এইদিন ওয়েবডেস্ক,বাংলাদেশ,০৫ মার্চ : নিজেকে ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ’ দাবি করে প্রতারণার ব্যাবসা ফেঁদেছে বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের আব্দুর রহমান ওরফে শামীম নামে এক ব্যক্তি । বুধবার(৪ মার্চ, ২০২৬), দৈনিক ঐশী বাংলার নির্বাহী সম্পাদক এবং বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের ধর্ম সচিব এ.আর জাফরী এই বিষয়ে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই প্রতারককে গ্রেপ্তারের দাবি করেছেন ৷
বিবৃতির শিরোনামে তিনি লিখেছেন,”কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ‘স্বঘোষিত ভগবান’ শামীমের গ্রেফতার ও আশ্রম বন্ধের দাবি” । বিবৃতিতে বলা হয়েছে : কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে ইসলাম ও সনাতন ধর্মকে পুঁজি করে প্রতারণা ও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টাকারী শামীমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল।
সম্প্রতি ‘দৈনিক ঐশী বাংলা’ সহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, শামীম নামক এক ব্যক্তি নিজেকে ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ’ দাবি করে একটি কথিত আশ্রম গড়ে তুলেছেন। তিনি পীরের খলিফা বা প্রফেসর পরিচয়ে মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, শামীমের এই কর্মকাণ্ড ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র।
একজন মুসলিম হয়ে নিজেকে ‘ভগবান’ দাবি করা এবং প্রচলিত ধর্মগুলোর পবিত্রতা কলঙ্কিত করা প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। এলাকাবাসী অবিলম্বে এই ‘ভণ্ড’ শামীমকে গ্রেফতার এবং তার বিলাসবহুল আশ্রমের অর্থের উৎস তদন্ত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যথায় সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আব্দুর রহমান ওরফে শামীমকে(৭০) ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ । শামীম দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের মৃত জেসের মাস্টারের ছেলে। ওই বছর ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়েরের পর তাকে গ্রেফতার হয়। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বড় আইলচারা গ্রামের মৃত হেলাল উদ্দিনের ছেলে খালিদ হাসান সিপাই শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করে মামলাটি করেছিলেন ।
জানা যায়, শামীম পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ১৯৮৪ সালে ফিলিপনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করে পরবর্তীতে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে টেনেটুনে পাস করেন।
পড়ালেখা শেষ করে ঢাকার জিনজিরা এলাকায় একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম। পরবর্তীতে ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং খাদেম হিসেবে সেখানে বসবাস শুরু করেন। মুরিদ হওয়ার পর থেকে শামীম পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুজি করেও শামীমের সন্ধান লাভে ব্যর্থ হন।
২০০৭ সালে শামীম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু সে বিয়ে ২-৩ মাসের বেশি টেকেনি। বছর দুয়েক আগে হঠাৎ করেই শামীম নিজ গ্রাম ইসলামপুর ফিরে আসেন এবং তার বাড়িতেই আস্তানা গড়ে তোলেন।
গত মঙ্গলবার(৩ মার্চ,২০২৬),দৈনিক ঐশী বাংলার “কুষ্টিয়ায় ‘স্বঘোষিত ভগবান’ শামীমের অপতৎপরতা : নেপথ্যে ধর্মীয় প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের জাল” শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে শামীম নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইসলাম ও সনাতন ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। নিজেকে কখনো পীরের খলিফা, কখনো ‘প্রফেসর’, আবার কখনো ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ’ দাবি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন এই ব্যক্তি। তার এই দ্বৈত অবস্থান ও বিতর্কিত জীবনশৈলী স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
বহুমুখী পরিচয় ও প্রতারণার কৌশল :অনুসন্ধানে জানা যায়, শামীম এক সময় ঢাকার কেরানিগঞ্জের চুনকুটিয়ার পীর ডঃ জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরীর ভক্ত ও খলিফা দাবি করে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। তবে তার চারিত্রিক পস্খলন ও দরবার বিরোধী ষড়যন্ত্রের কারণে মূল দরবার থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি ভোল পাল্টে নিজেকে ‘প্রফেসর’ পরিচয় দিতে শুরু করেন, যদিও কোনো স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার শিক্ষকতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইসলাম অবমাননা ও ‘ভগবান’ হওয়ার নেপথ্যে : স্থানীয়দের অভিযোগ, শামীম প্রকাশ্যেই ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম রীতিনীতি নিয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করেন। এক পর্যায়ে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার কথা বলে তিনি নিজেকে ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ’ ঘোষণা করেন এবং ফিলিপনগরে একটি ‘আলীশান আশ্রম’ গড়ে তোলেন । সেখানে তিনি হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির অপব্যাখ্যা দিয়ে নিজস্ব এক মতবাদ প্রচার করছেন, যা সনাতন ধর্মের মূল বিশ্বাসের পরিপন্থী বলে মনে করছেন স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও।
আইনি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধের ধরণ :শামীমের এই কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে:ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত: বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ২৯৫-এ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিজেকে ভগবান দাবি করা এবং ইসলামকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা—উভয়ই এই আইনের লঙ্ঘন।
প্রতারণা ও জালিয়াতি: পীরের খলিফা বা ভুয়া প্রফেসর পরিচয় দিয়ে অর্থ ও সম্পদ অর্জন দণ্ডবিধির ৪২০ ধারার আওতায় পড়ে।সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টি: ইসলামের নামে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি মিশিয়ে বিতর্ক তৈরি করা এবং পরবর্তীতে নিজেকে ভগবান দাবি করা সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
জনমনে আতঙ্ক ও প্রশাসনের ভূমিকা:ফিলিপনগরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শামীম এর আগেও গণপিটুনির শিকার হয়ে জেল খেটেছেন, কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় তার ‘ভণ্ডামি’ শুরু করেছেন। তার বিলাসবহুল আশ্রমের অর্থের উৎস নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা জানিয়েছেন, একজন মুসলিম হয়ে নিজেকে ‘শ্রীকৃষ্ণ’ দাবি করা সনাতন ধর্মের পবিত্রতাকে কলঙ্কিত করার শামিল। স্থানীয় সচেতন মহল এই ‘ভণ্ড’ শামীমের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার বিতর্কিত আশ্রমের কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।।

