পারমিতা দত্ত,নদীয়া,২৪ ফেব্রুয়ারী : গ্রামের মেঠো পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে পরপর দুটি টোটো৷ টোটোয় লাগানো জোড়া জোড়া মাইক । মাইকে বাজছে ব্যাঞ্জোতে তোলা চটুল গানের সুর আর বাজনা৷ পিছু পিছু দুই শতাধিক মহিলা ও পুরুষ নাচতে নাচতে এগিয়ে যাচ্ছেন । আপাতদৃষ্টিতে এটি বিয়ের শোভাযাত্রা মনে হলেও ভুল ভাঙে “শোভাযাত্রা”র সামনে গেলে । কারন দেখা যায় যে একটি মৃতদেহকে দোলায় চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । আর সেই দোলা বাহকরাও ব্যাঞ্জোর সুরের তালে নৃত্য করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছেন । আসলে সমগ্র দৃশ্যপটটা ছিল নদীয়া জেলার শান্তিপুরের বাগআঁচড়া অঞ্চলের ছোট কুলিয়া গ্রামের দূর্লভ পরিবারের প্রবীনতম সদস্য নিমাই পন্ডিত দুর্লভ(১০৬)-এর শেষ বিদায়ের মুহুর্ত । আর দোলা বহনকারীরা হলেন তাঁর নাতিদের দল । শবযাত্রায় অংশ নেওয়া প্রায় অধিকাংশ সদস্যই প্রয়াত বৃদ্ধের বংশধর । পাশাপাশি অনেক পড়শি মহিলা ও পুরুষও শবযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন ।
কিন্তু শোকের মধ্যে এই উচ্ছ্বাস কেন ? উত্তর দিলেন প্রয়াত নিমাই পন্ডিত দুর্লভের যুবক নাতি শুভাশিস দূর্লভ । তিনি বলেন,’এটাই দাদুর শেষ ইচ্ছা ছিল । উনি জীবিত থাকার সময় বলে গিয়েছিলেন,”আমি মরে যাওয়ার পর তোরা কেউ চোখের জল ফেলবি না । বরঞ্চ আনন্দ করতে করতে আমায় শেষ বিদায় জানাবি”৷ তাই দাদুর শেষ ইচ্ছা রাখতে আমরা তাঁর শবযাত্রায় আনন্দ করেছি ।’ অবশ্য একথা বলার পর যুবকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে । দেখুন ভিডিও 👇
জানা গেছে,শান্তিপুরের বাগআঁচড়া অঞ্চলের ছোট কুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত নিমাই পন্ডিত দুর্লভ পিছনে রেখে গেছেন একটি বড়সড় পরিবার । ছেলে মেয়ে সকলেই বিবাহিত । ছেলে মেয়ে মিলে তাঁর নাতি-নাতনির সংখ্যা অন্তত ৩৫ জন । দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি । অবশেষে আজ নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নিমাই পন্ডিত দুর্লভ । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১০৬ বছর । আজ মঙ্গলবার শান্তিপুরের মহাশ্মশানে তাঁর শবদাহ করা হয় । আর বৃদ্ধের শবযাত্রাকে স্মরণীয় করে রাখতে কোনো খামতিই রাখতে চাননি নিমাই পন্ডিত দুর্লভের নাতিনাতনিরা ।
দাদুর শেষ ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই কোমর বেঁধে নামেন ৩৫ জন নাতি- নাতনি। ফুলের সাজে সজ্জিত বাঁশের দোলায় দাদুর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে, ব্যাঞ্জোর সুরের সঙ্গে খোল- করতালের ধ্বনিতে নাচতে নাচতে তারা গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যান । তবে বৃদ্ধের দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর ফিরতি পথে সেই উচ্ছ্বাস ছিল না অনেকের মধ্যে । কারন অনেকেই হয়তো তখন মনে মনে ভাবছিলেন যে বাড়িতে ঢুকে আর জরাজীর্ণ শরীরে আধশোয়া মানুষটা আর জিজ্ঞেস করবে না : “ফিরলি রে”। দীর্ঘ কয়েক দশকের সেই পরিচিত গলার স্বর হয়ত দীর্ঘদিন ধরে তাদের কানে বাজবে,আর প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কেঁদে উঠবে তাদের কারো কারোর হৃদয় ।।

