এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,১৪ ফেব্রুয়ারী : আগামী কাল থেকে রাজ্য জুড়ে “যুব সাথী প্রকল্প” এর ফর্ম ফিলআপ কর্মসূচি শুরু করতে চলেছে রাজ্য সরকার । মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ঘোষণা করেছেন মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা এই প্রকল্পের আওতায় আবেদন করতে পারবেন । এ প্রকল্পের আওতায় মাসিক দেড় হাজার টাকা করে সহায়তা আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেবে রাজ্য সরকার । কিন্তু বিরোধী দলনেতা মনে করছেন যে ২০২৬ সালের ভোটের লক্ষ্যে তৈরি করা এই প্রকল্পের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আদপে রাজ্যের বেকারদের সঙ্গে ‘ভাঁওতাবাজি’ করছেন । তিনি রাজ্যের শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিয়েছেন, “আপনারা দলে দলে ঢপবাজ, ফেরেববাজ, ৪২০ তৃণমূল সরকারের ফর্ম ফিলাপ করবেন”,পাশাপাশি বিজেপির ভারতীয় যুব মোর্চার তৈরি করা “চাকরি চায় বাংলা” ফর্মও ফিল আপ করে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠাবেন ।
আজ শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার সল্টলেকে দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন,’আগামীকাল থেকে একটা বড় নাটকের জন্য বাংলা অপেক্ষা করে আছে। যেভাবে ১৭ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতীদের ফর্মের অপমৃত্যু ঘটিয়েছেন, যুবশ্রী যুব উৎসব প্রকল্পের মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী…ঠিক আগামীকাল থেকে শিবচতুর্দশীর দিন….ওনার তো নত্বষত্ব জ্ঞান থাকে না, যে হিন্দুদের বড় উৎসব আছে কালকে…ওনার খেয়াল নাই যে এই রাজ্যের কয়েক লক্ষ পরীক্ষার্থী ১২ তারিখ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দেবেন, কিন্তু কালকে তিনি ২৯৪ টা বিধানসভায় আই প্যাকের বুদ্ধিতে এবং তাঁবেদার প্রশাসনের একটা অংশকে ব্যবহার করে একটা টেবিল এবং দুটো করে চেয়ার বা টুল পেতে কাল থেকে এই ফর্ম বিতরণের কাজ শুরু হচ্ছে ।’
তিনি বলেন,’মুখ্যমন্ত্রী ভালো করে জানেন যে ২০১৩ সালে যুবশ্রীর যে অপমৃত্যু ঘটিয়েছি, নির্বাচন আর একবার যদি জিতে আসতে পারি এটারও অপমৃত্যু ঘটাবো এবং পশ্চিমবঙ্গকে গ্রেটার বাংলাদেশে পরিণত করব ।’
রাজ্য সরকারের ১০ লক্ষ্য পদ খালি
শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন,’এবারের অন্তবর্তী বাজেটের চাকরির পার্ট ক্লোজ করে দেওয়া হয়েছে । কারণ মুখ্যমন্ত্রী কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি । চাকরি দিলেই পার্থ-অর্পিতরা চাকরি বিক্রি করবে । চাকরি বিক্রি করলেই হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্ট চেপে ধরবে । হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্ট চেপে ধরলেই সিবিআই, ইডি,ইনকাম ট্যাক্স আসবে । তারা এলেই পার্থকে জেলে যেতে হবে, সঙ্গে মানিককে যেতে হবে । সঙ্গে কল্যানময়কে জেলে যেতে হবে । এসপি সিনহাকে জেলে যেতে হবে । জীবনকৃষ্ণকে এখনো জেলে থাকতে হবে । তাই তিনি এবারে অন্তর্বর্তী বাজেটে চাকরির পার্টটা সম্পূর্ণ ক্লোজ করে দিয়েছেন । যদিও আমরা জানি যে তিনি ছয় লক্ষ রাজ্য সরকারের পোস্টের অবলুপ্তি ঘটিয়েছেন । আর প্রায় ১০ লক্ষ পোষ্ট, তার মধ্যে তিন লক্ষ আটান্ন হাজার প্রিন্সিপাল- অধ্যাপক-শিক্ষক- শিক্ষিকা- শিক্ষা কর্মী ইত্যাদি ভ্যাকেন্সি আছে । এক লক্ষের বেশির এবং দেড় লক্ষ এর কাছাকাছি পুলিশ কনস্টেবল ভ্যাকেন্সি আছে । সব মিলিয়ে যোগ করলে ১০ লক্ষ রাজ্য সরকারের ভ্যাকেন্সি পেন্ডিং আছে । তাই ওই পথে হাঁটেননি । চাকরি দিলেই প্রার্থরা চাকরি বিক্রি করবে এবং ভাগ উনি পাবেন । চাকরি দিলেই কালীঘাটের কাকু আসবে । অতএব তিনি চাকরির পার্টটা সম্পূর্ণ ক্লোজ করে দিয়েছেন বাংলায়।’
