এইদিন ওয়েবডেস্ক,বাংলাদেশ,০১ এপ্রিল : কোথাও কু-প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় হিন্দু নারী ব্যবসায়ীকে প্রাণনাশের হুমকি । কোথাও প্রতিবন্ধী হিন্দু ব্যক্তিকে জোর করে ধর্মান্তরিত করার ঘটনা । বাংলাদেশ আজ সংখ্যালঘুদের জন্য কার্যত নরকে পরিনত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংখ্যালঘু সংগঠন জানিয়েছে, বগুড়ার ধুনট উপজেলায় এক হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী ব্যবসায়ীকে কু-প্রস্তাব দিয়ে উত্যক্ত,চাঁদা দাবি এবং প্রাণনাশের হুমকির দিয়েছে স্থানীয় ২ ব্যক্তি । এই ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানানো হয়েছে । অন্যদিকে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় প্রীতম ঠাকুর নামের এক বাকপ্রতিবন্ধী ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হিন্দু যুবককে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রথম ঘটনার বিবরণে বাংলাদেশ জাতীয় সংখ্যালঘু সংগঠন জানিয়েছে যে বগুড়ার ধুনট পৌর সদরপাড়া এলাকার বাসিন্দা শ্রীমতি স্বরস্বতি সাহা (৩৫) ধুনট বাজার সংলগ্ন কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে “ডাইম কমপ্লেক্সে” ৩টি ঘর ভাড়া নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।তিনি অভিযোগ করেন, একই এলাকার মহম্মদ জনি মিয়া (৩০) ও আশিষ সাহা (৪০) দীর্ঘদিন ধরে তাকে একা পেলেই কু-প্রস্তাব দিয়ে উত্যক্ত করে আসছিল। তিনি তাদের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় অভিযুক্তরা ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন সময় তার দোকানে এসে চাঁদার দাবি করতে থাকে। অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ৩০ মার্চ দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে অভিযুক্তরা তার দোকানের সামনে এসে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে।এ সময় তিনি প্রতিবাদ করলে তারা মারধরের উদ্দেশ্যে তেড়ে আসে এবং দোকান ভাঙচুরসহ প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যায়।
এ ঘটনায় স্থানীয় সাক্ষী হিসেবে বিমল সাহা ও রতন সীলসহ আরও অনেকে বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।ভুক্তভোগী জানান, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে পরে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে ধুনট থানার অফিসার ইনচার্জ আতিকুল ইসলাম বলেন, সোমবার রাতে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য,স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী অভিযুক্ত আশিষ সাহা এর আগে এলাকায় একটি মন্দিরের পূজা সংক্রান্ত বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।পরে স্থানীয় এক নেতার মধ্যস্থতায় বিষয়টি মীমাংসা হয় বলে জানা গেছে।
দ্বিতীয় ঘটনায় জানা গেছে,নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার নাগড়া শিববাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ২৪ বছর বয়সী প্রীতম ঠাকুর প্রীতু গত রবিবার (২৯ মার্চ) সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে পূর্বধলা উপজেলার ৬ নম্বর ইউনিয়নের নারায়ণ ডহর গ্রামের একটি মারকাজে আশ্রয় নেন। সেখানে আলোচিত বক্তা ওয়াসিক বিল্লাহ নোমানীর মাধ্যমে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়। ধর্মান্তরের পর তার নাম পরিবর্তন করে মহম্মদ ইউসুফ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে প্রীতমের পরিবার এই ধর্মান্তরকে স্বেচ্ছায় নয়, বরং জোরপূর্বক বলে দাবি করেছে। তারা পূর্বধলা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে জানিয়েছে, ওয়াসিক বিল্লাহ নোমানী তাদের ছেলেকে প্রলোভন দেখিয়ে ও আটকে রেখে জোর করে ধর্মান্তর করিয়েছে । পরিবারের সদস্যদের দাবি, প্রীতম শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হওয়ায় তিনি নিজে থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না।
অন্যদিকে অভিযুক্ত ওয়াসিক বিল্লাহ নোমানী বলেন, প্রীতম সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি দাবি করেন,এযাবৎ তিনি প্রায় ৯০০ জনকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছেন এবং কাউকেই জোরপূর্বক ধর্মান্তর করা হয়নি। তিনি আরও জানান, ধর্মান্তরের বিষয়ে প্রীতম পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন।
পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহম্মদ দিদারুল ইসলাম জানান, ওই যুবক বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। তাকে সোমবার নেত্রকোনা আদালতে পাঠানো হবে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে এই ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন যে একজন বাকপ্রতিবন্ধী ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী যুবকের ধর্মান্তর নিয়ে যে ধরনের অভিযোগ উঠেছে, তা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্য উদঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মানবাধিকার কর্মীরাও মনে করছেন, ধর্মান্তরের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বাধীন মতামত, মানসিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটলে তা শুধু একটি ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলে।
এই ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকার দিকেও নজর দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহল। আদালতের নির্দেশনা এবং তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে। তবে আপাতত ঘটনাটি সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এবং তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।।

