এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,০২ এপ্রিল : মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার (ICE) এজেন্টরা আমেরিকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থানরত ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাসের এক দীর্ঘদিনের সন্দেহভাজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। ২০২৬ সালের ৩০শে মার্চ, ৫৩ বছর বয়সী সালাহ সারসুর (Salah Sarsour)—যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের বৃহত্তম শহর মিলওয়াকির (Milwaukee) একজন আসবাবপত্রের দোকানের মালিক, ইসলামিক সোসাইটি অফ মিলওয়াকির সভাপতি এবং আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন (এএমপি) নেটওয়ার্কের শীর্ষ নেতা—এক ডজনেরও বেশি সংস্থার গাড়ি তাকে ঘিরে ধরে পাকড়াও করে । পরে তাকে শিকাগো থেকে ইন্ডিয়ানার ক্লে কাউন্টির একটি আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে স্থানীয় স্ক্যানার লগ আইসিই কর্তৃক তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
যদিও মুসলিম লিগ্যাল ফান্ড অফ আমেরিকার তার সমর্থকরা #FreeSalahSarsour হ্যাশট্যাগের অধীনে একে ‘অবৈধ অপহরণ’ বলে চিৎকার করছে এবং তার মুক্তির দাবি জানাচ্ছে৷ টেক্সাসের কট্টরপন্থী ইমাম ওমর সুলেইমান, এই গ্রেপ্তারির ঘটনায় ইতিমধ্যেই তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং সারসুরের অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে ওঠা ‘উদ্বেগজনক কণ্ঠস্বরে’ যোগ দিয়েছেন ।
তবে সালাহ সারসুর কোনো নিরীহ “ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের নেতা” নন। তিনি হামাসের একজন নথিভুক্ত সমর্থক, যার অপরাধের তালিকা ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত বিস্তৃত—যা মার্কিন কর্তৃপক্ষ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনোভাবে উপেক্ষা করে এসেছে, আর এই সময়ে তিনি আমেরিকার মাটিতে ব্যবসা, মসজিদ এবং একটি জিহাদি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন ।
মার্কিন রেয়ার ফাউন্ডেশন বলছে, এরাই হলো ভেতরের শত্রু – এমন এক ধরনের ব্যক্তি, যার ব্যাপারে RAIR বছরের পর বছর ধরে সতর্ক করে আসছে: হামাসের একজন অর্থদাতা,যে তার মার্কিন গ্রিন কার্ড ও আসবাবপত্রের দোকানগুলোকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে সন্ত্রাসীদের কাছে অর্থ পাচার করত, এবং পরে নিজেকে “ফিলিস্তিন”-এর একজন সম্মানীয় “সমর্থক” হিসেবে নতুন করে পরিচয় দিত। সংস্থাটি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, ICE-এর পদক্ষেপ নিতে যে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় লেগেছে, তা থেকেই বোঝা যায় ইসলামিক অনুপ্রবেশের পচন কতটা গভীরে পৌঁছে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী,সারসুরের সাথে হামাসের সংযোগ কোনো জল্পনা নয়: ইসরায়েলি আদালতের নথি, মার্কিন এফবিআই মেমো এবং কংগ্রেসের সাক্ষ্যে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। ১৯৯৫ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হামাসকে সমর্থন করার অভিযোগে সারসুরকে গ্রেপ্তার করে ইসরায়েলি কারাগারে আট মাসের জন্য কারারুদ্ধ করা হয়। কারাবাসের সময়, তিনি হামাসের সামরিক শাখা, ইজ্জ আদ-দিন আল-কাসাম ব্রিগেডের পশ্চিম তীরের কমান্ডার আদেল আওয়াদাল্লাহর “ ঘনিষ্ঠ বন্ধু ” হয়ে ওঠেন। তার নিজের ভাই জামিল সারসুরের (হামাসকে অর্থায়নের জন্য যাকে ১৯৯৮ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন) মতে , সালাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনায় সহায়তা করেছিল এবং তার মিলওয়াকির আসবাবপত্রের ব্যবসা ব্যবহার করে চেকের মাধ্যমে আওয়াদাল্লাহকে টাকা পাঠাত ।
২০০১ সালের নভেম্বরে এফবিআই-এর একটি অ্যাকশন মেমোরান্ডামে সালাহ সারসুরকে (এবং তার ভাই ইমাদকে) হলি ল্যান্ড ফাউন্ডেশন (এইচএলএফ) -এর মাধ্যমে হামাসের তহবিল সংগ্রহকারী হিসেবে স্পষ্টভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়—যা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের সবচেয়ে বড় মামলা। পরবর্তীতে ফেডারেল আদালতে এইচএলএফ হামাসের কাছে লক্ষ লক্ষ ডলার পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়। সারসুর এর আগে ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন ফর প্যালেস্টাইন (আইএপি) -এর সাথে কাজ করত, যা হামাসের একটি পরিচিত প্রচার ও নিয়োগকারী শাখা এবং এটি এইচএলএফ-কে “মিডিয়া, যোগাযোগ এবং তহবিল সংগ্রহের সহায়তা” প্রদান করত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নথি থেকে দেখা যায় যে,সে এইচএলএফ- এর “নামে” হামাসের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিল ।
বর্তমানে, সারসুর আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন (এএমপি) -এর জাতীয় বোর্ডে আছে এবং এর বার্ষিক “প্যালেস্টাইন কনভেনশন”-এর সভাপতিত্ব করেছে । একাধিক তদন্ত এবং কংগ্রেসীয় প্যানেল এএমপি-কে আইএপি/এইচএলএফ-এর সন্ত্রাস-অর্থায়ন চক্রের একটি নতুন রূপ দেওয়া উত্তরসূরি হিসেবে উন্মোচন করেছে। এএমপি/এজেপি-র অন্তত নয়জন নেতার হামাসের সাথে যোগসাজশের প্রমাণ রয়েছে। সারসুর এএমপি-র আর্থিক পৃষ্ঠপোষক, আমেরিকানস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন-এরও পরিচালক, যা ইহুদি-বিদ্বেষী ক্যাম্পাস কার্যকলাপকে উৎসাহিত করে এবং “প্রতিরোধ”-কে মহিমান্বিত করার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ডলার হাতিয়ে নেয়।
মিলওয়াকি এলাকায় সারসুরের আসবাবপত্রের দোকানগুলো শুধু ব্যবসা ছিল না – অভিযোগ রয়েছে যে, এগুলো হামাস কর্মীদের কাছে অর্থ পাচারের জন্য ব্যবহৃত হতো। এত কিছুর পরেও, তাকে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা দেওয়া হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মুসলিম সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এটি অভিবাসন তদারকির অভাব নয় – এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা বিপর্যয় বলে মন্তব্য করেছে রেয়ার ।
সংস্থাটি মার্কিন বামপন্থী পূর্ববর্তী শাসকদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছে,সালাহ সারসুরের গ্রেপ্তার অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, এই হামাস সমর্থক আমেরিকায় প্রকাশ্যে বসবাস করেছেন, মসজিদ, ব্যবসা ও প্রভাব গড়ে তুলেছে, অথচ এফবিআই ফাইল এবং ইসরায়েলি নথিপত্রে তার সন্ত্রাসী যোগসূত্রগুলো সবার সামনেই ছিল। ২০২৬ সালেও তার এখানে টিকে থাকাটাই প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।।