শুভেন্দু বলেন,:আগামীকাল থেকে টেবিল চেয়ার পেতে লম্বা লাইন পড়বে । আই প্যাকের ক্যামেরা, চটিচাটা এক শ্রেণীর মিডিয়ার ক্যামেরা ঘুরবে । তারা মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসা সূচক বক্তব্য দেখবে যে অন্তত কিছু না হোক আমরা তো এটা পেতে চলেছি । ইতিমধ্যেই জলপাইগুড়ির এক নেতা ঘোষণা করেছেন যে দিদি আর যাই হোক আপনাদের জন্য গুটকা খাওয়ার ব্যবস্থাটা করে দিয়েছেন ।’
মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে শুভেন্দু অধিকারী প্রশ্ন করেন,
‘তাই প্রথম প্রশ্ন করি রাজ্য সরকারকে, ২০১৩ এর ১৭ লক্ষ আবেদনকারীর ভবিষ্যৎ কি হল জানান আপনি জনগনকে । তার তালিকা প্রকাশ করুন । তাদের মধ্যে কতজন চাকরি পেয়েছে তার শ্বেতপত্র চাই । দ্বিতীয় হচ্ছে, আজকের দিনের সবই অনলাইনে হয়ে যায় । তারপরেও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীন কেন লক্ষ লক্ষ যুবককে আপনাকে রাস্তায় নামাতে হবে ? আপনি কেন অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করছেন না ? এটা আপনার পুরনো চাল । ২১ সালে নির্বাচনের আগে যে ‘দুয়ারে সরকার’ স্টাইল ছিল, তারপরে ‘আমার পাড়া আমার সমাধান’-এর নামে যে নাটক বা ড্রামাবাজি করেছেন, আই প্যাকের বুদ্ধিতে চিটিংবাজ প্রতীক জৈন এবং তার কোম্পানি যারা টেন্টেড হিসেবে অভিযুক্ত, ইতিমধ্যে তাদের ব্যবস্থাপনায় যে ড্রামাবাজি করেছেন ঠিক কাল থেকে এই ড্রামাটা আপনি করতে চলেছেন বেকার যুবক-যুবতীর সঙ্গে ।’
“দলে দলে ফর্ম ফিলআপ করুন”
তিনি বলেন,’আমি পশ্চিমবাংলার বেকার যুবক-যুবতীদের বলবো, যে যেখানে পারেন দলে দলে যান ফর্ম ফিলাপ করতে । নিশ্চিতভাবে যান । সেই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ যুব মোর্চার যে পোস্ট কার্ড সেটাও ফিলআপ করে দিয়ে আসবেন । “চাকরি চায় বাংলা” । আপনারা দলে দলে এই ভাওতাবাজ মুখ্যমন্ত্রীর এই ফর্মটাও ফিলাপ করুন, আমাদের কোন আপত্তি নেই । কারণ এরা দিতে পারবেনা, চাকরি বিজেপি দেবে । আমি জানি আগামী এপ্রিল মাসে আপনারা আমাদের আনবেন । হরিয়ানায় অমিত শাহজি কথা দিয়েছিলেন ছয় মাসের মধ্যে ভ্যাকেন্সি পূরণ করব , পূরণ করেছেন । তিন লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার ভ্যাকেন্সি ছিল । আমরা জানি আপনারা বিশ্বাস রাখেন বিজেপিকে । মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফড়নবিশ সরকার বেকার যুবক-যুবতীদের মাসিক ভাতা দিচ্ছেন যতক্ষণ না চাকরি হয় । আর এই মুখ্যমন্ত্রীর গাইডলাইনে ২০১৩-তে ছিল এইট পাস এখন করেছে টেন পাশ । এবং অনন্তকাল কেউ পাবেন না । পাবেন কবে এপ্রিলে । তখন নির্বাচন বিধি থাকবে । তবে সেটা নির্বাচন কমিশনের ব্যাপার । কিন্তু এটা পাঁচ বছর উনি দেবেন । ওনার প্রস্তাবিত আগে ছিল এইট পাশ এখন করেছেন টেন পাস । সম্পূর্ণভাবে রাজ্যটাকে রসাতলে ফেলার জন্য একটা পরিকল্পনা আমরা দেখতে পাচ্ছি ।’
শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের বেকারদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,”দলে দলে ঢপবাজ, ফেরেববাজ,৪২০ তৃণমূল সরকারের ফর্ম ফিলাপ করবেন আমাদের কোন আপত্তি নেই । সঙ্গে চাকরি চায় বাংলা ফর্মও ফিল আপ করবেন । ২ কোটি ১৫ লক্ষ বেকার ।’
