প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,১১ জানুয়ারী : স্বাস্থ্যবিধি ও নিয়ম কানুনকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছিল পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুরের ’লাইফ কেয়ার’ নামে একটি নার্সিংহোমে । বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট খবর পেয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিক দল দফায় দফায় ওই নার্সিংহোম পরিদর্শনে যান । নার্সিংহোমটির কাগজপত্র খতিয়ে দেখতে গিয়ে আধিকারিকদের নজরে পড়ে যে ’ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিসমেন্ট ’বা সিই আইনমেনে নার্সিংহোমটি চালানো হচ্ছে না । এরপরেই কঠোর পদক্ষেপ নেয় স্বাস্থ্য দপ্তর । জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর অবিলম্বে জামালপুরের ’লাইফ কেয়ার’ নার্সিংহোম বন্ধের নির্দেশ দেয় । কিন্তু সেই নির্দেশ উপেক্ষা করেই ওই নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে রোগী ভর্তি নেওয়া এবং প্রসূতিদের অস্ত্রোপচার করার অভিযোগ উঠছে । বিষয় জানাজানি হতেই আজ শনিবার সংবাদমাধ্যম ওই নার্সিংহোমে নিউজ কভার করতে যায় । কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে দেখেই তড়িঘড়ি নার্সিংহোমে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ।
জামালপুর ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক( BMOH) শঙ্খশুভ্র দাস বলেন,’জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিকের (CMOH) নির্দেশে গত বছরের জুলাই মাসে এবং তার পর অক্টোবর মাসের ১১তারিখ লাইফ কেয়ার নার্সিংহোমে তদন্তে যায় জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের টিম।তাঁরা গোটা নার্সিংহোমের সমস্ত ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখেন। তখনই স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকরা নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থা খুঁজে পান।তার সাথে ধরাপড়ে নার্সিংহোম পরিচালনা সংক্রান্ত নথির অসঙ্গতি। এছাড়াও কর্মী ঘাটতি সহ ইনফেকশন মেইটেনেন্স ও বায়ো মেডিকেল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট বিষয়েও ব্যর্থতা খুঁজে পান স্বাস্থ্য দপ্তরের তদন্তকারী দল। এ সব অনিয়ম ও অব্যবস্থা নিয়ে ’লাইফ কেয়ার’ নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তার পরেই গত ১৯ ডিসেম্বর জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর কালাড়ার লাইফ কেয়ার নার্সিংহোমটি বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করেন। সেই নির্দেশের কপি ওইদিনই জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ও ব্লকের বিডিও-র কাছে পৌছে যায় ।’
কিন্তু স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশের পরেও কোন সাহসে কর্তৃপক্ষ রোগী ভর্তি নিচ্ছিল এবং এমনকি অস্ত্রপচার পর্যন্ত করছিল ? এর উত্তরে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে যে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষকে কোনো অবস্থাতেই ছাড় দেওয়া হবে না । জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্য দপ্তর জামালপুরের কালাড়ার নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য জামালপুর থানাকে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ।
জানা গেছে,জামালপুর থানা এবং জামালপুর ব্লক প্রাথমিক স্থাস্থকেন্দ্রের কাছেই কালাড়া বাজারে রয়েছে ’লাইফ কেয়ার’ নামে ওই নার্সিংহোমটি । সিপিএমের আমলে নার্সিংহোমটি তৈরি হয়৷ তৎকালীন বামপন্থী ক্যাবিনেটের দাপুটে মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর হাত ধরে এই নার্সিংহোমটির উদ্ধোধন হয়েছিল । নার্সিংহোমটিতে সুচিকিৎসা পরিষেবা মিলবে এমন প্রত্যাশা ছিল এলাকাবাসীর। কিন্তু উলটে অব্যবস্থা,অনিয়ম ও চিকিৎসা গাফিলতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নার্সিংহোমটি নানা সময়ে শিরোনামে থেকেছে । মালিকানা বদল হলেও বদলায় নি নার্সিংহোমটির পরিষেবা মান । বর্তমানে নার্সিংহোমটির অন্যতম এক মালিক হলেন মহম্মদ কাজি আজিজ ৷
জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি এসিএমওএইচ(ACMOH) দফতরের পরিদর্শক দল জামালপুরের কালাড়ার নার্সিংহোম ছাড়াও খোসবাগানের তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করে। বাকিগুলি জেলা স্বাস্থ্য দফতরের দল পরিদর্শন করে । তাদের রিপোর্ট জমা পড়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে । তাদের সেই তদন্তে ধরা পড়ে বিস্তর অসঙ্গতি । জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক (CMOH)জয়রাম হেমব্রম বলেন,’সিই আইন মেনে নার্সিংহোমগুলি চলছে কি না, তা দেখার জন্যে অভিযান চলছে।অনিয়ম ধরা পড়লে নোটিস দেওয়া ও শো-কজ় করা হচ্ছে । এমনকি নার্সিংহোম -ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধেরও নোটিস দেওয়া হয়েছে।’
জানা যায়,গত ১৯ ডিসেম্বরের পর থেকে শনিবার ১০ জানুয়ারি সকাল পর্যন্ত রোগী ও প্রসূতি ভর্তি রেখে নার্সিংহোমটির কর্মকাণ্ড চালু ছিল । নার্সিংহোমটিতে রোগী ভর্তি নেওয়ার সত্যতা স্বীকার করেছেন জীতেন ডকাল নামে আড়াশুল গ্রামের বাসিন্দা এক ব্যক্তি। তিনি ছাড়াও কালাড়া বাজার এলাকার আরও অনেকেই এদিন জানান যে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেও তা মানেনি ওই নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ৷ যথারীতি রোগীদের ভর্তি রেখে চিকিৎসা চালু ছিল । এনিয়ে জানতে মহম্মদ কাজি আজিজকে ফোন করা হলে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ফোন কেটে দেন এবং পরে মোবাইলের সুইচ অফ করে দেন ।।

