এইদিন স্পোর্টস নিউজ,০৭ নভেম্বর : টি-২০ ক্রিকেটে টানা চার বলে চার উইকেট নেওয়ার বিরল কীর্তি গড়েছেন ২০ বছর বয়সী বাঁহাতি স্পিনার বৈষ্ণবী শর্মা। উইমেনস সিনিয়র টি-টোয়েন্টি ট্রফিতে মধ্যপ্রদেশের হয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের বিপক্ষে দুর্দান্ত বোলিং করে রেকর্ডের পাতায় নাম লিখিয়েছেন তিনি।
ম্যাচে নিজের চার ওভারে মাত্র ২২ রান খরচায় ৬ উইকেট শিকার করেন বৈষ্ণবী । এর মধ্য দিয়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে টানা চার বলে চার উইকেট নেওয়া দ্বিতীয় বোলার হিসেবে রেকর্ড গড়া স্পেল রয়েছে । এর আগে ২০২২ সালে মুম্বাইয়ের হয়ে সৌরাষ্ট্রের বিপক্ষে একই কীর্তি গড়েছিলেন হুমায়রা কাজী।
ম্যাচের প্রথম তিন ওভারে ১৬ রান দিয়ে দুটি উইকেট নিয়েছিলেন বৈষ্ণবী । তবে নিজের শেষ ওভারে এসে দেখান আসল জাদু। ইনিংসের ১৯তম ওভারে প্রথমে ৬ রান দেন তিনি। এরপর ওভারের শেষ চার বলে পরপর চার ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে ফেরান। প্রথম তিন বলে তিন উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। শেষ বলেও উইকেট তুলে নিয়ে চার বলে চার শিকারের অনন্য কীর্তি গড়েন বৈষ্ণবী ।
ঘরোয়া ক্রিকেটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন বৈষ্ণবী । গত বছরের ডিসেম্বরে ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। এখন পর্যন্ত পাঁচটি ম্যাচ খেলে ওভারপ্রতি ৬.২৬ রান দিয়ে শিকার করেছেন পাঁচ উইকেট।
একদিনের ক্রিকেটেও দারুণ ছন্দে রয়েছেন এই তরুণ স্পিনার। গত মাসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ভারতের ওয়ানডে সিরিজে মাত্র দুই ম্যাচ খেলেই নিয়েছেন ৯ উইকেট। দুই সংস্করণেই তার এমন পারফরম্যান্স ভারতীয় নারী ক্রিকেটে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও নজর কাড়েন বৈষ্ণবী । মালয়েশিয়ার বিপক্ষে পাঁচ উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়ার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের প্রথম বোলার হিসেবে হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। ওই ম্যাচে চার ওভার বল করে মাত্র ৫ রান খরচায় পাঁচ উইকেট শিকার করেন। পুরো টুর্নামেন্টে ১৭ উইকেট নিয়ে আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিও হন তিনি ।
শুধু সীমিত ওভারের ক্রিকেটেই নয়, দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন বৈষ্ণবী । ২০২৪-২৫ মৌসুমের সিনিয়র উইমেনস মাল্টি-ডে চ্যালেঞ্জার ট্রফির ফাইনালে এক ইনিংসে ৫০ রান দিয়ে ৮ উইকেট নেন তিনি। পুরো ম্যাচে তার শিকার ছিল ১২৮ রানে ১৪ উইকেট। ভারতীয় নারী ক্রিকেটে এক ইনিংস ও এক ম্যাচে এমন বোলিং পরিসংখ্যান তার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর একটি।
বৈষ্ণবী শর্মার পরিচয় গড়ে উঠেছে দুটি ‘জি’ (G)-এর সমন্বয়ে— একটি হলো ‘গ্রহ’ (grah), অন্যটি ‘গুগল’ (Google)। বিশাখাপত্তনমে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ভারতের হয়ে অভিষেক হওয়া এই বাঁহাতি স্পিনারের ক্যারিয়ারের পেছনে বড় অবদান রয়েছে তাঁর বাবা, জ্যোতিষী ডঃ নরেন্দ্র শর্মার।
ডঃ নরেন্দ্র শর্মা ‘স্পোর্টস্টার’-কে বলেন,“বৈষ্ণবীর জন্মের সময় আমরা তার কুন্ডলী (কোষ্ঠী) তৈরি করেছিলাম এবং তাতে দেখলাম যে, তার সাফল্যের দুটি পথ রয়েছে—চিকিৎসাক্ষেত্র ও খেলাধুলা। তখন আমার মনে হয়েছিল, সে যদি ডাক্তার হয়, তবে শহর তাকে চিনবে; কিন্তু যদি সে খেলাধুলায় সফল হয়, তবে পুরো বিশ্ব তাকে চিনবে।”
