এইদিন ওয়েবডেস্ক,ঢাকা,০৪ ফেব্রুয়ারী : বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দির স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত জায়গায় ‘শৌচাগার’ নির্মাণের প্রতিবাদে এবং দ্রুত মন্দির নির্মাণের দাবিতে দিনভর অবস্থান কর্মসূচি পালন শেষে প্রশাসনের কোনো সাড়া না পেয়ে রাতে নিজেরাই ভিত্তিপূজার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মন্দির উদ্বোধন করেছে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে তাদের অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে। এরপর শিক্ষার্থীরা নিজ উদ্যোগে দেবদেবীর ছবির সঙ্গে পূজাসামগ্রী নিয়ে এসে কেন্দ্রীয় মন্দির উদ্বোধনের ঘোষণা করেন এবং সেখানে রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান তথ্য ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী উজ্জ্বল চন্দ্র দাস বলেন, “আমরা বারংবার প্রশাসনের কাছে মন্দির স্থাপনের যৌক্তিক দাবি জানিয়ে আসছি, কিন্তু তারা বিভিন্ন বাহানা দেখিয়ে সেখানে শেষ পর্যন্ত শৌচাগার তৈরির কাজ শুরু করে। এরই প্রতিবাদে আজ আমরা সারাদিন প্রতিবাদ জানিয়েও কোন সাড়া না পেয়ে সকল আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মন্দির’ স্থাপন করেছি। আজ আমরা সারারাত এখানেই কাটাব।” দিনভর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত মঞ্চে অবস্থান নিয়ে ‘এক, দুই, তিন, চার/মন্দির আমার অধিকার’, ‘প্রশাসন লজ্জা লজ্জা’ এবং ‘মন্দির আমার অধিকার/রুখে দেবে সাধ্য কার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।
জবি শাখা শ্রীচৈতন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংঘের সাধারণ সম্পাদক অজয় পাল বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ সনাতনী শিক্ষার্থী থাকলেও এখনো কোনো কেন্দ্রীয় মন্দির নেই। এই দাবিতে আমরা বারবার স্মারকলিপি দিয়েছি। স্মারকলিপি দেওয়ার পর যখন উপাচার্য স্যার স্থাপনা নির্মাণের জন্য জায়গা নেই বলে জানালেন, পরে আমরা মুক্তমঞ্চের পাশে জায়গা দেখিয়ে দেওয়ার পর সেখানে পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হচ্ছে। প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আমরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি।”
ছাত্র ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রিয়ন্ত স্বর্ণকার বলেন, “কেন্দ্রীয় মন্দির স্থাপনের দাবিতে আমরা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদেরকে অবহিত না করেই সেখানে টয়লেট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ধর্মীয় অবমাননার শামিল। এ কারণেই আমরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি।”
জবি সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের সভাপতি সুমন কুমার দাস বলেন, “আমরা আমাদের মন্দির নির্মাণের অনুমতি চাই। প্রশাসন যদি দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে আমরা আজ ভিত্তিপূজা সম্পন্ন করব এবং কেন্দ্রীয়ভাবে মন্দির স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হবে।”
মন্দিরের প্রস্তাবিত জায়গায় শৌচাগার নির্মাণের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দা জানান জকসুর ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার প্যানেলের নির্বাচিত দুজন সম্পাদক এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
জকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাকরিম আহমেদ বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে একটি মন্দির স্থাপনের যৌক্তিক দাবি জানিয়ে আসছে। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি তাদের ধর্মীয় অধিকার ও সাংবিধানিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। দুঃখজনকভাবে, সেই আবেদন বারবার উপেক্ষিত থেকেছে। এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হল, যে জায়গাটি মন্দির স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত ছিল, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন ওয়াশরুম স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু অসংবেদনশীলই নয়, এটি সনাতনী শিক্ষার্থীদের অনুভূতির প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞার শামিল।” তিনি বলেন, “একটি রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল ধর্মের শিক্ষার্থীর সমান মর্যাদা ও নিরাপদ ধর্মচর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে এমন একপাক্ষিক ও অবমাননাকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
জকসুর পরিবহন সম্পাদক মাহিদ হোসেন বলেন, “আমার জগন্নাথের সনাতনী ভাই-বোন-বন্ধুরা দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরের জন্য আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু বারংবার জায়গার দোহাই দিয়ে প্রশাসন তাদের ফিরিয়ে দেয়। বারবার স্মারকলিপি দেওয়ার পরও তারা কোনো আশানুরূপ রেসপন্স পায়নি।অথচ তাদের প্রস্তাবিত মন্দিরের জায়গায় চারটা টয়লেটের কাজ করছে প্রশাসন, যেটা সনাতন ধর্মালম্বীদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ। যতবার তারা প্রশাসন বরাবর গিয়েছে, ততবারই তাদের জায়গার সংকুলান, অর্থের সংকুলান, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে মন্দির হওয়ার দোহাই দেখিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।”
গতকাল সারাদিনেও কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের ভিপি, জিএস, এজিএসসহ অন্যদের কোনো সহযোগিতা না পেয়ে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা।
অবন্তী রায় নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা ২১জন প্রতিনিধি নির্বাচন করেছি, কিন্তু সেখান থেকে মাত্র দুই তিনজনকে আমরা সারাদিনে পেয়েছি। বাকিরা কেউ আসেনি, কিন্তু আরেকটি অনুষ্ঠানে তারা গেছে। তারপরেও তাদের মধ্যে একজনও আমাদের সাথে দেখা করতে আসেনি। তাহলে কি আমরা ধরে নেব সনাতনীদের ছাড়াই জকসু হয়েছে?”
হিন্দু শিক্ষার্থীদের দাবি ও অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মহম্মদ রেজাউল করিম এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের জিএস আব্দুল আলীম আরিফকে ফোন করলেও তারা ধরেননি বলে জানিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ।।

