এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,১৭ মে : ভারত এখন এমন একটি প্রকল্পের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা আগামী বছরগুলোতে দেশের অন্যতম বৃহত্তম কৌশলগত প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মোদী সরকার বঙ্গোপসাগর এবং পূর্ব উপকূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য একটি বৃহৎ সামুদ্রিক জরিপ অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি নিয়েছে বলে খবর ।
এর লক্ষ্য শুধু নতুন তেল ও গ্যাসের ভান্ডার আবিষ্কার করাই নয়, বরং ভারতকে জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভর করে তোলাও। যখনই যুদ্ধ-সম্পর্কিত তেল সংকট দেখা দেয়, ভারতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ দেশটি তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের বেশিরভাগই বিদেশ থেকে কেনে। এখন, ভারত এই নির্ভরতা কমানোর একটি অভিযানে নেমেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, এই প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত নাম হলো “টুডি ব্রডব্যান্ড মেরিন সিসমিক অ্যান্ড গ্র্যাভিটি-ম্যাগনেটিক ডেটা সার্ভে”। সহজ কথায়, বিজ্ঞানীরা সমুদ্রপৃষ্ঠের কয়েক কিলোমিটার নিচে লুকানো শিলা এবং স্তর স্ক্যান করে সম্ভাব্য তেল ও গ্যাসের ভান্ডার শনাক্ত করবেন।
ডাইরেক্টরেট জেনারেল অফ হাইড্রোকার্বনস এর জন্য একটি বড় আকারের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এই মিশনের আওতায় বেঙ্গল-পূর্ণিয়া অববাহিকা, মহানদী অববাহিকা, কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকা, কাবেরী অববাহিকা এবং আন্দামান সাগরে জরিপ চালানো হবে। শুধুমাত্র বেঙ্গল-পূর্ণিয়া এবং মহানদী অঞ্চলেই প্রায় ৪৫,০০০ লাইন কিলোমিটার জরিপ করা হবে।
এই সামুদ্রিক সমীক্ষা আন্দামান ও কৃষ্ণা-গোদাবরী অঞ্চলে প্রায় ৪৩,০০০ রৈখিক কিলোমিটার এবং কাবেরী অঞ্চলে প্রায় ৩০,০০০ রৈখিক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পরিচালিত হবে। সম্পূর্ণ অভিযানটি প্রায় দুই বছর স্থায়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে
এই অভিযানে অত্যাধুনিক জরিপ জাহাজ ব্যবহার করা হবে। এই জাহাজগুলো ‘স্ট্রিমার’ নামক লম্বা, তারের মতো যন্ত্র টেনে নিয়ে যাবে। এই যন্ত্রগুলো সমুদ্রতলে শক্তিশালী শব্দ তরঙ্গ পাঠাবে। যখন এই তরঙ্গগুলো নিচের শিলা থেকে প্রতিফলিত হবে, বিজ্ঞানীরা সেগুলো ব্যবহার করে সমুদ্রতলের গঠনকাঠামোর মানচিত্র তৈরি করবেন।
এই তথ্য এমন সব ভূতাত্ত্বিক কাঠামো শনাক্ত করতে সাহায্য করবে, যেগুলোতে আটকে থাকা তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ লক্ষ বছর পুরোনো ভূ-গঠন প্রক্রিয়া, শিলা গঠন এবং পাললিক স্তর নিয়ে গবেষণা করবেন। ঠিক যেমন ডাক্তাররা শরীরের ভেতরটা স্ক্যান করেন, তেমনি এখানে সমুদ্রের গভীরতাও স্ক্যান করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় অঞ্চলে এখনও বিপুল পরিমাণ জ্বালানির ভান্ডার থাকতে পারে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে ১০ কিলোমিটারেরও বেশি পুরু পাললিক স্তর আবিষ্কৃত হয়েছে, যা তেল ও গ্যাসের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান বলে বিবেচিত। ধারণা করা হয়, এখানকার মায়োসিন ও ইওসিন যুগের শিলাস্তরে হাইড্রোকার্বন রয়েছে।
বেশ কয়েকটি স্থানে গ্যাসের প্রাথমিক লক্ষণও পাওয়া গেছে। মহানদী অববাহিকাকেও ভবিষ্যতের একটি প্রধান শক্তি অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে গভীর সমুদ্রের গ্যাস ভান্ডার এবং বায়োগ্যাস ব্যবস্থা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকা ইতিমধ্যেই ভারতের অন্যতম প্রধান গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল, কিন্তু এখন আশা করা হচ্ছে যে এর গভীর সমুদ্র অঞ্চলে আরও বড় ভান্ডার থাকতে পারে।
আন্দামান অববাহিকাকে সর্বাধিক কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ভূতাত্ত্বিক গঠন মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়ার গ্যাস ক্ষেত্রগুলির সাথে খুব সাদৃশ্যপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে আন্দামান সাগর অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস থাকতে পারে। এখানে গ্যাস হাইড্রেট খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সমুদ্রতলের নিচে হিমায়িত এই মিথেন গ্যাসকে ভবিষ্যতের শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কাবেরী অববাহিকা থেকে ইতিমধ্যেই তেল উৎপাদিত হয়েছে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন আশা করছেন যে এর গভীর সমুদ্র এলাকা এবং জুরাসিক যুগের স্তরগুলিতে এখনও বিশাল তেলের মজুদ থাকতে পারে।
ভারত দীর্ঘকাল ধরে সমুদ্র থেকে তেল উত্তোলন করে আসছে, যার একটি প্রধান উদাহরণ হলো বোম্বে হাই। এই ক্ষেত্রটি মুম্বাই উপকূলের কাছে আরব সাগরে অবস্থিত এবং ১৯৭০-এর দশকে এখানে বিশাল তেল ভান্ডারের আবিষ্কার ভারতের জ্বালানি চিত্রকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। আজও, বোম্বে হাই ভারতের সমুদ্র উপকূলবর্তী তেল উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করে চলেছে।
প্রসঙ্গত,সমুদ্র থেকে তেল উত্তোলনের জন্য বড় বড় অফশোর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রের তলদেশে খননকার্যের মাধ্যমে পাইপলাইনের সাহায্যে তেল ও গ্যাস ভূপৃষ্ঠে নিয়ে আসা হয়। এরপর এগুলো জাহাজ বা পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শোধনাগারে পরিবহন করা হয়। তবে, পশ্চিম উপকূলের তুলনায় পূর্ব উপকূলের গভীর সমুদ্র এলাকাগুলো কম অন্বেষিত রয়ে গেছে। তাই, সরকার এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই এলাকাগুলোর বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করছে।
এই প্রকল্পটি শুধু তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান সম্পর্কিত নয়, বরং এটি ভারতের জ্বালানি সুরক্ষার বিষয়ও বটে । রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা এবং অপরিশোধিত তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্য জ্বালানির জন্য বিদেশি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকি তুলে ধরেছে। ভারত বর্তমানে তার অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে ।
অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়লে ভারত বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব অনেকাংশে প্রশমিত করতে পারবে। এ কারণেই মোদী সরকার এই অভিযানকে জ্বালানি স্বনির্ভরতার পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের নিচে লুকানো সম্ভাব্য জ্বালানি ভান্ডার প্রত্যাশা অনুযায়ী আবিষ্কৃত হলে, ভারত আগামী বছরগুলোতে শুধু তার নিজের চাহিদার একটি বড় অংশই মেটাতে সক্ষম হবে না, বরং এশীয় জ্বালানি রাজনীতিতেও তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।।
