এইদিন ওয়েবডেস্ক,বেঙ্গালুরু,২৯ জুলাই : মঙ্গলবার (২৮শে জুলাই), কর্ণাটক হাইকোর্ট বেঙ্গালুরুতে দুজন অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীর উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরার জন্য চিকিৎসক- সমাজকর্মী নাগেন্দ্রের বিরুদ্ধে দুটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করায় বেঙ্গালুরু পুলিশকে তিরস্কার করেছে । আদালত পুলিশ ও রাজ্য সরকারকে এই তোষণমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করতে বলেছে।
বিচারপতি এম নাগপ্রসন্ন ডঃ নাগেন্দ্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি ফৌজদারি মামলার পরবর্তী তদন্তের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। বিচারপতি নাগপ্রসন্ন মন্তব্য করেন,“তাদেরকে এটা (অবৈধ অভিবাসন) নিয়ন্ত্রণে বলতে হবে, অন্য আলোচনা বাদ দিন। (স্বরাষ্ট্র) দপ্তর কী করছে? অন্য বক্তৃতা নিয়ে ব্যস্ত?”
আদালত অভিমত ব্যক্ত করেছে যে, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা গুরুতর জাতীয় নিরাপত্তা পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
বিচারপতি নাগপ্রসন্ন বলেন,“যদি পুলিশ দেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজ করে, যদি পুলিশ এই শহরের মানুষের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসীদের সমর্থনে এমন আচরণ করে… তবে তা ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক। দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। ব্যবস্থার এমন বিষয়কে সমর্থন করা উচিত নয় ।”
বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরলে বেঙ্গালুরু গ্রেপ্তার করা হয় ডঃ নাগেন্দ্রকে
আবেদনকারী ডঃ নাগেন্দ্রের আইনজীবী গিরিশ ভরদ্বাজ আদালতে জানান যে, তাঁর মক্কেল একজন সমাজকর্মী যিনি বেঙ্গালুরুতে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের শনাক্ত করতে পুলিশকে সহায়তা করে আসছেন। সাই ক্লিনিক-বেত্তাদাসাপুরা- বেল্লান্দুরের ডা. নাগেন্দ্র ২২শে জুলাই ২০২৬ তারিখে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের উপস্থিতির বিষয়ে অবহিত করেছিলেন । ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসে (এফআরআরও) তথ্যটি জানানোর মাত্র ১৫ মিনিট পরেই, অভিযুক্ত বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের একজন আবেদনকারীর বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেন। বেঙ্গালুরুতে কথিত অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে আবেদনকারীর করা আরেকটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, ওই চিকিৎসক-কর্মীর বিরুদ্ধে অন্য একটি থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
ফলস্বরূপ, আবেদনকারী ডঃ নাগেন্দ্রকে বৃহস্পতিবার (২৩শে জুলাই) গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে পাঠানো হয়। পরদিন তিনি জামিনে মুক্তি পান।
বেঙ্গালুরুর হোয়াইটফিল্ডে অবৈধভাবে বসবাসকারী বলে অভিযোগ ওঠা এক বাংলাদেশি দম্পতি, নাসিরনা ও মোহাম্মদ বিলালকে মারধরের অভিযোগে ডক্টর নাগেন্দ্রের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ২৩ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি নারী ডাঃ নাগেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে, জাতীয়তার কারণে তিনি তাকে ও তার স্বামী, চালক মোহাম্মদ বিলালকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে মারধর করেছেন।
জানা গেছে,নাসিরনা দাবি করেছেন যে ডক্টর নাগেন্দ্র হিন্দিতে তাঁদেরকে গালিগালাজ করেন এবং পুলিশের কাছে গেলে ওই বাংলাদেশি দম্পতিকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। অভিযোগের ভিত্তিতে বেলান্দুর পুলিশ ডঃ নাগেন্দ্রের বিরুদ্ধে হামলা, নারীর শালীনতাহানি, অন্যায়ভাবে আটক রাখা এবং অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। পরবর্তীকালে, ২৩শে জুলাই পুলিশ এই ডাক্তার- সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তার করে। তবে, গ্রেফতার হওয়ার আগে ডক্টর নাগেন্দ্র তাঁর ফেসবুক পেজে ঘটনাটি সম্পর্কিত একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটিতে তাঁকে অভিযোগকারী দম্পতিকে বাংলাদেশি বলে অভিযুক্ত করতে শোনা যায় এবং তিনি বলেন যে, দেশে ফেরার আগে তাঁদেরকে ভারত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। অন্যদিকে, বিলাল দাবি করেন যে তিনি গত ২০ বছর ধরে বেঙ্গালুরুতে বসবাস করছেন। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে অভিযোগকারী দম্পতি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক এবং তারা এ বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করছে।
মঙ্গলবার (২৮শে জুলাই) কর্ণাটক হাইকোর্ট এই মামলার শুনানি করে। আদালত শুধু ডঃ নাগেন্দ্রের বিরুদ্ধে দুটি ফৌজদারি মামলার তদন্তে স্থগিতাদেশই দেয়নি, বরং “প্রক্রিয়ার অপব্যবহার” এবং “তোষণ” করার জন্য বেঙ্গালুরু পুলিশের তীব্র সমালোচনাও করেছে। ডঃ নাগেন্দ্রের আইনজীবী যুক্তি দেন যে, বেঙ্গালুরুতে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে পুলিশের যদি সত্যিই ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে তারা সেইসব বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত, যারা কথিতভাবে অবৈধ অভিবাসীদের কাছে তাদের বাড়ি ভাড়া দিয়েছিল।
