এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,১৩ আগস্ট : দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে লাগাতার কুরুচিকর ও অবমাননাকর মন্তব্যের জেরে স্বঘোষিত “মহারাজ” নগেন রায়ের ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান কেড়ে নিল রাজ্য সরকার । ২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার হাতে ‘বঙ্গবিভূষণ’ তুলে দেন। রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, তাঁদের ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছিল বলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই নিজের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরতে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজকে নিয়ে ক্রমাগত অবমাননাকর মন্তব্য করতে শুরু করেন নগেন রায় ।
এরপর বিষয়টি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানান, বাংলার মাটিতে নেতাজিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য বরদাস্ত করা হবে না এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর আজ বৃহস্পতিবার রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর একটি সরকারি আদেশ জারি করে অনন্ত মহারাজের ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রত্যাহার ও বাতিল করে। আদেশে বলা হয়েছে, সম্মান দেওয়ার পর এমন কিছু তথ্য ও পরিস্থিতি সরকারের নজরে এসেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই সম্মান তাঁর কাছে বহাল রাখা সেই পুরস্কারের মর্যাদা, গৌরব ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।সরকারি আদেশ অনুযায়ী, এখন থেকে অনন্ত মহারাজ নিজেকে ‘বঙ্গবিভূষণ প্রাপক’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন না এবং এই সম্মানের সঙ্গে যুক্ত কোনও স্বীকৃতি, সুবিধা বা অধিকারও দাবি করতে পারবেন না।
এদিকে স্বঘোষিত “মহারাজ” নগেন রায়ের একের পর এক কুকীর্তি সামনে আসতে শুরু করেছে । কিভাবে তিনি নিজের নাম-ঠিকানা বদলে ফেলে কোচবিহারের রাজপরিবারের সদস্য বনে গেলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছে উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম উত্তরবঙ্গ সংবাদ । “নগেন্দ্র রায়” থেকে কোচবিহারের “মহারাজা অনন্ত রায়” বনে যাওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরেছে ওই সংবাদমাধ্যমটি ।
আজ উত্তরবঙ্গ সংবাদের অনলাইন সংস্করণে এই বিষয়ে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে,সরকারি খাতায় তিনি গগেন্দ্র রায়ের ছেলে নগেন্দ্র রায়। রাজ্যসভায় কোচবিহারের বিজেপি সাংসদ। বাড়ি অসমের চিরাংয়ের সতীপুরে। অথচ প্রকাশ্য সভায় নিজেকে পরিচয় দেন কোচবিহারের মহারাজা অনন্ত রায় হিসাবে। তাঁর অনুগামীরা আবার তাঁকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার হিসাবে প্রচার করেন। তাঁদের একাংশ লেখেন, তিনি নগেন্দ্র দেববর্মা। অন্যদিকে দিনহাটার গোসানিমারি এলাকায় নগেন্দ্র অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি। স্থানীয়দের কাছে তিনি উপেন বর্মন হিসাবেই পরিচিত। গ্রামের লোকেরা তাঁকে ডাকেন উপিন ঢোঁরা নামে।তাঁরা জানিয়েছেন, অসম নয়, নগেন্দ্র আসলে গোসানিমারিরই বাসিন্দা। সেখানেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কোনটা তাঁর আসল পরিচয়, কোনটা নকল তা বোঝা বেশ শক্ত। কোচবিহার শহরের অদূরে বড়গিলা এলাকায় বিশাল ‘রাজপ্রাসাদ’ বানিয়ে রাজা সেজে বসা নগেন্দ্র এখন এক রহস্যময় চরিত্র। তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে একের পর এক বিতর্ক।
