলে মুখের ত্বক টানটান থাকে। বলিরেখাও ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়।
বিশ শতকের গোড়ায় ফ্রান্সে এই ধরনের চুমু খাওয়া শুরু হয়েছিল। ফরাসীরা বরাবরই যৌনতায় নতুন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালবাসে। সেখান থেকেই এই চুমু আর তার নামের উৎপত্তি। নাকে নাক ঘষে আলতো আদর। এই হল এস্কিমো কিস। প্রথম এই বিষয়টি সকলের নজরে পড়ে এস্কিমোদের জীবন নিয়ে ১৯২২ সালে তোলা রবার্ট ফ্লহার্টি-র বিশ্ব বিখ্যাত তথ্যচিত্র ‘নানুক অফ দ্য নর্থ’-এ।২০০৬ থেকে বিশ্ব চুমু দিবস পালিত হচ্ছে। প্রতি বছর জুলাই মাসের ছয় তারিখে বিশ্বব্যাপী এই দিবস উদযাপিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন কাউকে অভ্যর্থনা বা স্বাগত জানাতে, শুভেচ্ছা জানাতে করমর্দন করার চেয়ে ভাল চুমু খাওয়া। কারণ তা অনেক বেশী স্বাস্থ্যকর। দাঁতের দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ চুম্বন। সঙ্গী বা সঙ্গীনীকে অতিরিক্ত চুম্বনের ফলে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যায় দাঁত। চুমু দিলে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যকার বন্ধন সুদৃঢ় হয়। চিকিৎসকদের ভাষায়, চুমু দিলে অক্সিটোসিন হরমোন উৎপাদন হয়। এটি একে অন্যের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্কে চুমু আনন্দের বাড়তি মাত্রা যোগ করে। না বলা অনেক কথাও এর মধ্য দিয়ে বলা হয়ে যায়। চুমুর মাধ্যমে নারী-পুরুষের একে অপরের থুথু বিনিময় হয়। এটি মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং মানুষের শরীরের ইমমুনি সিস্টেম স্বাভাবিক রাখে। যদি কোনও কারণে কেউ মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত থাকে তাহলে তার কোনও মনোবিদের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। সে তার স্ত্রীকে চুম্বন করলেই তার মানসিক হতাশা দূর হয়ে যাবে। চুমু খাওয়ার সময় কখনো আপনার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে আর বেড়ে যেতে পারে হৃৎস্পন্দন। এতে হৃৎপিণ্ডের ব্যায়াম হবে। এ ছাড়াও এর মাধ্যমে আরো কয়েকটি উপকার হয়। যেমন এটি আপনার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন নিয়মিত হতে সাহায্য করে। রক্তচাপ ও রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। এ কারণে চুমুর মাধ্যমে সুস্থ ও স্বাভাবিক হৃৎপিণ্ড বজায় রাখা সম্ভব।যদি কখনও কারও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা করে তাহলে স্ত্রী বা স্বামীকে খুব কাছে টেনে নিয়ে লিপ কিস করুন। তাহলে দেখবেন সঙ্গে সঙ্গেই আপনার ব্যথা দূর হয়ে যাবে। চুমু মানুষের শরীরের স্ট্রেস হরমোনর কার্যক্ষমতা কমিয়ে আনে। এটি মানুষকে বিষাদের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে ফুরফুরে মেজাজে থাকতে সাহায্য করে। চুমু মানুষের চেহারায় তারুণ্য ভাব বজায় রাখে। যদিও এর কারণে শরীরের কিছু ক্যালোরি ক্ষয় হয় তারপরও এটি মানুষের শরীরের জন্যে খুব উপকারী।
চুম্বন সম্পর্কে ১০টি মনস্তাত্ত্বিক তথ্য :
★ চুম্বনের মাধ্যমে একজন মহিলার পক্ষে প্রচণ্ড উত্তেজনা অর্জন করা সম্ভব।
★ কাউকে চুম্বন করার সময় ভালো রসায়নের অর্থ হতে পারে আপনার সুস্থ সন্তান হবে।
★ গড়ে, একজন ব্যক্তি তার জীবনের ২০,১৬০ মিনিট (দুই সপ্তাহ) চুম্বনে ব্যয় করেন।
★ হাত ধরে চুম্বন করলে মানসিক চাপ কমে এবং রক্তচাপ কমে।
★ কাউকে চুম্বন করবেন কিনা তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, মহিলারা পুরুষদের তুলনায় তাদের সঙ্গীর শ্বাস এবং দাঁতের দিকে অনেক বেশি মনোযোগ দেন।
★ ৫/৬ জুলাই, ২০০৫ তারিখে লন্ডনের এক দম্পতি ৩১ ঘন্টা, ৩০ মিনিট এবং ৩০ সেকেন্ডের জন্য চুম্বনে লিপ্ত ছিল । এটি সর্বকালের রেকর্ড ।
★ যখন দুজন মানুষ চুমু খায়, তখন তাদের মধ্যে ১ কোটি থেকে ১ বিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া আদান-প্রদান হয়।
★ ফরাসি চুমুতে মুখের ৩৪টি পেশীই জড়িত থাকে।
★ এক মিনিট চুমুতে ২৬ ক্যালোরি শক্তি পোড়ে।
★ মানুষ ঠোঁটের স্পর্শ চাওয়ার প্রবৃত্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যে কারণে শিশুরা মায়ের স্তনবৃন্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে ।।