এদিকে, বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি বি এন জগদীশ জানান যে, অভিযুক্ত বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের ইতোমধ্যে এফআরআরও-এর সামনে হাজির করা হয়েছে এবং একটি আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তবে, এসপিপি বলেন যে, অভিযোগকারী আবেদনকারী ডঃ নাগেন্দ্রের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। এসপিপি বলেন,“আমরা বলছি তারা অবৈধ অভিবাসী। তারা অবৈধভাবে অবস্থান করছে। তাদের আটক কেন্দ্রে রাখা হোক । এফআরআরও-কে পক্ষভুক্ত করা হোক। আমরা সমস্ত নথি সংগ্রহ করব। কাউকে আড়াল করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না ।”
তবে, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও তাঁকে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে বেঙ্গালুরু পুলিশের প্রদর্শিত অস্বাভাবিক নৈপুণ্য আদালত লক্ষ্য করেছে।
বিচারপতি নাগপ্রসন্ন উল্লেখ করেন যে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ২২শে জুলাই রাত সাড়ে ১১টায় এফআরআরও-কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন যে অভিযোগকারী নাসরীনা বিলাল একজন বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসী, যাঁকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো উচিত। তবে, ১৫ মিনিটের মধ্যেই সেই বাংলাদেশি নারী, নাসরীনা বিলাল, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেন।
বিচারপতি নাগপ্রসন্ন পুলিশকে তিরস্কার করে প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে তারা একজন অবৈধ অভিবাসীর অভিযোগ গ্রহণ করতে পারে, যিনি তার ঠিকানা হিসেবে বাংলাদেশ উল্লেখ করেছেন। আদালত বলেছে যে, যখন অভিযোগকারী নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক, তখন আবেদনকারীকে মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তার করার আগে পুলিশের একটি প্রাথমিক তদন্ত করা উচিত ছিল।
বিচারপতি নাগপ্রসন্ন প্রশ্ন করেন,“অবৈধ অভিবাসীদের অভিযোগের ভিত্তিতে যদি তাদের বিতাড়িত করতে বলা হয়, তাহলে আপনারা একটি মামলা নথিভুক্ত করেন। তারা বলছে যে তাদের মারধর করা হয়েছে। তাদের ঠিকানা বাংলাদেশ। এমন একটি অভিযোগের ভিত্তিতে আপনারা কীভাবে মামলা নথিভুক্ত করছেন? অভিযোগটিই দেখুন। এতে বাংলাদেশের উল্লেখ আছে। আপনারা এই অভিযোগটি নিলেনই বা কীভাবে?”
কর্নাটক হাইকোর্ট আরও পর্যবেক্ষণ করেছে যে, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের সময় থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ডঃ নাগেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে জানানোর পরেই বেঙ্গালুরু পুলিশ একটি পাল্টা মামলা দায়ের করেছিল বলে মনে হচ্ছে। আদালত রাজ্যের কংগ্রেস সরকারেরও তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, “এই কারণেই অবৈধ অভিবাসীরা থেকে যাচ্ছে। সরকার যদি তাদের এভাবে সমর্থন করে, তাহলে এটাই ঘটবে। এটি একটি সরাসরি পাল্টা জবাব।”
যৌন নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে আদালত উল্লেখ করেছে যে, ডাক্তার নাগেন্দ্র অভিযোগকারীকে আক্রমণ করেছিলেন—এমন কোনো ডাক্তারি প্রমাণ নেই। আদালত আরও উল্লেখ করেছে যে, অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবেদনকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করাটা “প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত”। আদালত বলেছে,“কোনো আঘাতের সনদপত্র নেই। কোনো ডাক্তারি পরীক্ষাও করা হয়নি। রাত সাড়ে এগারোটায় তদন্তকারী কর্মকর্তা কিছুই খুঁজে পাননি। পনেরো মিনিটের মধ্যেই একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে? তোষণ বন্ধ করুন; এটা আর কতদিন চলবে? এটা তোষণ ।”
আদালত ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে অবৈধ অভিবাসীদের ভাড়া বাসস্থান দেওয়ার অভিযোগের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আদালত বলেছে, “অনেকেই কিছু বাড়তি টাকার জন্য বাড়ি ভাড়া দেন। যদি লোভ দেশের নিরাপত্তাকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে আর কী করার আছে? যাদের ভিসা বা কাগজপত্র নেই, তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে ।” আদালত পুলিশকে আরও নির্দেশ দিয়েছে, যারা এফআইআর দায়ের করে অনিবন্ধিত বিদেশি নাগরিকদের উপস্থিতির খবর জানায়, তাদের লক্ষ্যবস্তু করা বন্ধ করতে।
বিচারপতি নাগপ্রসন্ন উল্লেখ করেন যে, এই মামলায় উদ্ভূত তথ্য প্রাথমিকভাবে ফৌজদারি প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। তাই, আদালত পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত আবেদনকারী ডঃ নাগেন্দ্রের বিরুদ্ধে উভয় ফৌজদারি মামলার তদন্ত স্থগিত রাখেন। এদিকে, এফআরআরও-কে মামলাটিতে বিবাদী হতে এবং আদালতে অভিযুক্ত বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসীদের অবস্থা সম্পর্কে নির্দেশনা জারি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই মামলার পরবর্তী শুনানি ২০২৬ সালের ৬ই আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে।।
অ
