এইদিন ওয়েবডেস্ক,নওগাঁ,০৭ জানুয়ারী : বাংলাদেশে হিন্দু নরসংহারে যুক্ত হল আরও এক হিন্দু যুবকের নাম । নওগাঁয় মিঠুন সরকার (২৫) নামে ওই যুবককে চোর অপবাদ দিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মুসলিম জনতা হামলা চালায় ৷ প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দেন ওই যুবক । কিন্তু তিনি নদীর জলে তলিয়ে যান । পরে ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তার মৃতদেহ উদ্ধার করেছে । জানা গেছে, বাক প্রতিবন্ধী পঙ্কুশ সরকারের একমাত্র সন্তান মিঠুন । দিনমজুরি কাজ করে বৃদ্ধ বাবা-মা’কে নিয়ে সংসার চালাত ওই যুবক । ছেলের মর্মান্তিক এই পরিণতির পর এখন পথে বসে গেছেন মিঠুনের বৃদ্ধ বাবা-মা ।
প্রসঙ্গত,বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই সাম্প্রদায়িক হিংসা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত হিংসা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এসব ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
ঐক্য পরিষদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসেই বাংলাদেশ জুড়ে অন্তত ৫১টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১০টি হত্যাকাণ্ড, ১০টি চুরি ও ডাকাতি, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মন্দির ও জমিজমা দখল, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা রয়েছে ২৩টি। পাশাপাশি ধর্মীয় অবমাননা ও ‘র’-এর দালালের মতো মিথ্যা অভিযোগে আটক ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৪টি, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১টি এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ৩টি।
চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেও সাম্প্রদায়িক হিংসার ভয়াবহ ধারা থামেনি। ২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সত্যরঞ্জন দাসের প্রায় এক একর জমির ধানক্ষেত আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ৩ জানুয়ারি শরীয়তপুরে কুপিয়ে ও শরীরে আগুন দিয়ে ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই দিন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার আমুচিয়া ইউনিয়নে মিলন দাসের বাড়ির সদস্যদের পনবন্দি করে ডাকাতি চালানো হয়। একই দিনে কুমিল্লার হোমনায় সানু দাসের বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার, রূপা ও নগদ অর্থ লুট করা হয়।
৪ জানুয়ারি এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী শুভ পোদ্দারকে মুখ বেঁধে তার দোকান থেকে প্রায় ৩০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করা হয়। একই দিনে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক হিন্দু বিধবা নারীকে গনধর্ষণ করে গাছের সঙ্গে বেঁধে চুল কেটে নির্যাতনের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। কুড়িগ্রামে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় অন্নপূর্ণা দেবনাথের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার চালিয়ে তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি তোলা হয়, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
গত ৫ জানুয়ারি যশোরের মনিরামপুরে বরফকল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে প্রকাশ্যে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। একই দিন নরসিংদীর পলাশে মুদিদোকানি মণি চক্রবর্তীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।
ঐক্য পরিষদের মতে, সারা দেশে এমন আরও বহু ঘটনা ঘটেছে, যার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এক বিবৃতিতে এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার এই লাগামহীন প্রবণতায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঐক্য পরিষদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ মুসলিম জনতা পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘুদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে এসব ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটি অবিলম্বে এসব সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার রক্ষায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার—এই চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে আমরা একটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ চাই। সাম্প্রদায়িক হিংসা বন্ধ না হলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