মমতা ব্যানার্জিকে নিশানা করে তিনি বলেন,’পশ্চিম বাংলার দুই কোটি ১৫ লক্ষ বেকার সৃষ্টিকারী, ৫১ টি কর্ম বিনিয়োগ কেন্দ্রে তালা চাবি লাগানো, এক কোটির কাছাকাছি পরিযায়ী শ্রমিক যিনি তৈরি করেছেন, তথাকথিত মা-মাটি-মানুষ সরকারের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর এবং তার সরকার শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীদের সঙ্গে ২০১৩ সাল থেকে লাগাতার প্রতারণা এবং চালাকি করছেন । ২০১৩ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ডক্টর অমিত মিত্রর বাজেটে যুব উৎসাহ প্রকল্প, যা ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে যুবশ্রী প্রকল্প এবং এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংকের ঘোষণা, ১৭ লক্ষ আবেদনকারীর আবেদন নেওয়া, ১ লক্ষ আবেদনকারীকে মাসে দেড় হাজার টাকা করে কিছু দিনের জন্য ভাতা দেওয়া, বাকি ১৬ লক্ষ আবেদনকারীকে অপেক্ষাতে থাকতে বলা, এক লক্ষের চাকরি হয়ে গেলে বাকিরাও ক্রমান্বয়ে চাকরি পাবেন, এইরকম মিথ্যা প্রতিশ্রুতি নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে মন্ত্রী-আধিকারিকদের সামনে রেখে বেকার যুবক-যুবতীদেরকে বড় বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ।’
শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন,’সেই যুবশ্রী প্রকল্পের মৃত্যু ঘটিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে তার অর্থমন্ত্রী ডঃ অমিত মিত্র । যিনি, ১৭-১৮ অর্থ বছরে এই যুবশ্রী প্রকল্পে কোন বরাদ্দ রাখেননি । এবং এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক তুলে দিয়ে ২৭ লক্ষ আবেদনকারীর যে আবেদন ছিল সেই আবেদন কোথায় গেছে ? কেজি দরে বিক্রি হয়েছে না অন্য কিছু হয়েছে না পুড়িয়ে ফেলেছে আমরা জানিনা । এই ১৭ লক্ষ আবেদনকারীর তালিকা আমাদের কাছে আছে এবং আমরা প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ করব । এবং তারা তাদের অভিজ্ঞতার কথা মানুষের সামনে তুলে ধরবেন ক্রমান্বয়ে ।’
তার কথায়,’এই সরকার যে চাকরী বিরোধী, শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের বিরোধী, এই সরকার শুধু টাটা-কে তাড়ায়নি সরকারি এবং বেসরকারি চাকরির অপমৃত্যু ঘটিয়েছে । সেটা সবাই জেনে গেছে ৷ এবং জেনে যাওয়ার কারণে যে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা গোটা রাজ্য জুড়ে হচ্ছে, আমরা করোনা কালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া শ্রমিক স্পেশাল-এর সময় দেখেছিলাম যে কত লক্ষ লক্ষ আমাদের ভাইরা পেটের টানে বিভিন্ন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে গেছেন । তারা সেখানে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে পড়ে আছেন । তখন কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে লাইন দেখে আমরা বুঝেছি যে কি ভীষণ পরিমাণ পরিযায়ী শ্রমিক পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হয়েছে ।’ তিনি বলেন,’আগে উড়িষ্যা বিহার থেকে আমাদের রাজ্যে মানুষজন আসতেন । এর উল্টো যা হয়েছে তা ২০২০ সালে করোনা কালে মানুষ দেখেছে ।’ শুভেন্দুর কথায়, ‘মুখ্যমন্ত্রী সব কিছু বুঝে এবারের অন্তবর্তী বাজেটকে তিনি নির্বাচনী একটি লিফলেটে পরিণত করেছেন ।’।