নরেন্দ্র নিজে গলির ক্রিকেট খেলতেন, কিন্তু তাঁর আকাঙ্ক্ষাগুলোকে সমর্থন জানানোর মতো কেউ ছিল না; তাই তিনি তাঁর ছেলে ও মেয়ের স্বপ্নের পথে আসা সব বাধা দূর করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। চার বছর বয়সে বৈষ্ণবী ব্যাট-বল হাতে তুলে নেয় এবং এরপর তাকে আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি বলেন,“গ্রীষ্মের ছুটির সময় আমরা ওকে প্রায় ১৫-২০ দিনের জন্য বিভিন্ন ক্যাম্পে নিয়ে যেতাম। এরপর বাড়িতেও আমরা ওকে আর ওর দাদা অশেন্দ্রকে অনুশীলনে সাহায্য করতাম। ওদের মা আশা আর আমি—আমরা দুজনেই ওদের বল ছুড়ে দিতাম (থ্রো-ডাউন করতাম)। এক পর্যায়ে আমার ছেলে আমাকে বলল, ‘বাবা, আমি এত ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারব না। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। আমি পড়াশোনা ভালো করব। তুমি বরং বৈষ্ণবীকে ক্রিকেট খেলাও।’
২০২১ সাল পর্যন্ত নরেন্দ্র ব্যক্তিগতভাবে তাঁর মেয়ের একজন অলরাউন্ডার হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি তদারকি করেছেন। পরিবারটি তানসেন ক্রিকেট একাডেমি, মধ্যপ্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন এবং গোয়ালিয়র ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে প্রশিক্ষণের কাজ চালিয়েছে। মাত্র ১১ বছর বয়সে বৈষ্ণবী মধ্যপ্রদেশের অনূর্ধ্ব-১৬ দলে জায়গা করে নেয়; সেখানকার পরিবেশ তার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে তোলে। “তার প্রশিক্ষণের সময় যখনই কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতাম, আমরা দ্রুত গুগলে খুঁজে দেখতাম কীভাবে তা মোকাবিলা করা যায় এবং সেই অনুযায়ী তাকে অনুশীলনের রুটিন দিতাম।”
এর পাশাপাশি, নরেন্দ্র তাঁর মেয়েকে সমালোচকদের কথার প্রভাব থেকে দূরে রেখেছিলেন। “তাকে ক্রিকেটে যুক্ত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অনেক বিরোধিতা ছিল। আমার অনেক আত্মীয়ই তাকে খেলাধুলায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন—এটি আদৌ সঠিক কাজ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। আমার কাছে ছেলে বা মেয়ে—সেটা বড় কথা ছিল না। আমি কেবল তার প্রতিভাকে বিকশিত করতে চেয়েছিলাম।”
এর জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। “আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করি। এমন সময়ও গেছে যখন আমাকে কিছুদিনের জন্য কাজ ছেড়ে বাড়িতে থাকতে হয়েছে, যাতে আমি বৈষ্ণবীর দেখাশোনা করতে পারি। জ্যোতিষশাস্ত্রে আমার পিএইচডি ডিগ্রি আছে—গোয়ালিয়রে এই যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি আমিই একমাত্র। কিন্তু আমার মেয়ের ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকাটা ছিল সবচেয়ে জরুরি, তাই অন্য সবকিছুর চেয়ে আমি একেই অগ্রাধিকার দিয়েছি। এক পর্যায়ে, প্রয়োজনীয় খরচের জোগান দিতে, ২৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি আমার নিজের বাড়িটি আমি বন্ধক রাখি। এতে আমার সন্তানদের খরচ চালাতে সুবিধা হয়েছিল। কোভিড-১৯ পরিস্থিতি আরও সমস্যা নিয়ে আসে, যার ফলে আমাকে বাড়িটি বিক্রিই করে দিতে হয়। আজও আমি আমার পরিবারের সঙ্গে ভাড়াবাড়িতেই থাকি।”
বৈষ্ণবীও বড় বড় সমস্যার ভার মহাজাগতিক শক্তির ওপর ছেড়ে দেন। খেলার ফাঁকে, এই তরুণী—যিনি কয়েক দিন আগেই ২০ বছরে পা দিয়েছেন—বিশাখাপত্তনমের সিমহাচলমে অবস্থিত বিখ্যাত বরাহ লক্ষ্মী নরসিংহ মন্দিরে দলের অন্যদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়েছেন। তিনি মূলত সেই কাজটিতেই মনোযোগ দেন যা তিনি সবচেয়ে ভালো পারেন—ক্রিকেট খেলা এবং তা ভালোভাবেই খেলা। সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রায়ই বলে থাকেন, “যা-ই ঘটুক না কেন, তা ভালোই হবে। সব কিছু ঈশ্বরের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাক।”