সংবাদমাধ্যমটি এরপর লিখেছে,সরকারি নথি অনুসারে, ১৯৪৯ সালের ২৮ অগাস্ট কোচবিহারের ভারতভুক্তি চুক্তি হয় এবং একই বছর ১২ সেপ্টেম্বর রাজ্য হিসাবে কোচবিহার ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। আর ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের জেলা হিসাবে পথ চলা শুরু হয় কোচবিহারের। ভারতভুক্তির সময় কোচবিহারের মহারাজা ছিলেন জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণ ভূপবাহাদুর। সেই অনুসারে তিনিই কোচবিহারের শেষ রাজা। তবে রাজপরিবারের ইতিহাস বলছে, জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণের পর রাজবংশের প্রথা মেনে শেষবার রাজা হিসাবে রাজ্যাভিষেক হয়েছিল বীরাজেন্দ্রনারায়ণের। সেই হিসাবে অনেকেই বীরাজেন্দ্রনারায়ণকেই কোচবিহারের শেষ রাজা হিসাবে স্বীকৃতি দেন।
রাজার শাসনের অবসান হলে সরকারিভাবে কোচবিহার রাজবংশের সদস্যদের শংসাপত্র দেওয়া হয়েছিল। সরকার স্বীকৃত সেই ব্যক্তিরাই রাজপরিবারের সদস্য বা জ্ঞাতি। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছেন সেই সদস্যরা। তাঁরা একসঙ্গে তৈরি করেছেন দ্য কোচবিহার রয়্যাল ফ্যামিলি সাকসেসর্স ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। সরকারি তালিকা বা ট্রাস্টের কোথাও নগেন্দ্রর নামগন্ধও নেই। তাহলে কোন যুক্তিতে তিনি নিজেকে রাজা বলছেন সেই প্রশ্ন উঠছে সব মহলেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,কয়েকদিন আগে শিলিগুড়িতে সাংবাদিকরা নগেনকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করতেই রে রে করে ওঠেন তাঁর অনুগামীরা। পরে সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে নগেন বারবার দাবি করেন, তিনিই মহারাজা। তবে কীভাবে রাজা হলেন তার ব্যাখ্যা অবশ্য দেননি। ব্যাখ্যা জানার জন্য ফোন করা হলেও তিনি ফোন তোলেননি।
নগেন্দ্র নিজেকে কোচবিহারের রাজা হিসাবে পরিচয় দেওয়ায় যারপরনাই ক্ষুব্ধ রয়্যাল ফ্যামিলি সাকসেসর্স ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সদস্যরা। সংগঠনের মুখপাত্র কুমার মৃদুলনারায়ণের কথা, ‘কোচবিহার রাজপরিবারের সঙ্গে রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্র রায়ের কোনওরকম সম্পর্ক নেই। তিনি একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসাবে যেভাবে মিথ্যা প্রচার করছেন তা যথেষ্ট আপত্তিকর ও বেআইনি। এর প্রতিবাদ করে কড়া পদক্ষেপ করার জন্য আগেই আমরা প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সহ বিভিন্ন মহলে চিঠি দিয়েছি। আবারও আমরা চিঠি পাঠাব। এই মিথ্যাচার দ্রুত বন্ধ হওয়া দরকার।’
নগেন্দ্রর নিজেকে রাজা দাবি করার বিরোধিতা করে এবং আইনি পদক্ষেপের আর্জি জানিয়ে একাধিক সংগঠন থেকে ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অসমের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তদন্ত করে নগেন্দ্রর আসল পরিচয় প্রকাশ্যে আনার দাবি তুলেছেন ফরওয়ার্ড ব্লকের বাংলা কমিটির সভাপতি গোবিন্দ রায়।
রাজ্য পুলিশ সূত্রের খবর, তৃণমূল আমলে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নগেন্দ্রর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ জমা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই অভিযোগের তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডির কাছে। নগেন্দ্র রাজা সেজে বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করছেন সেটাই ছিল মূল অভিযোগ। মাঝপথে সেই তদন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। সেই সময় তদন্তের দেখভালের দায়িত্বে থাকা প্রাক্তন এক সিআইডি আধিকারিকের বক্তব্য, ‘তদন্ত শুরু হলেও রাজনৈতিক কারণে বেশিদূর এগোনো যায়নি। শিলিগুড়ির পিনটেল ভিলেজের অফিসে কয়েকদিন আলোচনার পর সব ঠান্ডা ঘরে ঢুকে যায়।’
পত্রিকাটি বলেছে,এতদিন নগেন্দ্র বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিতর্কিত এবং কুমন্তব্য করলেও সাধারণ মানুষ সেভাবে সেগুলোকে পাত্তা দিতেন না। রাজনৈতিক স্টান্টবাজি হিসাবেই তা দেখা হত। কিন্তু নেতাজিকে নিয়ে লাগাতার কটূক্তিতে লাগাম না পরায় স্বঘোষিত মহারাজের আসল পরিচয় সামনে আনার দাবি ক্রমশ জোরালো হতে শুরু করেছে গোটা রাজ্যেই।।
