এইদিন ওয়েবডেস্ক,দক্ষিণ দিনাজপুর,০৫ জানুয়ারী : প্রবল ঠান্ডায় রাস্তায় কাকপক্ষী নেই ৷ চারদিকে ঘন কুয়াশার আবরণ । মাঠের মাঝে পাটকাঠি দিয়ে ঘেরা ও পলিথিনের ছাউনি দেওয়া একটা ঝুপড়ি থেকে ভেসে আসছে প্রখ্যাত বলিউড গায়ক কুমার শানুর কন্ঠে “ওগো আমার দয়াল ঠাকুর করুণা সাগর তুমি” গান । ঝুপড়িতে গিয়ে দেখা যায় বছর সাতাশের এক যুবক চোখ বুজে ছোট্ট একটি বক্সে লাগানো মাইক্রোফোনে গানের রেওয়াজ করছেন । গান শেষ হওয়ার পর চোখ খুলতেই “এইদিন”-এর সাংবাদিককে দেখে শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ান । ঝুপড়ির এক কোনে কাঠের জ্বালে চা বসানো উনানের পাশে একটা চট পেতে বসতে দেন । তারপর যুবকের সঙ্গে তার জীবন কাহিনী শুনতে শুনতে মনে হয় রাজ্যের ১০০ শতাংশ উন্নয়ন করে ফেলা শাসকদলের প্রধানের দাবি কতটা ফাঁপা । কতবড় প্রতারণার শিকার হয়ে চলেছে এরাজ্যের প্রান্তিক স্তরের একটা বড় অংশের মানুষ ।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার তপন থানার ফটক পাড়ার বাসিন্দা ২৭ বছরের যুবক অতুল রায়ের সংসার বলতে শুধু বৃদ্ধ বিধবা মা । সেই ১৭ বছর আগে বাবা অধীর রায় মারা গেছে । জনমজুরের কাজ করে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের উপার্জিত অর্থে স্ত্রী জ্যোৎস্না দেবী ও একমাত্র ছেলে অতুলের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন তুলে দিতেন ৷ কিন্তু অত পরিশ্রম সহ্য হয়নি তার । পড়ে যান কঠিন রোগে । কার্যত বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কাছে হার স্বীকার করেন তিনি ৷ তখন অতুলের বয়স মাত্র ১০ বছর । শুনুন তপনের তরুন গায়কের গান 👇
স্বামীর মৃত্যুর পর কিশোর সন্তানকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়ে যান জ্যোৎস্না দেবী । মা-ব্যাটার দু’জনের সংসার চালাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিচারিকার কাজ শুরু করেন৷ আজ তার ছেলে অতুল ২৭ বছরের যুবক ৷ ট্রাক্টর ও লরিতে ইঁট-বালি-পাথর লোড-আনলোডের কাজ করেন অতুল । দিনে ২০০ টাকা পারিশ্রমিক মিলে যায় । তার সেই হাড়ভাঙ্গা উপার্জনের ২০০ টাকা ও মায়ের বিধবা ভাতার মাসিক ১০০০ টাকায় জীবন সংগ্রামে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এই দুটি প্রাণ । মেলেনি আবাস যোজনার ঘর । নেতাবাবুদের কাছে বারবার ছুটে গেলেও তাদের মন গলেনি । বাধ্য হয়ে ওই ঝুপড়ির মধ্যেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন অতুল ও তার মা ।
তবে পারিবারিক অভাবের কারনে লেখাপড়া না হলেও অতুল রায়ের জন্মগত একটা প্রতিভা রয়েছে। অসাধারণ গানের গলা তার । তার গলার সঙ্গে মিল রয়েছে বলিউডের গায়ক কুমার শানুর । সীমাহীন দারিদ্রের মধ্যেও সঙ্গীত চর্চা থেকে পিছু হঠেননি অতুল । প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষা না থাকলেও কুমার শানুর গানগুলোকে নিখুঁত ভাবে পরিবেশন করেন তিনি । এলাকায় তার অনেক গুনমুগ্ধ ভক্তও রয়েছে।
কিন্তু কিভাবে জন্মালো সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ ? এই প্রশ্নের উত্তরে অতুল রায় বলেন,’কেন জানিনা ছোট থেকেই গানের প্রতি আমার অসম্ভব নেশা । বাবা মারা যাওয়ার পর মা যখন কাজে বেরিয়ে যেতেন, তখন আমায় সারাদিন একাই থাকতে হত বাড়িতে । সেই সময় আশেপাশের বাড়িতে রেকর্ডারে গান বাজানো হলে আমি সেখানে ছুটে যেতাম । তাদের বাড়ির দেওয়ালে কান পেতে মনোযোগ দিয়ে গানটা শুনতাম । তারপর বাড়ি ফিরে এসে সেই গান গাইবার চেষ্টা করতাম । কয়েকদিনের মধ্যেই গানটা রপ্ত হয়ে যেত ।’ অতুন জানান,মাইক্রোফোনের গান গাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করতে কয়েক মাস ধরে টাকা জমিয়ে একটা ছোট বক্স ও একটা মাইক্রোফোন কিনেছেন তিনি । সেগুলো ব্যবহার করেই তিনি রোজ গানের রেওয়াজ করেন ।
আশপাশের এলাকা থেকে মাঝেমধ্যেই গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ আসে তপন থানার ফটক পাড়ার বাসিন্দা অতুল রায়ের কাছে । তবে বিশেষ রোজগার হয়না । তার দু’জনের সংসারের অন্ন সংস্থানের জন্য শ্রমিকের কাজের উপার্জনের উপরেই নির্ভর করতে হয় তাকে । তবে অতুলের দু’চোখ জুড়ে শুধু একটাই স্বপ্ন, আর সেটা হল গান গেয়ে সংসারের হাল ফেরানো । দুঃখিনী মা’কে স্বচ্ছল জীবন দেওয়া । অতুল রায় বলেন,’ভগবানের কৃপায় যদি একটা ভালো প্লাটফর্ম পেতাম তাহলে খুব উপকার হত ।’।

