শ্যামসুন্দর ঘোষ,পূর্ব বর্ধমান,০১ নভেম্বর : চারিদিকে ঢেকেছে আগাছা । তারই মাঝে ভেঙে পড়া ইঁটের ভবনের শেওলা ধরা প্রবেশ দ্বারের উপর জ্বলজ্বল করছে সূর্যের আকৃতি । গ্রামের মাঝে দুই শতক জায়গার উপর এই ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনটি কোনো সাধারণ কাঠামো নয় । কারন এই ঐতিহাসিক ভবনেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা মহাভারতের রচয়তা মহাকবি কাশীরাম দাস। মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে ওই ধ্বংসাবশেষের অপরিসীম ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও বিগত সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে উপেক্ষিতই থেকে গেছে । মঠ মন্দির রক্ষা কমিটির সভাপতি গৌড় ঘোষের কথায়,’বিগত তৃণমূল সরকার কিছুই করেনি । মেলা খেলা করেছে । হিন্দু সম্প্রদায়ের জ্ঞানীগুণী মানুষদের সম্পর্কে ওদের কোনো ধ্যানধারণাই ছিল না । কিন্তু এই স্থান শুধু সিঙ্গি গ্রামেরই নয়,এটা সমগ্র বাঙালি জাতির গর্ব ।’ তিনি মহাকবি কাশীরাম দাসের জন্ম ভিটেটি হেরিটেজ ঘোষণার দাবি জানান ।
কাটোয়া-২ ব্লকের সিঙ্গি গ্রামের অনতিদূরে প্রবাহিত হয়েছে পবিত্র গঙ্গানদী । মধ্যযুগে গোটা এলাকাটিতে ছিল আধ্যাত্মিক পরিবেশ । তারই মাঝে শান্ত নির্জন তপবোন সদৃশ সিঙ্গি গ্রামে জন্ম হয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর নাম মহাকবি কাশীরাম দাসের । সংস্কৃত ভাষায় রচিত মহাভারতকে যিনি সহজ-সরল বাংলা পদ্যে রূপান্তরিত করে বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন ।
ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীতে (১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) দেশে যখন হানাদার মুঘলদের শাসন,তখন সিঙ্গি গ্রামের এই ইঁটের বাড়িতেই জন্ম হয় কবির । সিঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা প্রভাত কুমার চৌধুরী বলেন, ‘কবির মূল ভবনের নিচেই রয়েছে গুপ্ত কুঠির । রোজ ভোরে গঙ্গা স্নান করে ওই গুপ্ত কুঠিরে এসে সাধনা করতেন কবি কাশীরাম দাস । ওখানে বসেই তিনি মাটির প্রদীপ জ্বেলে সংস্কৃত মহাভারতের বঙ্গানুবাদ করেন ।’
কিন্তু আজ সেই গুপ্ত কুঠিরে যাওয়ার সাহস হয়না কারোর । কারন ভবনের ছাদ ধ্বসে পড়েছে অনেক দিন আগেই । দেওয়ালের অর্ধেকের উপর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে । তার উপর চারিদিকে ঝোপজঙ্গল । সাপের ভয়ে তাই কবির স্মৃতি বিজরিত গুপ্ত কুঠির খুঁজে বের করার সাহস করেন না কেউ । কবির স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে গ্রামবাসীরা চাঁদার অর্থে ভগ্নাবশেষের পাশেই।কাশীরাম দাস মন্দির নির্মান করেছিলেন বেশ কয়েক বছর আগে । কিন্তু কবির প্রাচীন বাসভবনটি সংস্কারের জন্য বিপুল অর্থ জোটানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে পিছিয়ে আসেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, অবিলম্বে সংস্কারের উদ্যোগ না নেওয়া হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এই ঐতিহাসিক সম্পদ।
সম্প্রতি সিঙ্গি গ্রামে গিয়ে কবির জন্মভিটের দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করেন বাংলার মঠ-মন্দির বাঁচাও কমিটির সভাপতি গৌর ঘোষ। ভগ্নপ্রায় বাড়ি ও ঝোপ-জঙ্গলে ঢাকা গুপ্ত কুঠির অবস্থা দেখে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। গৌরবাবু জানান, বিষয়টি নিয়ে কলকাতায় গিয়ে কার্তিক মহারাজের সঙ্গে আলোচনা করবেন। পাশাপাশি, জন্মভিটেটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হবে। তাঁর কথায়, মহাকবি কাশীরাম দাস শুধু কাটোয়া বা পূর্ব বর্ধমানের সম্পদ নন, তিনি সমগ্র বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির গর্ব।
অন্যদিকে, জন্মভিটার পাশের বাড়ির বাসিন্দা প্রভাত কুমার চৌধুরীর অভিযোগ, একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও কবির স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটির সংরক্ষণে কেউ উদ্যোগী হননি। বর্তমান সরকারের কাছে তাঁর আবেদন, দ্রুত জন্মভিটেটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে সংস্কারের ব্যবস্থা করা হোক।
তাঁদের দাবি, অবিলম্বে হেরিটেজ ঘোষণা করে জন্মভিটেটি সংস্কার করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের মানুষও এই ঐতিহাসিক স্থান দর্শনের সুযোগ পান।
ঐতিহাসিক স্থান কি এবার অবহেলার অন্ধকার থেকে মুক্তি পাবে? নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতায় চিরতরে হারিয়ে যাবে বাংলার সাহিত্য-ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায়? এখন সেই প্রশ্নই ঘুরছে সিঙ্গির বাসিন্দাদের মনে।।

