শঙ্খ বারিক, ২২ আগস্ট : বিশ্ব ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপে ইতিহাস গড়লেন ত্রিসা জলি ও গায়ত্রী গোপীচাঁদ। শুক্রবার কোয়ার্টার ফাইনালে চীনের জিয়া ই ফান ও ঝাং শু শিয়ান জুটিকে ১৬-২১, ২১-১৫, ২১-১৩ গেমে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করলেন তাঁরা। ৬৯ মিনিটের লড়াইয়ে প্রথম গেম হেরেও যে প্রত্যাবর্তন তাঁরা দেখালেন, তা ভারতীয় মহিলা ব্যাডমিন্টন ডাবলসের নতুন মানদণ্ড।
শেষবার ২০১১ সালে লন্ডনে জ্বালা গুট্টা ও অশ্বিনী পোনাপ্পা ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। তারপর ১৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। সেই খরা কাটালেন ত্রিসা-গায়ত্রী। গত কয়েক বছরে অল ইংল্যান্ডে টানা সেমিফাইনাল, কমনওয়েলথে ব্রোঞ্জ, বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে প্রবেশ – এই ধারাবাহিকতারই ফসল এই বিশ্ব পদক।
তবে এই পদকের আড়ালে আরও একটি গল্প আছে। ভারতীয় ক্রীড়া জগতে পুল্লেলা গোপীচাঁদ নামটা একটা প্রতিষ্ঠান। অল ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন, দ্রোণাচার্য, ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের ভাগ্য বদলে দেওয়া মানুষ। কিন্তু I GI স্টেডিয়ামের সাইডলাইনে যখন তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন তিনি শুধু কোচ নন। তিনি একজন বাবা। কোর্টের ভিতরে ত্রিসা জলি এবং গায়ত্রী গোপীচাঁদ, বিশ্বের অন্যতম সেরা চীনা মহিলা জুটিকে হারিয়ে সেমিফাইনালে যাওয়ার জন্য লড়ছে। বাইরে চিৎকার করছেন গোপী। সেই চিৎকারে কোচের কৌশল আছে, কিন্তু বাবার উদ্বেগও আছে।
নিজের মেয়েকে কোচিং করানো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। সীমারেখা কোথায় টানবেন? কখন আপনি বাবা, কখন কোচ? আপনি কি মেয়ের উপর ততটাই কঠোর হতে পারবেন যতটা অন্য ছাত্রীর উপর হতে পারেন? নাকি বাবা হওয়াটাই আপনাকে আরও ভালো কোচ করে তোলে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই গোপীচাঁদের দর্শনটা বোঝা যায়।
গোপীচাঁদ নিজেই একবার একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার সাথে ওর বাবা-মের সম্পর্ক থাকায় ও আমার বিচারের উপর ১০০ শতাংশ ভরসা করতে পারে। আর আমি এই আস্থার কথা জানি বলেই আমি ওকে কঠোর পরামর্শ দিতে পারি এবং ও তা মেনে চলবে।” এটাই বাবা-কোচ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সুবিধা এবং সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও বটে। একজন সাধারণ ছাত্র হয়তো কোচের কঠোর পরামর্শকে ব্যক্তিগতভাবে নেবে, বিদ্রোহ করতে পারে। কিন্তু মেয়ে জানে, এই কঠোরতার পিছনে বাবার ভালোবাসা আছে। তাই সে যে কোনও কঠোর সিদ্ধান্তই মেনে নেয়।
আবার এই বিশ্বাসটা একদিনে তৈরি হয়নি। গোপী বলেন, ২০০৮-০৯ সালে তিনি ভোর ৪:১৫-তে একাডেমিতে যেতেন। সকাল ৬:৩০-এর মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। তখন ৫ বছরের ছোট্ট গায়ত্রী কোর্টের এক কোণে বসে বাবাকে দেখত। সেই দেখাটাই তাঁকে নতুন এনার্জি দিত। মেয়ে বাবার কাজকে ভালোবেসেছে, বাবা মেয়ের উপস্থিতিকে শক্তি বানিয়েছেন। এটা কোচ-ছাত্রীর সম্পর্ক নয়, এটা জীবনের সম্পর্ক।
গোপীচাঁদ আরেকটি অসাধারণ কাজ করেছেন। তিনি কখনো গায়ত্রীকে একা কোচিং করাননি। তিনি বলেন, “আমি সবসময় ওকে গ্রুপে কোচিং করিয়েছি। ওকে সামাজিক হতে সাহায্য করার এটাই ছিল সেরা উপায়,” এখানেই তিনি কোচের চেয়েও বড় বাবার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি চাইলে মেয়েকে নিয়ে আলাদা করে ‘প্রজেক্ট গায়ত্রী’ বানাতে পারতেন। তিনি করেননি। তিনি চেয়েছিলেন গায়ত্রী যেন গায়ত্রী হয়েই বড় হয়, ‘গোপীচাঁদের মেয়ে’ হিসেবে নয়। ভিড়ের মধ্যে, সমবয়সীদের মধ্যে লড়াই করে নিজের জায়গা তৈরি করুক।
এখন গায়ত্রীর বয়স মাত্র ২৩। তার ঝুলিতে দুটি অল ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনাল, কমনওয়েলথে পদক, দুটি এশিয়ান গেমস। তবুও প্রতিটি সাক্ষাৎকারে তাকে শুনতে হয় – “কবে অল ইংল্যান্ড জিতবে? কবে অলিম্পিক পদক? বাবার মতো হবে কবে?” এখানেই গোপী সবচেয়ে কঠোর। তিনি বলেন, “যদি আজ ওর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়, আমার পরিবার এবং আমি ও যা অর্জন করেছে তা দেখে অত্যন্ত আনন্দিত বোধ করব। গায়ত্রী ওর নিজের জীবন যাপন করছে, আমার জীবন নয়। আমার অর্জনের সাথে ওর অর্জনকে সমান করা ঠিক নয়। বরং ও ওর বয়সে আমার চেয়ে অনেক বেশি অর্জন করেছে।”
ভারতীয় সমাজে আমরা এই ভুলটা বারবার করি। সচিনের ছেলে অর্জুনকে সচিন হতে হবে, গোপীর মেয়েকে গোপী হতে হবে। আমরা ভুলে যাই তারা ব্যক্তি, তাদের নিজস্ব পরিচয় আছে। গোপীচাঁদের সবচেয়ে বড় কোচিং হয়তো কোর্টের বাইরে। তিনি জানেন কখন কোচ হতে হবে, কখন বাবা হতে হবে, আর কখন দুটো ভূমিকাই সরিয়ে রেখে মেয়েকে শুধু তার মতো থাকতে দিতে হবে। এই অদৃশ্য সীমারেখাটা বুঝতে পারাই আসল কোচিং। আর সেখানেই গোপীচাঁদ অনন্য।।
